অ্যামোনিয়া গ্যাস আক্রান্ত মানুষ || খোলা আকাশের নিচে সার

আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০১৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব



দীর্ঘ এক বছর ধরে বিসিআইসিয়ের ইউরিয়া সার খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে পরিবেশ। এতে ওই এলাকায় বসবাসরত মানুষরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পার্শ্বক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। সন্ধ্যার পর থেকেই ওই এলাকার মানুষজন ঘরে টিকতে পারছেন না। সন্ধ্যা থেকে চোখ জ্বালা করে পানি পড়তে শুরু করে এবং সঙ্গে সঙ্গে হাঁচি শুরু হচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোলা আকাশের নিচে সার পড়ে থাকলে সারের মধ্যে অ্যামোনিয়া গ্যাস বাতাসের সঙ্গে মিশে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক উপসর্গ তৈরি করে। দীর্ঘ সময় কেউ এই পরিবেশে থাকলে তার মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিসিআইসি সার গুদাম সূত্রে জানা গেছে, নগরীর শিরোইল কলোনিতে অবস্থিত বিসিআইসি পরিচালিত সার গুদামে প্রধানত শাহজাহাল ফার্টিলাইজার প্রস্তুতকৃত ইউরিয়া সার রাখা হয়। এছাড়া চিন, আবুধাবি ও কাতার থেকে উৎপন্ন ইউরিয়া সার আমদানি করে গুদামে রাখা হয়। ওই গুদামে ৮ হাজার মেট্রিক টনের ধারণ ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সার রাখা হয়েছে ১৮ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে গুদামের বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। সারগুলো রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, এক বছর ধরে সারগুলো খোলা আকাশের নিচে রয়েছে। বৃষ্টির পানি ও রোদের তাপে ৫০০ বস্তার মধ্যে ৬০টি বস্তার সার গলে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। খোলা আকাশে রাখা সারের তলার দিকের বহু বস্তা শক্ত হয়ে গেছে। যা কোনো কাজে লাগানো যায় না বলে কয়েকজন ডিলার জানিয়েছেন।
দীর্ঘ সময় ওই এলাকায় খোলা আকাশের নিচে সারের বস্তা পড়ে থাকায় গুদামের পাশের জনবহুল শিরইল কলোনির মানুষজন বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পার্শ্বক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তারা বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় তীব্র ঝাঁজ। চোখ জ্বালা করে, পানি পড়তে শুরু করে। কেউ এই এলাকায় আসতে চায় না। অনেকের পেট ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হাঁচি, চোখ জ্বালা করাসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিসিআইসি গুদামের পাশেই রাজশাহী জজ কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা শামসুন্নাহার মুক্তির চেম্বার। তিনি বলেন, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, সন্ধ্যার পর থেকে চেম্বারে টেকা যায় না। বাসায় গিয়ে দরজা-জানলা বন্ধ করে রাখলেও  অসহ্য ঝাঁজে চোখ জ্বালাপড়া করে। ভয়ে কোনো ক্লায়েন্ট, আত্মীয়স্বজন সন্ধ্যার পর এই দিকে আসতে চায় না।
ওই এলাকার এক দোকানদার বলেন, সন্ধ্যার পর নগরীর বালিয়াপুকুর থেকে আমার এক আত্মীয় এসেছিল। ঝাঁজে টিকতে না পেরে তিনি রাগ করে এই এলাকা থেকে চলে গেল। চা এর অর্ডার দিয়েছিলাম, তবু সে চা খেল না। ওই দোকানদার বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে থাকার কারণে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, কিন্তু নতুন কেউ কোনো কাজে এই এলাকায় এলে টিকতে পারে না।
গত সোমবার এই প্রতিবেদকও ওই এলাকায় গিয়ে ঘটনার সত্যতা টের পায়। কিছুক্ষণ পরও তার চোখ জ্বালা করে, পানি পড়তে শুরু করে।
রাজশাহীর পরিবেশ অধিদফতর এবং বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, অবশ্যই খোলা আকাশের নিচে সার পড়ে থাকলে ক্ষতি হবে। কারণ সারের মধ্যে থাকা অ্যামোনিয়া গ্যাস বাতাসে মিশে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করে। যা শরীরে মিশে গিয়ে নানা ধরনের জটিল রোগ তৈরি করতে পারে। তবে সরকারি গুদাম হওয়ায় নাম প্রকাশ করে উদ্ধৃতি দিতে অনীহা জানায় তারা।
রাজশাহীর বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আবদুল হাই বলেন, অবশ্যই ক্ষতি হবে। পরিবেশ ও মানুষ-উভেয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক বলেন, ভালো ইউরিয়া সার হলেও কোনো ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা না। এই সার ভালো নয় বলেই এই ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।