বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

অবশেষে মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেলো আতাইকুলা গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা বেঁচে আছেন ৬ জন

আপডেট: December 4, 2019, 1:32 am

আবদুর রউফ রিপন, নওগাঁ


বীরাঙ্গনা সন্ধ্যা রানী, রাশমনি সূত্রধর, মায়া রানী সূত্রধর, রেনু বালা পাল ও সন্ধ্যা রানী পাল সোনার দেশ

অবশেষে স্বাধীনতার ৪৮ বছরের মাথায় নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সমমান মর্যাদা পেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সমান সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে যাচ্ছেন স্বামী, সন্তান ও সম্ভ্রম হারানো এই বীরাঙ্গনারা। তবে এই ১০ বীরাঙ্গনার মধ্যে ইতোমধ্যেই ৪ জন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে বেঁচে আছেন বাকি ৬ বীরাঙ্গনা। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি গেজেটের মাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করেছে। এতে করে বর্তমান সরকার দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলো বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বানীরানী পাল, ক্ষান্তরানী পাল, রেনুবালা ও সুষমা সূত্রধর রোগে আক্রান্ত হয়ে অভাব-অনটনের সংসারে উন্নত চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। আর বয়সের ভারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কোনোমতে বেঁচে আছেন মায়ারানী সূত্রধর, রাশমনি সূত্রধর, সন্ধ্যারানী পাল, কালীদাসী পাল, সন্ধ্যা রানী ও গীতারানী পাল। একাত্তরের সেই দুর্বিসহ যন্ত্রণা ও সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন আর অসুস্থতার মধ্যেই চলছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর তীরে ছায়াঘেরা শান্ত আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক-হানদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার ও আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্যাতন চালায় এই পালপাড়া গ্রামের সনাতন ধর্মের মানুষদের উপর। এই সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়। সংখ্যালঘু পরিবারের কিশোর, যুবক, মাঝ বয়সী, ও বিভিন্ন বয়সী নারীদেরকে ধরে ওই গ্রামের সুরেস্বর পালের বাড়ির বারান্দায় একত্রিত করা হয়। ‘জয় বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়’Ñ এভাবে পাক সেনারা ব্যাঙ্গোক্তি করতে করতে ব্রাশফায়ার করে। গোবিন্দচরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারণ পালসহ ৫২ জন মুক্তিকামীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। ৫২ শহিদের তাজা রক্তে সে দিন নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর পানি লাল হয়ে উঠেছিল। নির্যাতিত নারী ও স্বজনদের হৃদয় বিদারক আর্তনাদ ও কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
বীরাঙ্গনা কালীদাসী পাল (৭৫) বলেন, ওই দিন সকালে যখন আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবী আসে তখন আমরা স্বামীসহ বাড়ির দরজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় গেটের দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে হিঁচড়ে পাঞ্জাবীরা রাইফেল দিয়ে মারতে মারতে নিয়ে গিয়ে যোগেন্দ্রনাথের বারান্দায় ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছি। কিন্তু পাষ- বর্বরেরা কোনো অনুরোধ মুনেনি সেদিন। চোখের সামনেই স্বামীসহ ৫২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পশুরা আমার উপরও নানা কায়দায় নির্যাতন চালায়। আমার এক ছেলে আছে। অভাবের সংসারে সে দিনমজুরের কাজ করে। আমিও পেটের তাগিদে কখনও ধান কুড়িয়ে, বয়লারের চাতালে কাজ করে, কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে কোনো মতো বেঁচে আছি। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকতে আর মনে হয় স্বীকৃতি পাবো না। তবে অবশেষে এই স্বীকৃতি পেয়ে আমি অনেক খুশি। এই সরকারকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

বীরাঙ্গনা সন্ধ্যারাণী পাল (৭০) বলেন, ওই দিন সকাল নয়টার দিকে পাঞ্জাবীরা আমার স্বামী বাড়িতে কাজ করা অবস্থায় সুরেশ্বর পালের বাড়িতে ধরে নিয়ে লাইন করে রাখে। এই দিকে পাঞ্জাবীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগসহ নৃশংস নির্যাতন চালায়। আমি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে পাশের বাড়ির এক বড় মাটির ডাবরের ভিতর আশ্রয় গ্রহণ করি। বাচ্চার কান্না পাঞ্জাবীরা শুনতে পেয়ে আমাকে সেখান থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি পালিয়ে মাঠের মধ্যে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
অবশেষে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক ধন্যবাদ। স্বামী হারানোর পর থেকে ৪৮টি বছর অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন কাটালাম। তাই স্বীকৃতির পাশাপাশি সকল সুযোগ-সুবিধা যদি দ্রুত আমাদেরকে দেয়া হয়- তাহলে যে কদিন বাঁচি তা ভোগ করে যেতে পারতাম।
রাণীনগর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অ্যাড. ইসমাইল হোসেন বলেন, অনেক চেষ্টার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার অবশেষে আতাইকুলাগ্রামের ১০ বীরঙ্গনাকে স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে নাম গেজেটভুক্ত করেছেন। এই স্বীকৃতি প্রাপ্তির সকল প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। বরাদ্দ এলেই আগামী বিজয় দিবসে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেয়া হবে বলে আমি আশা করছি।
সংসদ সদস্য ও জেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবার ও বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। অবশেষে আমাদের সবার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের এই বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেয়েছে। এটি আমাদের অনেক বড় একটি সফলতা। আমার খুবই ভালো লাগছে। অবশেষে যে কজন বীরাঙ্গনারা এখনোও বেঁচে আছেন তারা অন্তত তাদের ন্যায্য প্রাপ্যটুকু একটু হলেও ভোগ করে ও স্বীকৃতির মুকুট মাথায় নিয়ে সমাজে বেঁচে থাকতে পারবেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ