অপ্রাপ্তির প্রাপ্তি

আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২২, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল্লাহ আল বাকী:


জানি বিয়েটা তোমার মনপুত হয়নি। তবে কি জানো, আমার না তোমাকে প্রথম পলকেই খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। একদম চোখটা সরাতে পারছিলাম না। অপলক তাকিয়ে ছিলাম। জানো, তুমি রাতে স্বপ্নে এক্কেবারে শিশুর মত এসে বুকে মাথাটা এলিয়ে দিয়েছিলে। তখনো আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি। সেদিন থেকেই খুব ভেবেছি, কাজের ফাঁকে, নিরবতায়, নিঃশব্দে, কোলাহলে, গভীর ঘুমে শুধু তোমাকেই ভেবেছি। তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকে যে প্রেম মনে জেগে উঠেছে তা এখনো বলবান আছে একটুও কমেনি বরং বেড়েছে আরও। তাই এই অবেলায় বসে তোমার রুপের বর্ণনায় আমি তোমাকে মিথ্যে মহিমায় আবদ্ধ করতে চাইনা। শুধু তোমাকে বলতে চাই, ভালোবাসি। তোমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আজ আমি ক্লান্ত, জানি এতে তোমার কিছু যায় আসে না। তবুও কি তুমি এমুখো হবে না। আমাকে একটিবারও দেখবে না। জানি আমি দোষী, তোমার অনিচ্ছায় তোমাকে আজ চিরবন্ধনে আবদ্ধ করেছি, জানি তাতে আমার সার্থের জয় হয়েছে তবে তুমি পরাজিত। পরাজিত হতে কাউকেই ভাল লাগে না। তুমি জানো ভালোবাসার এ খেলায় আমি বারবার পরাজিত হয়েছি। সেই ছেলেবেলায় যখন থেকে গোঁফ উঠতে শুরু করলো। এখনো ঠিক জলের মত স্বচ্ছ হয়ে আছে আমার মনে, সেই শুরু পরাজিত হওয়ার তারপর থেকে শুধু হেরেই গেছি আজীবন। যখন জীবনের প্রথম প্রেমকে হারিয়ে যেতে দেখেছি দূর থেকে আরও দূরে তখন আফসোস করেছি কেমন ধূসর হয়ে গেছে দিন গুলো তারপর যৌবনে কর্মে প্রবেশ করে শুধু ছুটেছি টাকার পিছে, কোন অভাবে পরতে দেব না তাকে। বোধহয় তাই সহজ হয়েছে তোমার পরিবারের কাছে আমাকে আকর্ষণীয় করতে।
আসলে সত্যিটা কি জানো পরিবার পয়সা খোঁজে, আর পাত্রী খোঁজে মুখশ্রী এই দুয়ের মাঝে থাকা মনটা যে সবের আড়ালে থেকে যায় তা কারো দৃষ্টি গোচর হয়না। আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না। তবুও যেহেতু তোমাকে আমার সার্থের জোরে গ্রহণ করেছি সেহেতু তুমি আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারো। এই আমি চোখ টা বন্ধ করে বুকটা পেতে দিয়ে তোমার সামনে বসলাম আমাকে তুমি হত্যা করো। তখনো ছলছল অশ্রু বইছিলো অঝরে দুচোখ ভরে। কিছু টা সময় নিশ্চুপ কিংকর্তব্যবিমুঢ় নিরবতার পর হঠাৎ চোখের পাশের অঞ্চলটাতে একটুকরো কাপড়ের আবেশ পেলাম। বুঝলাম ছলছল চোখটা মুছে দিচ্ছে। কোন কথা বলার সুযোগটা না দিয়ে খুব জোরে আলিঙ্গন করলাম, জরিয়ে ধরে অঝর ধারায় কাঁদতে থাকলাম। ঠিক একটা ছোট্ট শিশু যেমন মায়ের কোলে নিরাপদে থাকে তেমনি তার দেহটা হঠাৎ বড় নিরাপদ বলে মনে হলো। আমার কান্না থামানোর কোন বালাই নেই তার হঠাৎ শরীরের জামাটা একটু ভেজা মনে হলো। প্রথমে ভেবেছিলাম আমারই অশ্রু হয়তো গড়িয়ে পরেছে। পরে আবিষ্কার করলাম না ওর মুখটা আমি আমার বুকে চেপে ধরে আছি। আসলে কান্নার রোলটা এমন ভাবে শুরু হয়েছিলো যে আশেপাশে কেউ থাকলে হয়তো ভাবতো বান ভাসা, সব হারা দুটি মানুষ ঝরের পরে আবার দুজন দুজনকে ফিরে পেয়েছে। কিন্তু আমার তা মনে হয়েছিলো না যতক্ষণ পর্যন্ত ওর জীবনের ঘটনাটা ও আমাকে না বলেছিলো। তবে জানার পর আমি চমকে উঠেছিলাম। কান্নাটা থামিয়ে সে বলতে শুরু করলো। – জানি না আপনি কথাটা কিভাবে নেবেন, তবে আমি এড়িয়ে যেতে চাইনা আপনার কাছে থেকে। কারণ আমি জানি আপনি তা জানবেন হয়তো আজ না হয় কাল। তাই আমি আপনাকে বলতে চাই। আমার কথা শেষ হবার আগে আপনি একটুও কথা বলতে পারবে না। কি রাজি তো? তারপর আমার কথা শেষ হলে আপনি আপনার সিন্ধান্তটা জানাবেন। আমি সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালাম। সে বলতে শুরু করলো- আমার পরিবার আপনার কাছে থেকে অনেক বড় একটা নিষ্ঠুর সত্য লুকিয়েছে।
কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না। তবে ভনিতা না করেই বলি, আমি কুমারিত্বহীন। এক নরশয়তান আমাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আমার বিশ^াস লুট করেছে। তিন মাস পেরিয়ে যাবার পর বুঝতে পারি আমার মাঝে সঞ্চারিত হয়েছে নতুন প্রাণ, তখন তা তাকে জানালে সে নানা অজুহাতে আমাকে এড়িয়ে চলে। শেষে কিছু না করতে পেরে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম কিন্তু দুর্বল হৃদয়ে আমি তা পারিনি। যখন মাকে বললাম মা প্রথমে খুব মেরেছিলো। তারপর আমার গর্ভপাত করানো হয়। তাতে আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম ছিলো না তাই পরিবার যা বলেছে তাই মেনে নিয়েছি, কোন সিন্ধাতে যাইনি। জানতাম কোন সিন্ধান্তে গিয়েও লাভ হতো না। আমি তখন কেমন যেন ছিলাম, জীবন কি, বেঁচে থাকা না থাকা নিয়ে যেন কোন অনুভূতিই আমার মাঝে ছিলো না। তারপর অনেক দিন কেটে গেলো অনেক বড় বড় ঘর থেকে আমার বিয়ে আসতো। অনেক পয়সাওয়ালা অনেক নাম ডাকওয়ালা লোকের সাথে বিয়ের সমন্ধ এসেছিলো। কিন্তু তারা যেভাবেই হোক সব জেনে যেত আর আমার বিবাহ ভেঙে যেত। আমি বিবাহে কখনোই মত দিতাম না। তবু বাপের ঘাড়ে থাকবো না দেখে বাইরে কাজ করতে চেয়েছিলাম, নিজের মত বাঁচতে চেয়েছিলাম একা একা। কিন্তু পরিবারের অসম্মতিতে তা সম্ভব হয়নি। তারপর যখন আপনি এলেন তখনো ভেবেছিলাম গতানুগতিক ভাবে এ সমন্ধটাও ভেঙে যাবে। তবে আপনার আগ্রহ দেখে আমার খুব রাগ হয়েছিলো। আমি অসম্মতি জানাই।
তারপর মা একদিন আমাকে একান্তে নিয়ে বলেছিলেন, হয় তুই এই বিয়েতে মত দিবি নয়তো আমাকে খুন করবি তুই কোনটা চাস? শেষে আমি নিরুপায় হয়ে বিয়েতে মত দিয়ে ছিলাম। জানি আপনি হয়তো কোন কুমারিত্বহীন মেয়েকে ঘরের বৌ করতে চাইবেন না। জানেন, আজ সকালেও মায়ের সাথে অনেক ঝগড়া করছি কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। আমার পরিবার আপনাকে ঠকিয়েছে তাই আমি ক্ষমা চাইছি। এবার আপনি আপনার সিন্ধান্ত জানিয়ে দিন। না থাক বলতে হবে না। আচ্ছা বলুন তো কোন পথটা দিয়ে বের হলে কারো চোখে পরার ভয় কম আছে? বুকের মধ্যে তখন তোলপাড় চলছে আমি তা থামাতে চেষ্টা করছিলাম। তারপর হঠাৎ ওর দুটো হাতের কড়া চেপে ধরে একটা চুমু দিয়ে বললাম, আচ্ছা তোমার মনে আমায় একটু জায়গা দেবে? একটু ভালোবেসে দেখি। আর হ্যা কি যেন বলতে চেয়েছিলে ওটা আর শুনতে ইচ্ছা করছে না। আচ্ছা বলতো এই শহরে কোন জায়গাটা তোমার সবচেয়ে প্রিয়?
তখন অপলক তাকিয়ে আছে মেয়েটা আমার দিকে। আমিও একনাগাড়ে দেখছিলাম তাকে। তার চোখ ভরা অবাক হওয়ার ছাপ, নিতান্তই বোকা মেয়েটা। তাই হয়তো চোখে ভেতর নিজের দুর্বলতা টা প্রকাশ করছে। আমি হাতটা ধরে হালকা নাড়া দিতেই তার মোহ ভাঙলো। বললাম- কি বলবেনা তোমার প্রিয় যায়গা কোনটা কিছুটা গুছিয়ে সে বললÑ পদ্মা পাড়ে ভোরের রক্তিম সূর্যদয়- আমি আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বললাম – আচ্ছা, চলো এখন একটু ঘুমিয়ে নিই, কাল ভোরে পদ্মা পাড়ে যাবো রক্তিম সূর্যদয় দেখতে।