অস্তিত্ব হারাতে বসেছে খরস্রোতা আত্রাই নদী

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০২১, ১০:০০ অপরাহ্ণ

জিল্লুর রহমান,মান্দা:


শুষ্ক মৌসুমে ভারতের অভ্যন্তরে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় অস্তিত্ব হারাতে বসেছে এক সময়ের খরস্রোতা আত্রাই নদী। উত্তাল নদীটি এখন শুধু নামেই। তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পরিণত হয়েছে মরা খালে। গত মঙ্গলবার (১৩) থেকে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৫ বারের মত শুকিয়ে গেল নদীটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্রাই নদীর উৎসের অববাহিকায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া, ভারতের অভ্যন্তরে সাময়িক বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার, পলি জমে তলদেশ ভরাট, ইরিগেশনের সময় ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারসহ জলবায়ুর পরিবর্তন নদীটির অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণ। তারা আরও বলেন, জরুরি ভিত্তিতে তলদেশ ড্রেজিং, রাবার ড্রাম তৈরি করে পানি সংরক্ষণ ও ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে দিলে অন্যান্য নদ-নদীর মত মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে না নদীটি।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ভারতের হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নদীটির উৎপত্তি। এরপর ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর হয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। প্রত্যেক খরা মৌসুমে ভারতের অভ্যন্তরে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন শেষে বাঁধ কেটে দিলে নদীর পানিপ্রবাহ আবারও স্বাভাবিক হয়ে যায়। বারবার বাঁধ দেয়া কারণেই ক্রমান্বয়ে নদীর তলদেশ ভরাট যাচ্ছে। এ কারণে প্রতিবছর খরা মৌসুমে শুকিয়ে যাচ্ছে নদীটি।
বয়োবৃদ্ধ তনজেব আলী বলেন, খুব বেশি আগের কথা নয়। আশির দশক জুড়েই নদীটির ভরা যৌবন ছিল। সে সময় আত্রাইয়ে তর্জন-গর্জনে মানুষের বুকে কাঁপন সৃষ্টি হতো। নব্বইয়ের দশক থেকে ক্রমেই যৌবন হারাতে বসে নদীটি। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে নদীটির আর হারানোর কিছুই নেই। সরু মরা খালে পরিণত হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভরা যৌবনে আত্রাই নদীর ঢেউয়ের তালে চলাচল করত পাল তোলা অসংখ্য নৌকা। ভাটিয়ালি আর পল্লীগীতি গানের সুরে মাঝিরা নৌকা নিয়ে ছুটে চলতেন জেলার আত্রাই, রানীনগর, মান্দা, মহাদেবপুর, ধামইরহাট, পত্মীতলাসহ অন্যান্য জেলা ও উপজেলার নদী কেন্দ্রিক ব্যবসা কেন্দ্রগুলোতে। এ নদীকে ঘিরে বিভিন্নস্থানে গড়ে উঠেছে বড়বড় হাটবাজার। ওই সময় আত্রাই নদীর ছিল পূর্ণ যৌবন। এ নদীকে অবলম্বন করে অসংখ্য মানুষ ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন জীবিকার সহজপথ খুঁজে পেয়েছিলেন।
এলাকাবাসি জানান, শুধু হাটবাজারই নয়, এ নদী কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে অনেক জনপদ। নদীর অথৈ পানি দিয়ে কৃষকরা দুইপাড়ের উর্বর জমিতে ফসল ফলান। প্রকৃতির অফুরন্ত পানিতে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার জুড়ে সবুজের সমারোহে ভরে উঠে আত্রাই নদীর দুই ধারের জমি।
তারা আরও বলেন, জীবিকার সন্ধানে নদী সংলগ্ন ও আশপাশের এলাকায় অসংখ্য জেলে পরিবারের বসতি গড়ে উঠেছিল। ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছের অফুরন্ত উৎস ছিল এই নদী। মাছ পাওয়া যেত বছরজুড়ে। জীবিকার তাগিদে জেলেরা রাতদিন ডিঙি নৌকায় জাল দড়ি নিয়ে চষে বেড়াতেন নদীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ধরা পড়তো প্রচুর মাছ। সেই সোনালী দিন শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কালের বিবর্তনে সেই নদী এখন মরা খালে পরিণত হওয়ায় আত্রাইকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা অনেক হাটবাজার এখন হয়েছে বিরান অঞ্চল। সেচ সংকটে পড়ছে কৃষি জমিগুলো। জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে দুর্দিন। এক সময়ের ব্যবসা বাণিজ্যের উৎসগুলো হয়ে গেছে বন্ধ। এ সবই এখন কালের সাক্ষি। ঐতিহ্যের দিক থেকেও এ এলাকার নদ নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আত্রাই নদী। ভৌগলিক ভাবেও নাম-ডাক ছিল এই নদীটির।
নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খান বলেন, ইরিগেশনের সময় ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, পলি জমে তলদেশ ভরাট ও অনাবৃষ্টির কারণে গ্রাউন্ড ওয়াটার সম্পূর্ণ রিচার্জ না হওয়া নদীটি শুকিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। নদীতে পলি জমে ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দুই পাড়ের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আঘাত হানে। পানির প্রবল চাপে অনেক সময় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। নদীর গভীরতা বৃদ্ধি, রাবার ড্রাম তৈরি করে পানি সংরক্ষণসহ নিচের পানির কম ব্যবহার করলে এটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবেও মন্তব্য করেন পাউবোর এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডা. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ভূ-গর্ভস্থ পানির সঙ্গে নদীর স্তরের একটা সংযোগ রয়েছে। কোন কোন সময় ভূ-গর্ভস্থ পানি নদীতে আবার নদী থেকে পানি ভূ-গর্ভস্থ স্তরে রিচার্জ হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অনাবৃষ্টির কারণে প্রকৃতির এসব স্বাভাবিক কাজে বিঘœ ঘটছে। এছাড়া নদীর উৎসের অববাহিকায় বৃষ্টিপাত কম ও ভারতের অভ্যন্তরে সময়ে অসময়ে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আজ আত্রাই নদীর এ অবস্থা। নদীটির অস্তিত্ব হারিয়ে গেলে জীবন-জীবিকার ওপর বিরুপ প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, নদীর গতিপথ ঠিক রাখতে যত্রতত্র বালু উত্তোলন বন্ধসহ বিশ্ব নদী আইন মেনে পানির সুষম বন্টন হলেই শুধু আত্রাই নয় অন্যান্য নদীগুলোরও অস্তিত্ব বিলিন হবে না।
স্থানীয় সুধীজনরা বলছেন, দখল আর দুষণে নদীটির অস্তিত্ব বিলিন হতে চলেছে। সরকারের নজর না থাকার সুযোগে এক শ্রেণির দখলবাজ নদীটির অনেকস্থান দখলে নিয়ে ভরাট করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন ও পাড় কেটে মাটি বিক্রির প্রতিযোগিতা। এতে হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে নদীটির অস্তিত্ব। অচিরেই ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মানচিত্র থেকে মুছে যাবে এক সময়ের খরস্রোতা এই নদীটির নাম। এতে উপজেলার অন্তত: ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। হুমকির মুখে পড়বে এলাকার জীববৈচিত্র।