অবহেলায় বেহাল বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৭, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



‘লাঠিয়াল’, ‘সুজন সখী’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘বসুন্ধরা’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সারেং বৌ’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’, ‘লাল সবুজের পালা’, ‘কসাই, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘ময়নামতি’, ‘দেবদাস’, ‘রাজবাড়ি’, ‘ভাত দে’, ‘অবিচার’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় দর্শকদের বিনোদনের পাশাপাশি দেশের হাজার বছরের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। এসব সিনেমার নাম এখনো মানুষ মনে রেখেছেন। কিন্তু এসব দেখার ইচ্ছে হলে অধিকাংশ সিনেমাই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সিনেমা হারিয়ে যাওয়ার এ তালিকায় রয়েছে আমজাদ হোসেনের ‘কসাই’ সিনেমাটিও। সিনেমাটি পরিচালনার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন আমজাদ হোসেন। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ সিনেমাটি তখন মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়। তা ছাড়া বিভিন্ন শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। কিন্তু এ সিনেমার রিল নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও সংরক্ষিত নেই সিনেমাটি। ‘ফিল্ম ইন্সটিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ’-এও সংরক্ষিত নেই সিনেমাটি।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বর্ষীয়ান চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন। এ প্রসঙ্গে রাইজিংবিডিকে আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বিএফডিসি একটি সরকারী সংস্থা। কিন্তু বিএফডিসি পরিত্যাক্ত হয়ে গেছে। আমার মতো সবারই ক্ষতি হয়েছে। আনকালচার লোক এরা। যাদেরকে স্টোরের ইনচার্জ করা হয়েছে তারা লেখাপড়া জানে না, তাপমাত্রা বুঝে না। কসাই সিনেমার সমস্ত নেগেটিভে পানি জমে নষ্ট হয়ে গেছে। এ রকম অনেক সিনেমার নেগেটিভ নষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অদক্ষ লোকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যারা এসির কি কন্ডিশন? টেম্পারেচার কেমন তা বুঝে না। এসব বিষয় তাদের বুঝা উচিৎ। ফিল্মতো ধান চাষ না। এগুলোকে মেইনটেইন করতে হলেও জানাশোনা লোক প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে বিএফডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘বিএফডিসির স্টোরে যেসব সিনেমার রিল রয়েছে তার কিছু কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকদিনের পুরোনো হওয়ায় এগুলো নষ্ট হয়েছে।’
দায়িত্বের অবহেলার কারণে এগুলো নষ্ট হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখেন এগুলো অনেক আগের রিল। এগুলো দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় নষ্ট হয়েছে।’
দেশের হাজার বছরের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সংরক্ষণে ১৯৭৮ সালে ‘ফিল্ম ইন্সটিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। যা ১৯৮৪ সাল থেকে এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ মূলত পুরোনো চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণসহ চলচ্চিত্র বিষয়ক গবেষণা, প্রকাশনা ও ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্স বাস্তবায়ন করে থাকে।
১৯৫৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার তিনশত দেশী সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’-এ ২ হাজার ৫শত সিনেমা সংরক্ষিত রয়েছে। বাকিগুলোর কোন সন্ধান ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা যায়, ‘মাটির পাহাড়’, ‘চান্দা’, ‘রাজধানীর বুকে’সহ বেশ কিছু সিনেমা তখনই হারিয়ে গেছে। প্রযোজকের কাছে প্রিন্ট ছিল না। স্বাধীনতার পর অনেক প্রযোজকের কাছে সিনেমার রিল ছিল না। এ ছাড়া বিএফডিসিতে যেসব সিনেমার রিল ছিল তার অধিকাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’-এ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় নি।
২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে ডিজিটাল ফরম্যাটে সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শন করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২৪৯টি ডিজিটাল সিনেমা ডিজিটাল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে খুব কম সংখ্যক সিনেমা ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’-এ জমা আছে। বাকিগুলো প্রযোজকদের অবহেলার কারণে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’-এ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় নি বলে জানান ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ সূত্র।
‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ সূত্র আরো জানান, বর্তমান সময়ের প্রযোজকদের কাছে একাধিকবার ফোন করে অনুরোধ করলেও তারা সিনেমাটি জমা দিচ্ছেন না।
এ বিষয়ে কোনো আইন আছে কিনা জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ সূত্র বলেন, ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-এ সিনেমা জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। এজন্য আইন রয়েছে। কিন্তু দেখা যায়- এ সময়ের অধিকাংশ প্রযোজক একটি করে সিনেম্ ানির্মাণ করছেন। পরবর্তীতে তাদের ধরার কোনো সুযোগ নেই। ইমপ্রেস নিয়মিত সিনেমা প্রযোজনা করছেন আবার বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-এও জমা দিচ্ছেন। এ ধরনের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মাত্র কয়েকটি।’
এ বিষয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ বলেন, ‘বর্তমান সময় সিডির মাধ্যমে সিনেমা আর্কাইভে জমা দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমার সিনেমা পাইরেসি হবে না তার গ্যারান্টি কে দিবে? এমন গ্যারান্টি আর্কাইভ দিতে পারলে আমার সিনেমা জমা দিতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তারা এ ধরনের গ্যারান্টি দিতে পারবে না বলে আর্কাইভে সিনেমা জমা দিচ্ছি না। পাইরেসি হলে লোকসানে আমাদের পড়তে হবে।’
আর্কাইভে সিনেমা জমা দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাব্ েবাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সচিব মুন্সি জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সিনেমা বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’-এ জমা দেয়ার ব্যাপারে আমাদের হাত খুব একটা নেই। কারণ সিনেমা মুক্তির আগে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-এ জমা দেয়া যাবে না। এ জন্য সেন্সর থেকে পার পেয়ে যায়। মুক্তির পর প্রযোজককে অনেক সময় খুঁজে পান না বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ কর্তৃপক্ষ। তবে আমরা বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-এ সিনেমা জমা দেয়ার একটা আইন করেছি। যেসব প্রযোজক পূর্বে সিনেমা নির্মাণ করেছেন তাদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-এ সিনেমা জমা দেয়ার রশিদ জমা দিয়ে নতুন সিনেমা সেন্সরে জমা দিতে হবে। এতে করে কিছুটা জমা পড়ছে। তবে নতুন প্রযোজকে আটকানো যাচ্ছে না। তারা এ বিষয়ে উদাসীন।’
এভাবে চলতে থাকলে ‘পোড়ামন’, ‘লাভ ম্যারেজ’, ‘অনেক সাধের ময়না’, ‘শিকারী’, ‘রক্ত’, ‘আয়নাবাজি’ সহ বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় সিনেমাগুলো এক সময় হারিয়ে যাবে। ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’  আরো নিরাপদ এবং প্রযোজকদের সচেতন ও আর্কাইভে সংরক্ষণের জন্য উৎসাহী হতে হবে বলেও মনে করছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। রাইজিংবিডি