আইএস ভাবাদর্শেই নব্য জেএমবির উত্থান?

আপডেট: জুলাই ২৮, ২০১৭, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

নুরুজ্জামান লাবু


বাংলাদেশে নব্য জেএমবি নামে যে সংগঠনটির কথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তা কি শুধু আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস  ভাবাদর্শের সংগঠন? নাকি এর সঙ্গে আইএসের সরাসরি কোনও যোগাযোগ রয়েছে? যদিও ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০টি হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। আইএসের প্রোপাগান্ডা ম্যাগাজিনগুলোতে বাংলাদেশের কথিত আমির আবু ইব্রাহীম আল হানিফ এবং আবু দুজানা নামে সাক্ষাৎকারও ছাপা হয়েছে। এমনকি ম্যাগাজিনগুলোতে ছাপা হয়েছে বিভিন্ন হামলার খবরও। এসব কারণেই নব্য জেএমবির সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ রয়েছে বলে অনেকে ধারণা করেন। কিন্তু সেই যোগাযোগ কতটা ঘনিষ্ঠ? যদিও বরাবরই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই যোগাযোগের কথা অস্বীকার করে আসছে। তাদের ভাষ্য, ‘হোমগ্রোন জঙ্গিরা’ই বাংলাদেশের সব হামলা ও হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ‘নব্য জেএমবি’র সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের কোনও এক সময়ে। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী দেশে এসে প্রথমে আইএসের জন্য যোদ্ধা সংগ্রহের কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে সে প্রথমে জুনুদ আল তাওহীদ আল খালিফা নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সেই সংগঠন থেকেই জন্ম হয় যে সংগঠনের, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকেই বলছে ‘নব্য জেএমবি’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এই নব্য জেএমবি সৃষ্টিতে যে পাঁচ জনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তামিম চৌধুরী। বাকি চারজন হলোÍসারোয়ার জাহান ওরফে মানিক, আব্দুস সামাদ ওরফে আরিফ ওরফে মামু, শাইখ আবুল কাশেম ও মামুনুর রশীদ রিপন। এদের মধ্যে তামিম ও মানিক সিটিটিসি ও র‌্যাবের অভিযানে নিহত হয়েছে। আবুল কাশেম গ্রেফতার হয়েছে, আর আব্দুস সামাদ ও রিপন এখনও পলাতক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে নব্য জেএমবি আইএসের ভাবাদর্শের একটি সংগঠন। আইএসের কিছু কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে তারা দেশে কথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভাবাদর্শের পাশাপাশি আইএসে ইতোমধ্যে যেসব বাংলাদেশি তরুণ সরাসরি যোগ দিয়েছে, তাদের সঙ্গে নব্য জেএমবির ভার্চুয়াল যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, ‘বাংলাদেশে আইএসের কোনও সাংগঠনিক উপস্থিতি নেই। কিংবা যেসব জঙ্গি গ্রেফতার করা হচ্ছে তারাও কেউ আইএসের উপস্থিতির কথা কখনও বলেনি। তবে নব্য জেএমবি আইএসের কিছু ভাবাদর্শ অনুসরণ করে। আনসার আল ইসলাম নামে আরেকটি জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার ভাবাদর্শ অনুযায়ী চলে। কিন্তু আন্তর্জাতিক এসব জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক কোনও যোগাযোগ বা অ্যাফিলিয়েশন নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি সংগঠনের পক্ষে অ্যাফিলিয়েট হওয়ার চেষ্টার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে আলাপচারিতায় বলেছেন, নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতারা প্রথম থেকেই সিরিয়ায় থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে তাদের কর্মকা- চালাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযানের পরে জঙ্গি আস্তানা থেকে এমন কিছু তথ্য তারা হাতে পেয়েছেন এভাবেই বিষয়টি জানতে পারেন তারা। প্রাপ্ত ওইসব তথ্যে জানা যায়, আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ‘শামের ভাই’ বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। আইএস অধ্যুষিত সিরিয়ার এলাকাকে ‘শাম’ বলে সম্বোধন করে জঙ্গিরা।
আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত এসব ব্যক্তির সঙ্গে নব্য জেএমবির  কী ধরনের যোগাযোগ হচ্ছে? আর সেসব ব্যক্তিরাই বা কারা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেল্লা হত্যাকা- থেকে শুরু করে, পরবর্তীতে দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা এবং গত বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলাসহ অন্যান্য হামলার বিষয়ে আইএসের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সিরিয়ায় থাকা অজ্ঞাত সেসব ব্যক্তির কাছ থেকে হামলার আগে অনুমতি নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এখনও নব্য জেএমবির তহবিলে যে অর্থ আসছে, তা সিরিয়া থেকেই আসে। হুন্ডির মাধ্যমে এসব টাকা হাতে পাচ্ছে তারা। নব্য জেএমবির সদস্যদের নিজেদের অর্থ-সম্পত্তিও যোগ করা হয় এই তহবিলে।
জঙ্গি নিয়ে কাজ করছেন এমন কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৪ সাল থেকে  অন্তত অর্ধশত বাংলাদেশি তরুণ আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে ইরাক-সিরিয়ায় গেছে। আইএসে যোদ্ধা পাঠানোর মূল হোতা হলো বাংলাদেশ থেকে জাপানে গিয়ে সেদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া সুজিত দেবনাথ ওরফে সাইফুল্লাহ ওজাকি। হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা এই সাইফুল্লাহর হাত ধরে ও তত্ত্বাবধানে আইএসে যোদ্ধা পাঠানোর যাত্রা শুরু হয়। আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়া অন্তত দু’জনের  জবানবন্দিতে এসব তথ্য রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক্স-ক্যাডেট ইসলামিক লার্নিং ফোরাম নামে একটি ক্লোজ গ্রুপের মাধ্যমে সিরিয়ায় যেতে দেশীয় তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। এই ফোরামের দু’জন সদস্যকে ২০১৫ সালের মে মাসে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাছে জানতে পারে এই সাইফুল্লাহ ওজাকির নাম। সাইফুল্লাহ ওজাকি ছিল ওই গ্রুপটির অ্যাডমিন। ধারণা করা হয়, তার মাধ্যমেই সিরিয়ায় গিয়ে আইএসের যোদ্ধা হিসেবে নাম লেখায় বেশ কয়েকজন তরুণ, যাদের মধ্যে এটিএম তাজউদ্দিন, নজিবুল্লাহ আনসারী, ইব্রাহীম হাসান খান, জুনায়েদ হাসান খান, আশরাফ মোহাম্মদ ইসলাম, আসাদুল্লাহ গালিব, জুবায়েদুর রহিম, আরাফাত হোসেন তুষার ও তাহমিদ রহমান সাফির নাম উল্লেখযোগ্য। এরাই মূলত সিরিয়ায় অবস্থান করে বাংলাদেশের নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ধারণা করা হয়, তারাই হচ্ছে দেশি জঙ্গিদের কাছে ‘শামের ভাই’।
তবে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘সাইফুল্লাহ ওজাকির বিষয়ে আমরা কিছু তথ্য পেয়েছিলাম। যারা সিরিয়া যেতে চেষ্টা করেছিল তাদের সে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু তার বিষয়ে বাংলাদেশের গুলশান হামলা বা অন্য কোনও জঙ্গি হামলায় জড়িত থাকার কোনও তথ্য আমরা পাইনি।’
মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ বা ২০১৫ সালে যারা সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল তাদের সঙ্গে নিও জেএমবির কোনও যোগাযোগ পাওয়া যায়নি। সিরিয়া থেকে ফেরা গাজী কামরুস সোহান নামে এক যুবককে আমরা গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করি। সে জানিয়েছে, সে কোনও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। সে নিজে থেকেই মুসলিমদের পক্ষে যুদ্ধ করতে সিরিয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে কথিত মুজাহিদীনদের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে একমত হতে না পেরে ফিরে আসে।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বেশিরভাগ তরুণই কোনও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তারা নিজেরা মুসলিমদের পক্ষে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সিরিয়া গিয়েছিল।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরেকজন কর্মকর্তা বলেছেন, সিরিয়ায় অবস্থানকারীদের সঙ্গে দেশিয় জঙ্গিদের যে ভার্চুয়াল যোগাযোগের তথ্য তারা পাচ্ছেন, তাতে নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করা নেই। একটি নির্দিষ্ট আইডির সঙ্গে মেসেজিং অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। ওই আইডি থেকেই আসে সার্বিক নির্দেশনা। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মতে, তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, কথিত যে আবু ইব্রাহীম আল হানিফের কথা বলা হচ্ছে, তিনি কখনোই দেশের বাইরে অবস্থান করেননি। দেশের ভেতরেই তার অবস্থান ছিল। কারণ মাস কয়েক আগেও এমন একটি বার্তা তারা উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, যেখানে সম্বোধন করা হয়েছে, ‘শাইখ আবু ইব্রাহীম আল হানিফের পক্ষ থেকে ‘শামের ভাইদের’ কাছে পাঠানো বার্তা’। এ কারণে মনে করা হচ্ছে,শাইখ আবু ইব্রাহীম আল হানিফ বাংলাদেশেই বসবাসকারী একজন নাগরিক। এত দিনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে  আশুলিয়ায় র‌্যাবের হাতে নিহত সরোয়ার জাহানই হলো এই শাইখ আবু ইব্রাহীম আল হানিফ বলে মনে করছেন ওই কর্মকর্তা।
এই ভার্চুয়াল যোগাযোগের পরেও নব্য জেএমবিকে শুধু আইএস ভাবাদর্শের সংগঠন বলাটা কতটা যুক্তিযুক্ত? জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রশীদ বলেন, ‘এখনকার ইন্টারনেটের যুগে প্রতিটি তথ্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আদান-প্রদান করা সহজ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে যারা সেখানে (ইরাক-সিরিয়া) গেছে, যদিও তাদের সংখ্যা আন্তর্জাতিক বিশ্বের তুলনায় অনেক কম, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কারও কারও ব্যক্তিগত সংযোগ থাকতে পারে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ আমরা দেখছি না। ব্যক্তিগত কানেকশনের ভিত্তিতে আমরা আইএসের উপস্থিতি বলতে পারি না। মোট কথা অ্যাফিলিয়েট বা বাইয়্যাত যেটাকে বলা হয়, সেটার প্রকাশ্য ঘোষণা আমরা এখনও দেখিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানের জঙ্গি সংগঠনটি আইএসের সমর্থন পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিল। কিন্তু আইএস যেসব সংগঠনকে বাইয়্যাত দেয়, তাদের বিষয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়। কিন্তু আমাদের এখানকার কোনও সংগঠনকে বাইয়্যাত দেওয়ার কোনও তথ্য আমরা পাইনি। তবে একটি জায়গায় ডাউট রয়েছে, তা হলো তামিম চৌধুরী যে কানাডা থেকে আসলো, তাকে বাংলাদেশে কে আনলো? তাকে কি আইএস বাংলাদেশে পাঠালো? নাকি ইসলামি রাজনীতির লোকজন তাকে ইনভাইট করে নিয়ে আসলো? এই সম্পর্কে আমরা সুস্পষ্ট কোনও তথ্য এখনওে পাইনি। তবে আমার কাছে মনে হয় তাকে ডেকে আনা হয়েছে। এর পেছনে পলিটিক্যাল প্যাট্রোনাইজেশন রয়েছে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি বিষয় হলো, আমাদের এখানে যে জঙ্গি সংগঠন সেটাকে তৈরি করতে আইএসের কমান্ড কোনও নির্দেশনা দিয়েছে কিনা? আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে কোনও সেকশন বা শাখা করলে সেটার লক্ষ্য থাকে গ্লোবাল জিহাদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এখানকার ঘটনাগুলোতে মনে হয়েছে, এসব ঘটনার ইমপ্যাক্ট পড়েছে শুধু বাংলাদেশের ওপর। বিদেশিরা বা উন্নয়ন সহযোগীরা সাময়িক সময়ের জন্য চলে গিয়েছিল। আরএমজি সেক্টরের বায়াররা দেশে আসা বন্ধ করেছিল। প্রচার করা হয়েছিল বাংলাদেশের সরকার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। তো এখানে যতগুলো ইমপ্যাক্ট আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে আইএসের কোনও লক্ষ্য পূরণে প্রভাব ফেলছে না। এছাড়া বিভিন্ন হামলায় যেসব অস্ত্রের  ব্যবহার দেখেছি তাতে মনে হয়েছে, আইএস যদি সম্পৃক্ত থাকতো তাহলে আরও বেশি উন্নত প্রযুক্তি দেখা যেত।’
(বাংলা ট্রিবিউন এর সৌজন্যে)