অসামাজিকতার বেড়াজাল

আপডেট: এপ্রিল ১, ২০২২, ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

নাহিদ হাসান রবিন


ছেলে মেয়ে দুজন দুজনকে পছন্দ করে। দুই পরিবারের সবাই সবাইকে চেনে-জানে, এরপরেও নাকি কন্যা দেখার জন্য কয়েক ডজন লোক আসতে হবে কনের বাবার বাড়িতে। বরের বোন-দুলাভাই, অমুখ তমুখ আরো কাকে কাকে না নিয়ে আসলে নাকি হবেই না। সায়রার বাবা কন্যার বিয়ের জন্য তাদের আসতে বলেন। একটা ধুমধামের মধ্য দিয়ে বর পক্ষ এসে কন্যা দেখে আর্শিবাদ করে গেলেন। কোর্ট-প্যান্ট পরা ভদ্রলোকগুলো পেট পুরে খেয়ে গেলেও, বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে যেতে পারলেন না। অথচ কথা ছিলো এসব লোকজনই নাকি বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করবেন।

কি আর করা, কন্যার বাবা বলে কথা, একটা দায় মনে হয় থেকেই যায়। না হলে এতোগুলো রাম গাঁধাকে পেট পুরানো লাগে। কোনো কারণে বিয়ে ভেঙে গেলে এই আজব সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। সায়রার বাবার মতো প্রতিবাদী মানুষও মেয়ের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে সমাজ নামক অসমাজের অসামাজিক এসব বিষয় মেনে নেয়। সায়রার বাবা আগাগোড়া একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। মনের খোরাক মেটাতে একটু-আধটু লেখালেখি করেন। তবে সংগীতে রয়েছে তার অবাধ বিচরণ। সায়রা তার একমাত্র কন্যা। এলাকায় সায়রাদের পরিবারের একটা নাম ডাক আছে সেকাল থেকে।

এবাড়ির লোকজন অনেক দিন আগে থেকেই শিক্ষার আলোয় আলোকিত। সায়রাদের পরিবারের সবাই চাকরিজীবি। কেবল সায়রার বাবাই চাকরি করেন না। মাধ্যমিক পাশ দেবার পর গ্রামের বাজারে বইপত্র আর স্টেশনারিজের দোকান করে বসেছেন। আয়

রোজগার ভালো। দোকানি করেন আর সংস্কৃতি চর্চা করেন। এলাকার সচেতন মহলের সাথে তার ওঠা বসা। বাবা হিসেবে মেয়েকে তার মতো করে মানুষ করবেন, তার পছন্দের একজন ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন এমন ভাবনা সায়রার বাবারও ছিলো। থাকারই কথা। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তো আর হয় না। মেয়েরও একটা ইচ্ছে থেকে যায়। ইচ্ছে থেকে যায় মেয়ের মা বা পরিবারের অন্যদেরও। বলতে গেলে এক রকম অনিচ্ছাকৃতভাবেই সায়রার বিয়েতে রাজি হয় তার বাবা। কারণ মেয়ে ছেলেকে পছন্দ করে।

এখানে আর কোন কথা থাকতে পারে না। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করেই সায়রার বাবা রাজি হয়ে যায়। পাড়া গাঁয়ে বাস করে সায়রারা। এখানকার নিয়মনীতি মেনেই সবাইকে বাস করতে হয়। গ্রাম্য একটা প্রবাদ আছে, হাজার কথা না হলে নাকি বিয়ে হয় না। সায়রার বিয়ের ক্ষেত্রে হাজার কথা নয়, কয়েক হাজার

কথা হওয়ার পর অবশেষে বিয়ে ঠিক হয়। ছেলে মেয়ের পছন্দের বিয়েতে এমনটি হবার কথা না হলেও এই বিয়েতে তা হয়েছে। যদিও বরের বাবা মা দুজনই শিক্ষিত এবং সরকারি চাকরিজীবি। কিন্তু তাতে কি, তারা গ্রামের সামাজিকতা নামক অসামাজিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেননি আজও। এখান থেকে মুক্ত হতে অন্তত আরও এক প্রজন্ম পার হতে হবে। কন্যা দেখে যাওয়ার প্রায় মাস খানেক পরে বর পক্ষের বাড়িতে দু-পক্ষের জনা বিশেক লোকজন বসে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলো।

বিয়েতে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা না থাকলেও, কন্যাকে সাজিয়ে দেবার জন্য ভরি পাঁচেক সোনা আর ঘর সাজানোর জন্য কিছু আসবাবপত্রের আবদার রাখলেন বরপক্ষরা। ভিন্ন আঙ্গিকের যৌতুক যেটা আর কি! কন্যার বাবা তাতেও রাজি হয়ে গেলেন। কন্যা দেখার দিন খাবার দাবারের যেরকম আয়োজন ছিলো, আজ তার কিঞ্চিৎ আয়োজনও নেই। মানুষ না জানলেও, দেখাদেখিতে অনেক কিছু শেখে। এখানে এমটিও চোখে পড়লো না। বর পক্ষ বলে কথা। তাদের কোন ভুল নেই। যত ভুল কনে পক্ষের। বিয়ের দিন বেলা দুইটায় বরযাত্রী এলো। সত্তর/আশি জন লোক আসার কথা থাকলেও, তারা এসেছিলো প্রায় দেড়শো লোক। এতো লোক বেশি আসার কারণে কনের বাবার ঘাবড়ে যাওয়ার কথা।

তিনি কিন্তু একটুও ঘাবড়ায়নি। টু শব্দও করেনি। কষ্ট করে হলেও, তিনি আয়োজন করেছিলেন অনেক বেশি। তাই মেহমানদারীতে কোনো ত্রুটি পড়েনি। অনেক আনন্দ উল্লাসে বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। কনে বিদায়ের সময় বরপক্ষের একজন বেশ উঁচু স্বরে বলে বললেন, এখানকার সেলামীর জিনিসপত্রগুলো বুঝিয়ে দিন। যথাযথভাবে তাদের জিনিসপত্রগুলো বুঝিয়ে দিয়ে কনে বিদায় দেয়া হলো। পরদিন বৌভাত অনুষ্ঠান। কনে পক্ষরা যাবে বর পক্ষের বাড়িতে। তাদের সাথে কথা আছে, সত্তর/আশি জন লোক যাবে সেখানে। কনের বাবা সে মোতাবেক নির্বারিত লোকের চেয়ে কম লোকজন নিয়ে সেখানে যান। প্রথা অনুয়ায়ী দই-মিষ্টি, পান-সুপারী, বাজারের সেরা মাছ এসব নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। খাবার শেষে বর কনেকে নিয়ে আসার পালা।

বর কনের সাথে বরের বাড়ির জামাইদেরও নিয়ে আসতে হবে। তারা একদিন থাকবে। প্রথা অনুযায়ী তাদেরকে আবার উপঢৌকনও দিতে হয়। গ্রাম্য সমাজে এটা সেকালের রীতি। এই রীতি ভাঙ্গার শক্তি কার আছে! মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, তবে গ্রামের অনেক লোকজনই এইসব অসামাজিকতা থেকে বের হতে পারে নাই। সায়রার শ^শুড় বাড়ির লোকজনও অসামাজিকতার জালে আটকে আছে। বর কনের সাথে যে লোকগুলো কনের বাবার বাড়ি যায়, আঞ্চলিকভাবে তাদের বলা হয় কোলদারা। সাধারণত বাড়ির জামাই আর বরের বন্ধুরা কোলদারা হয়। ভোটের সময় যেমন ভোটারদের ভাব বেড়ে যায়, গ্রাম এলাকায় বিয়ের সময় তেমনি কোলদারাদের ভাব বেড়ে যায়। এদের কথার কিঞ্চিৎ হেরফের করলেই, একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে দেয়। রাগ-অভিমানের শেষ থাকে না তাদের। তাই কোলদারাদের নমনীয়ভাবেই দেখে সবাই। অন্যান্য বিয়েতে সাধারণত ২ থেকে ৫ জন কোলদারা দেখা গেলেও, এখানে কোলদারা হলো বারো জন। এখানেও বলার কিছু নেই।

কনের বাবা বলে কথা। বর পক্ষের সকল আবদার আর অসামাজিকতা মেনে নিতেই হবে। এতোগুলো লোকের খাবার দেয়া বড় কথা নয়, বড় কথা হলো বিয়ে উপলক্ষে দুই বাড়িতেই অনেক মেহমান এসে ভরে গেছে। নিজের বাড়ি তো দূরের কথা, পাড়ার অনেক বাড়িই ভরে গেছে মেহমান দিয়ে। তার উপর এতোগুলো লোককে রাতে থাকতে দেয়ার বিষয়টাই বড়। শহর হলে আবাসিক হোটেলে ব্যবস্থা করা যায়। এটা গ্রাম। এইটুকু বোঝার মতো শক্তি এই শিক্ষিত লোকগুলোর নেই। অগত্যা ঢেকি গেলার মতো বর কনে আর কোলদারাদের নিয়ে আসা হয় কনের বাবার বাড়িতে। রাতে কোলদারাদের খানাপিনার পরে শোবার ব্যবস্থা করা হয়। মশারি, কয়েল গুছিয়ে দিয়ে একজন ছেলেকে সেখানে রাখা হয় তাদের খেদমত করার জন্য।

রাত বারোটায় সেই ছেলের মাধ্যমে কোলদারারা বর পক্ষকে জানালো, তাদের সিগারেট দিতে হবে। এটা নাকি নিয়ম। যদি নিময়ই হয়ে থাকে, তবে কন্যার বাবার দায় থেকেই তাদের সিগারেট দিতে হবে। ভাগ্যিস রঙিন পানির বোতল চায়নি। এই গভীর রাতে সেসব বোতল আবার কোথায় পাওয়া যেতো। তাছাড়া কনে পক্ষের কোনো লোকজন এসব বোতলের সাথে পরিচিত না। গভীর রাত, আশে পাশে কোনো দোকান নেই। দুজন ছেলেকে বাইক নিয়ে সিগারেট আনার জন্য পাঠান হলো বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরের এক বাজারে। কোলদারাদের মুখে হাসি ধরে রাখতে। এরা না হাসলে কনের অমঙ্গল হতে পারে।

আজকের এই সভ্যতার যুগেও এমন প্রথা আছে কল্পনাই করা যায় না। তাহলে কি হবে মানুষের পড়া লেখা করে। কন্যার বাবা বলে তার এতোটা দায় কেন। রাত দেড়টায় কোলদারারা জনপ্রতি বিশ শলাকার এক প্যাকেট সিগারেট পেয়ে মহা খুশি। নিজেরা কিনে খায় বিড়ি। এখানে পাচ্ছে সিগারেট। খুশি হবারই কথা। তাদের খুশিতে মনে হলো কন্যা পক্ষের লোকজনকে এভাবে হয়রানি করা আর অন্যের কাছে চেয়ে নেয়ার মধ্যেই তাদের সুখ। একবারও ভাবলো না এসব ছ্যাবলামী ভদ্রলোকের পরিচয় বহন করে না। তাদের চোখ মুখ দেখে মনে হলো এটা ছ্যাবলামী নয়, এটা তাদের ভদ্রতা।

পরদিন সকালে নাস্তা করার পর কোলদারাদের সাথে কনের বাড়ির লোকজনের পরিচয় পর্ব ও কোলদারাদের উপঢৌকন দেয়ার পর্ব। বড় ঘরটিতে কোলদারাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। একপাশে কনে পক্ষের লোকজনের বসার ব্যবস্থাও করা হয়। এক এক করে কোলদারারা পরিচিত হচ্ছেন আর কনের বাবা-মা তাদের হাতে উপঢৌকন হিসেবে সার্ট-প্যান্টের কাপড় তুলে দিচ্ছেন। কোলদারারা গাল ভরা হাসি দিয়ে উপঢৌকন গ্রহণ করছেন। তাদের চোখ মুখে মঙ্গল গ্রহ জয় করার মতো হাসি। এর মধ্যে কোলদারাদের মধ্যে সবার বড় যিনি, তিনি বলে বসলেন, দুজন কোলদারা আসতে পারেননি। তাদের জন্য উপঢৌকন দিতে হবে কিন্তু। কনে পক্ষের লোকজন পুরো অবাক। হায় আল্লাহ, এ কোন পরিবারে মেয়ে বিয়ে দিলাম। কিন্তু মুখ খুলে বলার উপায় নেই। হায়রে শিক্ষিত সমাজের মানুষ। উপঢৌকন চেয়ে নিতেও একটু লজ্জাবোধ নেই। কনের বাবা অনেক কৌশলী মানুষ। তিনি আরো কিছু কাপড় বেশি করে নিয়ে এসে রেখেছিলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় তাদের জন্য দেয়া হবে। বরপক্ষের লোকজনের চোখে মুখে হাসির ঝিলিক…