আওয়ামী লীগের ৭৫ বছর, বাঙ্গালী ও বাংলাদেশ

আপডেট: জুন ২৩, ২০২৪, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

আসলাম সরকার


২৩শে জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী বা ‘প্লাটিনাম জুবিলি’। দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং বৃহত্তম এই রাজনৈতিক দলটি জাতীয় উন্নয়নে অদ্বিতীয় ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলছে মহা কর্মযজ্ঞ। তারই ফলে ১৫ বছর ধরে লাগাতার বৃদ্ধি পাচ্ছে জিডিপি ও মাথাপিছু আয়। এমনকী কোভিড ১৯-এর কারণে যখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি তখনও বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়েছি তরতর করে। জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসহ বিভিন্ন সূচকে উন্নতির হাত ধরে বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে মধ্য-আয়ের দেশে। জিডিপি’র আকারে বিশ্বের দুইশোটির বেশি দেশের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৩৫তম।

সবকিছু ঠিক থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তালিকায় জায়গা করে নিবে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। এক সময়ে যে দেশটিকে ব্যঙ্গ করে বলা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি,’ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে সেই দেশটিই এখন উন্নয়নের রোল মডেল ‘রাইজিং টাইগার অব এশিয়া’।
বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে, গত ৭৫ বছরে আওয়ামী লীগের অবদান যা সাদা চোখে দেখা যায় তার চেয়ে অনেক বড়, অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ- বিশ্ব রাজনীতিতে যা নতুন এক আলোকবর্তিকা।

কয়েক হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে মানুষ অবাঙালিদের দ্বারা শাসিত-শোষিত হয়েছে। একসময়ে পৃথিবীর একটি অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অঞ্চল ইংরেজ দুঃশাসনে-লুটপাটে মহা দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে। মহামতি গোখলে বাঙালির চিন্তা ও কর্মশক্তি সর্ম্পকে বলেছিলেন “What Bengal do today, India thinks tomorrow”। ইংরেজদের ‘ভাগ করো, শাসন করো’ [Divide and Rule] নীতির বলি তৎকালীন বাংলা প্রদেশ। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হলে তার বড় শিকার হয় বাংলা। বাংলা বিভক্ত হয় পূর্ব ও পশ্চিমে, পাকিস্তানে ও ভারতে, যদিও বাঙালির বাসভূমি বাংলা অনেক পূর্বেই ইংরেজরা বিহার, উড়িষ্যা, বার্মার (মিয়ানমার) মধ্যে বিভক্ত করে বাংলার আয়তন ছোট করেছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালি রাজনীতিবিদরা গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দৃঢ়ভাবে অনুভব করতে থাকেন।

কেননা, ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হিন্দু-মুসলিম রক্তের হোলি খেলা, লাখো মানুষের শরণার্থী হওয়া, দেশান্তরি হওয়া, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বাঙালি-বিদ্বেষী আচরণ এটা পরিস্কার করে তুলেছিল যে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে বাঙালির অবস্থান অনেকটা প্রভু-ভৃত্যের মতো। সেই বিদেশি শাসন এবং শোষণ বা তার চেয়েও খারাপ। এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় সন্ধানে ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন-এ একটি সম্মেলন হয়। পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ অনেকেই এই সম্মেলনে যোগ দেন। সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন। তার নাম পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের ভাষায়, ‘মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হলো জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম আমার নামের পাশে লেখা আছে ‘নিরাপত্তা-বন্দী’। আমি মনে করেছিলাম পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটি সুষ্ঠু মেনিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম সময় এখনও আসে নাই, তাই যারা বাইরে আছেন চিন্তা-ভাবনা করেই করেছেন।’ পরবর্তীতে এই আওয়ামী মুসলিম লীগই নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামে বাংলা ও বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষকে একত্রিত করে একটা ভাষা-ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র গঠন করা যার নাম বাংলাদেশ, যার ভিত্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদÑবঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘যা তোমরা বিশ্বাস কর, এটা হলো, আমি বাঙ্গালী, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ’। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম, হাজার বছরের কারাবাসের ফসল এই ভাষাভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ যার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘বাঙ্গালী জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল যার ওপর ভিত্তি করে, এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে, সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমরা বাঙ্গালী, আমার ‘বাঙ্গালী’ জাতীয়তাবাদ”। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামের ভাষা-ভিত্তিক এই জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের তথা বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। হাজার হাজার বছরের শাসন-শোষণ-নিস্পেষণে বাঙালি যখন আত্মপরিচয়হীন, আওয়ামী লীগ বাঙালিকে তার শেকড় সন্ধানের মাধ্যমে আত্মপরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়। শুধু তাই নয়, বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এই লড়াই পরবর্তীতে বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত উপনিবেশিক শোষণের শিকার মুক্তিকামী মানুষের সামনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেদীপ্যমান হয়।

জাতি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এই রাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একটি সংবিধান বাঙালি জাতিকে উপহার দেয় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ যার মূল নীতি, যা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এক অন্যতম দলিল। বিশ্বের অনেক বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের সামনে এটি ছিলো একটি আদর্শ সংবিধান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারী জাগরণ ঘটেছে। সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন রাষ্ট্র-সমাজকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছে। আর স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঙালিরা বিশ্বসভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি খাদ্য উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ভাবা যায় মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বে আমরা দ্বিতীয়! ধান, সব্জিসহ আরও অনেকক্ষেত্রেই বাংলাদেশের উৎপাদন ঈর্ষণীয়। অথচ এই বাঙালিরাই কিনা কয়েক দশক আগে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত পেতো না!

আওয়ামী লীগের হাত ধরেই এদেশের শিক্ষা, ক্রীড়া, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষতঃ সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয়েছে; পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্নফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু সেতু ও বঙ্গবন্ধু রেলসেতু… এই তালিকা দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বাংলাদেশের পতাকাখচিত স্যাটেলাইট আজ মহাকাশে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাংলাদেশের সীমানা বিস্তৃতি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমান আয়তনের জলসীমায়। তথ্য-প্রযুক্তির অন্যতম বাহন ইন্টারনেট পরিসেবা আজ বাঙালির হাতে হাতে, ঘরে ঘরে-লক্ষ্য স্মার্ট বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের অন্যতম একটি সাফল্য ছিলো স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার মুক্তমন্ত্রে উজ্জীবিত বিশ্বস্ত এক কর্মীবাহীনি- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান হেনা যাঁদের অগ্রগণ্য। এই জাতীয় চার নেতা বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে কখনও আপোষ করেন নি। ক্ষমতার চেয়ে আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাকেই তাঁরা শ্রেয়তর মনে করেছেন, হয়েছেন শহীদ। বাঙালির চেতনায় তাঁরা চির অম্লান থাকবেন।

দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের সংগ্রাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জন্মলগ্ন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এই লড়াই চালিয়ে আসছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও এর অব্যবহিত পরে জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যার মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের বুটের নীচে গণতন্ত্র নিস্পেষিত হতে থাকে।

উনিশশো একাশি সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আলোকবর্তিকা হিসেবে অবতীর্ণ হন। তাঁর নেতৃত্বে কেবল গণতন্ত্রই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের দরবারে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি আজ ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় প্রতিষ্ঠা, সর্বস্তরে শিক্ষার বিস্তার, সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন যেমন- আওয়ামী লীগের সংগ্রাম আর সুশাসনের ফল তেমনই আওয়ামী লীগের সোনালী অর্জন। এই অর্জন রক্ষায় আমাদের সকলের সচেষ্ট হওয়া দরকার, তবেই বাঙালি জাতি তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। বঙ্গবন্ধু যেমনটি বলেছিলেন, ‘আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সকল ধর্মের, সকল বর্ণের মানুষের হাজার বছরের মিলিত সভ্যতা ও সংস্কৃতি।

তাতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও উপজাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির যেমন ছাপ আছে, তেমনি আছে মুসলমানদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিশ্রণ। ভারত একটি পলিটিক্যাল ইউনিয়ন আর আমরা একটি কালচারাল নেশন। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পরিচয় বাঙ্গালী। বহুকাল আমাদের একটি নেশন স্টেট ছিল না। সেটি এখন পেয়েছি। সেটি যদি তার সেক্যুলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আমরা টিকিয়ে রাখতে পারি তাহলে বাঙ্গালী জাতি, বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি বিশ্বে একটি আধুনিক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাবেই।’
লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজশাহী