অরক্ষিত রেললাইন ঝুঁকিতে জনজীবন।। দেড় বছরের ১১ জনের মৃত্যু

আপডেট: মে ৭, ২০১৭, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

নগরীতে রেললাইনের দুইপাশ অরক্ষিত থাকায় ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে জনজীবন। রেললাইনের দুপাশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পথচারী ও যানবাহন চলাচল করাই এ ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে ট্রেন চলাচলও ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠছে। সম্প্রতি নগরীর কাদিরগঞ্জ গ্রেটাররোড, ভদ্রা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযের চারুকলা অনুষদের গেট সংলগ্ন এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই পারাপারের সময় কিংবা বাজার এলাকায় রেললাইন দিয়ে হাঁটার সময় কাটা পড়ে মারা যান। এর বাইরে আত্মহত্যা ও অন্যত্র খুন করে রেললাইনে এনে ফেলে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
নগরীর কোর্ট স্টেশন থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনের দুইপাশের জায়গার পাশ দিয়ে ছোটবড় দোকান ও বস্তি গড়ে উঠেছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব বস্তিতে ঝুপড়িঘরের সংখ্যা সহ¯্রাধিক। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গার দুই পাশে রয়েছে অগণিত দোকানপাট। রাজশাহী রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত প্রায় দেড় বছরে ১১ জন ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
রাজশাহী রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বলেন, রেলের দুপাশে ১০ গজ বা ৩০ ফুট জায়গা রেখে দোকান বরাদ্দ দিতে হবে। অনেকে নিয়ম মেনে দোকান করছেন। আবার কেউ কেউ করছেন না। তবে কর্তৃপক্ষ রেললাইনের আশেপাশে কিছু দোকান কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে। আবার কিছু দোকান দখল করে রেখেছে রেলের জায়গা। এসব অবৈধ দোকানের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে রেল কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান চালায়। এছাড়া রেল লাইনের আশেপাশে যেসব বস্তি রয়েছে সেগুলোর নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেয়।
পথচারীদের জন্য এর মধ্যে নগরীর কোর্ট স্টেশন, বহরমপুর বাইপাস মোড়, কাদিরগঞ্জ, রেলগেট, ভদ্রার মোড়, মেহেরচন্ডী, রাবির চারুকলা অনুষদের গেট, হরিয়ান ও আড়ানি বাজার সংলগ্ন রেল ক্রসিং ট্রেন চলাচলের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এসব জায়গায় রেল ক্রসিং থাকার পরেও ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি মানুষ ট্রেনের নিচে পড়ে পৃষ্ট হয়েছেন। ফলে ক্রমেই এগুলো স্থান মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
এছাড়া দেখা যায়, রাবির চারুকলা অনুষদ গেটের সামনে সাইনবোর্ডে নিজ দায়িত্বে পথচারীকে পার হতে বলা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোন রেল ক্রসিং নামানোর ব্যবস্থা নেই। এই সাইন বোর্ড দিয়েই দায় সেরেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেললাইনের ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকান ও ঝুপড়িঘরের কারণে রেললাইনের আশপাশ যেন ব্যবহৃত হচ্ছে নিজেদের বাড়ির উঠোনের মতো। এছাড়া রেললাইনের ওপর দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করছে সাধারণ মানুষ ও হালকা-ভারী যানবাহন। বিশেষ করে অরক্ষিত অবস্থায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততম জনবহুল জায়গা কোর্ট স্টেশন, বহরমপুর বাইপাস মোড়, দড়িখরবোনা মোড়, রেলস্টেশন, ভদ্রারমোড় রেল লাইনের দুপাশের বেশিরভাগ জায়গা। এসব স্থানে রেল দুর্ঘটনার ঘটনা ক্রমাগত বেড়েছে।
এসব অরক্ষিত রেলপথ দিয়ে মানুষ সহজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। রেলকর্তৃপক্ষের তেমন নেই কোনো নজরদারি। বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে রেলের দুপাশ দখল করেছে ছিন্নমূল, হতদরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষ। ভাগ্য অন্বেষণে মাথা গোঁজার জন্য রেলের অরক্ষিত জায়গায় গড়ে তোলে দোকানপাট ও ঝুঁপড়িঘর। তাতে গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেও বাস করে তারা।
রেল কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েও রেললাইনের দুই পাশের বস্তি এবং দোকানপাট সরাতে পারছে না। মাঝে মাঝে রেললাইনের দুই পাশের এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান কার্যক্রম সক্রিয় দেখা যায়। এই বস্তি ও দোকানপাট বাজার সরানোর কিছুদিন পর আবার যে যেভাবে পারে বসে পড়ে দোকানের পসরা সাজিয়ে।
রাজশাহী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকবর হোসেন জানান, চাঁপাইনবাজগঞ্চের রহনপুর থেকে রাজশাহীর হরিয়ান পর্যন্ত ট্রেন দুঘর্টনায় গত দেড় বছরে ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৮ জন এবং ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৩ জন নিহত হওয়ার ঘঠনা ঘটেছে।
রেলওয়ের সুত্র মতে, সাধারণত রেললাইনের দুই পাশের দূরত্ব প্রায় ৩০ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও তা কেউ মানছে না। দুই পাশ থেকে দুটি ট্রেন একই সময়ে এলে আটকে যাওয়া মানুষের জন্য ঘটে বিপত্তি। লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে বা পাশ ঘেঁষে দোকানিরা কাজ করছেন। এছাড়া রেলের আশপাশে বস্তির মানুষজনও রেলের আশপাশেই ঘুরাফেরা করে। এর মাঝেই আসা-যাওয়া করে রাজশাহী-খুলনা-ঢাকাগামী ট্রেন। ট্রেন আসামাত্র বিক্রেতাদের কেউ কেউ তখন আশপাশে লোকদের সতর্ক করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রেললাইনের আশপাশে ১০ ফুট থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত সব সময় থাকা নিষেধ। তবে এ নিয়মকানুন বা নিষেধাজ্ঞা মানছে না কেউ।
উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার প্রকৌশলী মাহবুবুল হোসেনের ছেলে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ আহসান সজিব (২১) দরিড়খোরবোনা এলাকায় রেল লাইনে রাত ৮টার দিকে কাটা পড়েন।