অভিবাদনে অমূলক অনুরাগ, কার স্বার্থে

আপডেট: জুন ২, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


অভিবাদন জ্ঞাপন মানবসভ্যতার পরিশীলিত আচরণের প্রাচীন বিধি। শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সম্মান জানানোর সার্বজনীন রীতি। ভাষা ও অঞ্চল ভেদে অভিবাদন বা সম্ভাষণ জানানোর অভিব্যক্তি পৃথক হলেও এর মর্মকথা অভিন্ন।
স্বয়ং বা যান্ত্রিক সাক্ষাতে এবং বিদায় নেবার সময় ছোট্ট একটি বাক্য বা শব্দ উচ্চারণ করে মানুষ তার আন্তরিকতা প্রকাশ করে। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে স্বঘোষিত ফিল্ড মার্সাল আইউব খান ক্ষমতা দখল করে মাসপহেলা বেতারভাষণ শেষে উচ্চারণ করতেন ‘খোদা হাফেজ’। এ নিয়ে তখন কোনো গুঞ্জন শোনা যায়নি। সাক্ষাতে কিংবা বিদায় বেলায় মুসলমানরা বলেন: আসসালামু আলাইকুম। এর অর্থ পরস্পরের শান্তি কামনা। একটি ইংরেজি কবিতায় পড়েছিলাম বিধাতা মানুষকে কত কিছুই না দিয়েছেন, তবে শান্তি বা প্রশান্তি উপলব্ধির বিষয়টি নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন। এ উপলব্ধি দুর্লভ। সুতরাং এই অভিবাদনের মধ্যে গভীর তাৎপর্য আছে। ধর্মের দিক থেকে এবং বোধের অন্তহীনতায়।
সনাতন সমাজে নমস্কার জ্ঞাপন করে অভিবাদন জানানো হয়। এটা সর্বভারতীয়। যাবার বেলায় বা বক্তব্য শেষে ‘এখন আসি’ বা ‘ভাল থাকুন’ বলা হয়। কোথাও আলবিদা বলা হয়। জনান্তিকে বলে রাখি, ‘আলবিদা’ শব্দটি প্রয়োগ করে একটা গান বহুল প্রচারিত এবং সমাদৃত। নমস্কার জানিয়ে সম্ভাষণ জ্ঞাপন বহু পুরাতন তবে বিষয়টি অধিকতর জনপ্রিয় করে তোলেন মহাত্মা গান্ধী এবং রবীন্দ্রনাথ। জোড়া দু’হাত তুলে নমস্কার জ্ঞাপনে সশ্রদ্ধ বিনয়ের প্রকাশ ঘটে।
ইউরোপিয়রা সময় জ্ঞাপক অভিবাদন জানাতে অভ্যস্থ, গুড মর্নিং, গুড ইভিনিং ইত্যাদি। আর শেষে গুড বাই অথবা কেবল ‘বাই’। আরবি, সংস্কৃত, ইংরেজি ভাষায় অভিবাদন জ্ঞাপনে সৌজন্য এবং সৌহার্দ্য প্রদর্শনের যে অভিব্যক্তি ঘটে আসছে দীর্ঘকাল, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কেউ কেউ ধর্ম নির্বিশেষে ‘আদাব’ দিয়ে সম্ভাষণ জানান। এটি এক ধরনের সালাম-নমস্কারের সমন্বিত রূপ। তবে বহুল প্রচলিত নয়। গোল বেধেছে, দীর্ঘকাল ধরে বহুল প্রচলিত ‘খোদা হাফেজ’ আল্লাহ হাফেজ-এ রূপান্তরে। গভীরে না গিয়ে বোধের ক্ষেত্রে খোদা আল্লাহ শব্দের সমার্থক। ‘আল্লাহ হাফেজ’ প্রচারকারীদের যুক্তি হলো আল্লাহ অভিব্যক্তিটি পবিত্র কোরানের। এ নিয়ে অশ্রদ্ধা করার কী আছে। এটি যে আরবি ভাষার তা অস্বীকার করবে কে? বহু প্রাচীন ভাষা আরবি। আরবি ভাষাভাষি মানুষের সহজবোধগম্যের উদ্দেশ্যে সেই ভাষায় কোরান অবতীর্ণ। এটা স্বয়ং আল্লাহ এরশাদ করেছেন। তাছাড়া আল্লাহ অভিব্যক্তিটি কোরান বা মহানবী (স.) এর আবির্ভাবের আগেই ছিলো। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর পিতার নামই তো আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মোত্তালিব।
সকল ভাষার ¯্রষ্টা আল্লাহ এটা কোরানের কথা। সৃষ্টিজগৎ যে ভাষাতেই কথা বলুক সৃষ্টিকর্তা বুঝতে পারেন। তিনি তো ‘লাতিফুন খাবির’ সূক্ষ্মদর্শী। উপরন্তু আল্লাহ তো সর্বসৃষ্টির মাঝে বিরাজ করছেন, তাঁর ঘোষণা- ‘ওয়া নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওয়ারিদ’ তিনি সবার অতি নিকটতম স্থানে বিরাজমান। তাহলে ‘খোদা’ ‘আল্লাহ’ নিয়ে বাহাস কেন? এর মূল কারণ সৌদি আরব-ইরান দ্বন্দ্ব। বাইরে থেকে ব্যাখ্যা দেয়া যায়, শিয়া-সুন্নি মতবাদ। তাদের পৃথক করেছে। আসলে তা নয়, দ্বন্দ্ব আধিপত্যের। ওয়াহাবীরা হেজাজ দখল করে দেশের নাম ব্যক্তির নামে চালু করলো। মুসলিম ঐক্য আর মৌলিক ইসলামের নামে বিভাজিত করলো মুসলমানদের। জিইয়ে রাখলো রাজতন্ত্র।
জেনারেল আইয়ুব খান সম্ভবত কোনো ইজমকে সামনে রেখে ভাষণ শেষে ‘খোদা হাফেজ’ বলতেন না, তবে সরল মানুষের সমর্থনের জন্য ছিলো তার সেই কৌশল। জেনারেল জিয়াউল হক ওয়াহাবীদের ফাঁদে পড়ে শুরু করলেন ‘আল্লাহ হাফেজ’। এটা ইসলাম প্রীতি নয়, ভাষাকে শিখ-ী রেখে সরল মুসলমানদের বিভ্রান্ত করা। এখানকার ওয়াহাবীবাদীরা তাদের স্বপ্নস্থান পাকিস্তানের খায়েশ পূরণ করার জন্য ‘আল্লাহ হাফেজ’ সহ নামাজ-রোজা অভিধাকে ‘সালাত’ ‘সিয়ামে’ রূপান্তরের উন্মাদনায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষ বিষয়টি খতিয়ে না দেখে আল্লাহর ভাষা ভেবে তা গ্রহণ করছে। তাদের ভাবার অবকাশ কম, তাই ওয়াহাবীদের উত্তরসূরিরা ইসলামের নামে বাজিমাত করতে উদ্যত। ওয়াহাবী ও তাদের অনুসারীদের ইসলাম প্রীতি অপেক্ষা ক্ষমতাপ্রীতি যে প্রধান তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখেনা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত তার সিলসিলা বজায় আছে। এইতো সেদিন আমরা দেখলাম তাদের তা-ব। ধর্ম মানুষের স্পর্শকাতর অনুভূতি। একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নব্য আধিপত্যবাদীরা নানা কৌশলের ছক আঁকছে। আরবি-ফারসি দ্বন্দ্ব তুলে এরা নতুন করে ক্ষমতার প্রতি ধাবিত। বাংলা তথা ভারতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে অনেক আধ্যাত্মিক মনীষীর আগমন ঘটেছে। তাঁরা নামাজ রোজাকে আরবি ভাষার ‘সালাত’ ‘সিয়াম’ প্রবর্তনের খায়েশ করেন নি। আমরা হঠাৎ করে অতিমুসলিম সেজে প্রকারান্তরে আল্লাহর মাহাত্ম্য খর্ব করছি। তিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্বব্যাপি বিরাজমান তা মনে রাখছিনা। আমরা বুঝার চেষ্টা করছিনা, মুসলিম ঐক্যের ধুয়া তুলে যারা হেজাজ দখল করেছিলেন, শোনা যায়, তারা তলে তলে সেই ইহুদিদের সাথে সখ্য রাখছে। এই যে জেরুজালেমবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তার তেমন প্রতিক্রিয়া ওয়াহীবাদী বা তাদের পদলেহীদের নেই। আগেই বলেছি সবভাষা আল্লার সৃষ্টি। চারটি স্বীকৃত প্রধান আসমানি কিতাবের মধ্যে তাওরাত, হিব্রু ভাষায় অবতীর্ণ। ইহুদিদের আমরা অভিশপ্ত ভেবে এসেছি, অথচ তাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষাও আল্লাহর। সুতরাং ভাষা নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি কতখানি যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখার অবকাশ আছে। মনে রাখা দরকার, মুখে উচ্চারণ অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস কোনোটিই ¯্রষ্টার কাছে উপেক্ষার নয়।
বিশেষজ্ঞগণ জানেন, ‘তাফসিরে জালালাইন’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাফসির গ্রন্থ। তাঁরা এও জানেন, জালালাইন তাফসিরের হাসিয়া বা টীকা ফারসি ভাষায় রচিত। তাছাড়া ইসলাম সংক্রান্ত প্রচুর গ্রন্থ ফারসি ভাষায় রচিত। সুদীর্ঘকাল এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেন নি। এখন দেখছি, মক্করবাজরা নতুন কৌশলে মেতে উঠেছে। তারা কি জানেনা, ‘ওয়াল্লাহু খায়রুল মাকেরিন’ আল্লাহ অধিকতর কৌশলী। তিনি বোঝেন, কার স্বার্থে এই নব্য আয়োজন। সুতরাং ফারসি শব্দ আর আরবি শব্দের বিতর্ক তুলে মানুষে মানুষে বিভাজনের দেয়াল তোলা মানবধর্ম অস্বীকারের সামিল। আমরা এই সহজ বিষয়টি বুঝলে মানবতা মুক্তি পাবে এবং ওয়াহাবীদের অপকৌশল নস্যাৎ হবে।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী