আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ : পরিপ্রেক্ষিত বিচার

আপডেট: জুন ২৩, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

ড. আবুল কাশেম


অধুনা মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনায় প্রায়শই ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিসংগ্রাম’কে অভিন্নার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। আসলে এ বিষয় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়টি হল মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে ৯ মাস ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় যা দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের একাংশ মাত্র। তাই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের সম্পর্কটি অংশ ও সমগ্রের। বাংলাদেশের জনগণ হঠাৎ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেনি। ১৯৭১ পর্যন্ত পৌঁছাতে বাঙালিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল ভাঙ্গার প্রত্যয়ে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনা ধারণ করে বাঙালি জনগোষ্ঠি যে আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়েছে তাই সার্বিক অর্থে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম।
আমাদের মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছে কখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। বৃটিশ আমলে ভারতীয় অন্যান্য জনগোষ্ঠির সাথে বাঙালিরাও আন্দোলন করেছে। এর ফলে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান ও ভারত। কিন্তু বাঙালি স্বাধীনতা পায়নি। বৃটিশের স্থলে আরেক ঔপনিবেশিক শক্তি অভিন্ন ধর্মের আড়ালে বাঙালি জনগোষ্ঠির উপর চেপে বাসে। এখান থেকেই শুরু হয় পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালের মাঝখানেই বহু আন্দোলন-সংগ্রাম মেঘমালার মত একে একে বিন্যস্ত হয়ে মুক্তিসংগ্রামের রূপ লাভ করেছে। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও তার মাধ্যমে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু, সামরিক স্বৈরাচার আইউব খানের শাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র ষাটের দশকের উত্তাল আন্দোলন-মালা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালিদের রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, ১৯৭১ এর অসহযোগ আন্দোলনÑএসব বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক একটি ধাপ।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা তুলনা-রহিত। ১৯৭১ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক দল সাংগঠনিক শক্তি, লোকবল, কর্মসূচি, আদর্শ, নেতৃত্ব ইত্যাদি দিয়ে মুক্তিসংগ্রামকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পূর্বাপর একই রকম ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ বিবর্তনবাদী প্রক্রিয়ায় নিজের কর্মসূচি ও ভাবাদর্শকে ইতিবাচক ধারায় পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে এবং তা জনগণকে জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় উজ্জীবিত করেছে। ১৯৪৯ সালের জুনে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালে এর নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রে এবং পূর্ববঙ্গ প্রদেশে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে কিছু সংখ্যক নেতা ও কর্মী এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, নেতৃত্বের কোন্দলের কারণেই মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে তাঁরা আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। কিন্তু পাকিস্তানের সূচনালগ্নে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের সামনে সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক বিকাশের যে সুযোগ সৃষ্টি হয় তাতে এ কথা বলা সঙ্গত নয় যে, শুধুমাত্র সাংগঠনিক ও নেতৃত্বর কারণে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে কতিপয় নেতা-কমী আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। ওই সময়ে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসার ঝুঁকি ছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকারী নেতৃবর্গ সে ঝুঁকি গ্রহণ করেছিলেন এবং তাতে তাঁরা সফল হয়েছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের গোড়াপত্তনের কারণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অন্যত্র নিহিত। চল্লিশের দশকের মধ্যভাগে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের রাজনীতির একটি অংশে উদারীকরণের হাওয়া লাগে। কালক্রমে মুসলিম লীগ রাজনীতি স্পষ্টতঃ দুটি ভাবাদর্শিক ¯্রােতে বিভক্ত হয়ে যায়। রক্ষণশীল ও মোল্লাতান্ত্রিক ধারাটির নেতৃত্ব দেন খাজা নাজিমুদ্দিন ও মওলানা আকরম খান এবং অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক ও পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ধারাটির নেতৃত্বে আসীন হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম। দ্বিতীয় ধারাটির নেতাকর্মীরা ঢাকায় বেশ শক্তিশালী ছিলেন। অবশেষে বাংলা বিভক্ত হয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গ প্রদেশ সৃষ্ট হলে কলকাতা ও আসামের মুসলিম লীগের উদারনৈতিক ধারার নেতা ও কর্মীরা ঢাকায় সমবেত হন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম দেন। অবশ্য পূর্ববঙ্গে রক্ষণশীল ও মোল্লাতান্ত্রিক ধারাটির মুসলিম লীগের নেতৃত্ব কুক্ষিগতকরণ এবং তাতে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সমর্থন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। নবপ্রতিষ্ঠত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিম-লে যে ধর্মীয় উগ্রতা বিরাজমান ছিল তাতে নতুন সংগঠনটির নামের সাথে ‘মুসলিম’ শব্দটি সংযুক্তির ব্যবহারিক মূল্য ছিল অপরিসীম। তাই সংগঠনটির যাত্রাকালে ‘মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করে আওয়ামী মুসলিম লীগ (জনগণের মুসলিম লীগ) নামকরণ করা হয়। পরে মূল শব্দ ‘মুসলিম’ বিলুপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগের যৌক্তিক বিকাশ ঘটে। এরপর আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদী ও উদার গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শ ধারণ করে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার তথা বাঙালি জনগোষ্ঠির জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একক দাবি প্রমাণিত হয়। এই সংগঠনের নেতৃত্বেই সমগ্র বাঙালি জনগণ একাত্ম হয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটায়।
আওয়ামী লীগের ইতিবাচক ও ক্রমোন্নতিমূলক ভাবাদর্শিক বিকাশ সম্বন্ধে অধ্যয়নের একান্ত প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠাার পর আওয়ামী লীগ শুধু সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। যুগোপযোগিতাকে ধারণ করে নিজের ভাবাদর্শিক বিকাশ ঘটিয়ে সংগঠনটি জনচেতনাকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাকালে আওয়ামী লীগ যে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছিল তা পড়লে একে মুসলিম লীগের ভিন্ন একটি সংঙ্করণ ছাড়া কিছু মনে হবে না। বাস্তবে ছিলও এমনটিই। তবে ধর্মীয় বিষয় ছাড়া আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শের অন্য সকল বিষয়ের মূলভিত্তি হল এই ঘোষণাপত্র। এক প্রকার ধর্মবাদী ঘোষণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অভ্যুদয় ঘটলেও অচিরেই সংগঠনটি সমাজ ও রাজনীতির ইতিবাচক ধারাটিকে গ্রহণ ও আত্মস্থ করতে শুরু করে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীঘ থেকে মুসলিম শব্দটি বিযুক্ত করে আওয়ামীলীগ নামকরণ করে সংগঠনের দ্বার সকল সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ঔদার্য-আধুনিকতার উপাদান দ্যিমান ছিল। প্রতিষ্ঠার পরবর্তী বছরই আওযামী মুসলিম লীগ একটি প্রাথমিক গঠণতন্ত্র প্রকাশ করে। এই গঠনতন্ত্রে যে প্রাথমিক কর্মসূচির বর্ণনা দেওয়া হয় তা অনুধাবন করলে ’উঠন্তি মুলা পত্তনেই চেনা যায়’ এই আপ্তবাক্যের প্রতিফলন হিসেবে সমকাল অতিক্রমকারী উদার ও প্রগতিশীল কল্যাণ রাষ্ট্রের অনুবর্তী ভাবাদর্শিক চেতনা লক্ষ করা যায়।   আওয়ামী লীগের অন্যতম এই প্রাথমিক দলিলে ইমডিয়টে প্রোগ্রাম-এর তালিকার দিকে তাকালে এই চেতনা ধরা পড়ে। এই তালিকায় ছিল বিনা ক্ষতিপুরণে জমিদারি উচ্ছেদ এবং উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন চাষিদের মধ্যে বিতরণ, মূল শিল্পসমূহের জাতীয়করণ, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন, দুর্নীতি, পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতিকে প্রশাসন ও সমাজের ক্ষত হিসেবে বিবেচনা করে তার মূলোৎপাটন, সোনালী আঁশ পাট উৎপাদকদের সর্বোচ্চ মূল্য নিশ্চিতকরণকৃচ্ছসাধন নীতি অনুসরণ করে প্রশাসনিক ব্যয়বাহল্য হ্রাস করে একটি সম্মানজনক জীবনমানের নিশ্চয়তা বিধান, সমগ্র রাষ্টে সরকারি উদ্যোগে দাতব্য চিকিৎসালযের নেটওয়ার্ক তৈরি করে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সড়ক, রেলওয়ে নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি। এমনকী ‘পূব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো’ শীর্ষক সংগঠনের প্রথম দলিলে মানুষের মৌলিক অধিকারের সকল অনুসঙ্গ যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতা, ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়া এবং নির্বাচিত করার অধিকার, কর্মসংস্থানের অধিকার, দুস্থদের রাষ্ট্রীয় রক্ষাকবচ পাওয়ার অধিকার, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার, সকল ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার, নারীর অধিকার ইত্যাদি কল্যাণ রাষ্ট্রের উপযোগী নীতি ও পদ্ধতি গৃহীত হয়েছে। এই দলিলে ভূমিসংস্কার, ভূমির পুনর্ব্যবহার ও শিল্প সম্প্রসারণ নীতির বিস্তারিত বিবরণ আছে। ১৯৫৩ সালের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সম্মেলনে সংগঠনের যুগ্মসম্পাদক এবং ভারপ্রাপ্ত  সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান যে রিপোর্ট পেশ করেন তাতেও এইসকল নীতির সুস্পষ্ট উচ্চারণ লক্ষ্য করা যায়। এতে সম্প্রদায়গত হানাহানির অবসানের কথা বলা হয়, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির আহ্বান জানানো হয়, সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ইঙ্গিত দেয়া হয়, ভারত-পাকিস্তান মৈত্রীর পক্ষে মত প্রকাশ করা হয়। তাছাড়া শিল্প-বাণিজ্য-ভূমি নীতির ক্ষেত্রে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণও এই সময় থেকেই শুরু হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক একুশ দফায় যে নীতি ও কর্মসূচির উল্লেখ ছিল তার আধারও আওয়ামী লীগের প্রথম ঘোষণাপত্র ও সাধারণ সম্পাদকের প্রথম রিপোর্টি। ১৯৫৫ সালে আমরা ভিন্ন এক আওয়ামী লীগকে পাইÑ ধর্মীয় সম্প্রদায়গত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে সকল সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ¯্রােতধারার মিলনক্ষেত্র হিসেবে। এ বিষয়ে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান যে রিপোর্ট পেশ করেন তা এখানে তুলে ধরছি: “বন্ধুগণ! একথা অনস্বীকার্য যে, যে সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় তখনকার বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের সংগঠনকে একটি “সাম্প্রদায়িক” প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হয়েছিল। মুসলিম লীগ পাকিস্তানের জনগণের ধর্ম্মানুরাগের সুযোগে ইসলামকে হাতিয়ার করেই তার শাসন অব্যাহত রেখেছিল। জনগণও তখন লীগ সরকারের বিভ্রান্তি হতে নিজেদেরকে সর্ম্পূরূপে মুক্ত করতে সক্ষম হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের সংগঠনকে অসাম্প্রাদায়িক করা সম্ভব হলেও মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাবের মোকাবিলা করার কাজে তা ব্যর্থ হত। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আজ অবসান ঘটেছে। ধর্ম্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল পাকিস্তানবাসীর নিজস্ব রাজনৈতিক ঐক্যজোট হিসাবে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব করার মহান দায়িত্ব আজ আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে পারে এবং …“রাজনীতি ক্ষেত্রে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, মুসলিম আর মুসলিম থাকবে না এবং সবাই মিলে পাকিস্তান জাতি হিসেবে পরিচিত হবে” ইহা বাস্তবে রূপায়িত করতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগ। আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে এ-কথা ঘোষণা করতে পারি যে, দেশের সকল ধর্ম্মের সকল বর্ণের এবং সকল ভাষাভাষী মানুষেকে একটি গণপ্রতিষ্ঠানে সমবেত করার প্রয়োজন। বস্তুত, আওয়ামী লীগ দলকে সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য অবারিত করার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের প্রগতিশীল ভূমিকাকে অক্ষুণœ রাখতে সক্ষম হব।”
তবে একটি অভিযোগ সাধারণ্যে চালু আছে যে ১৯৬৪-র আগে আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন লাভে সক্ষম হয়নি বা চৌষট্টির পূর্বে সংখ্যলঘুদের পাশে আওয়ামী লীগ দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। কথাটিতে কিছুটা সত্য আছে বটে, তবে তার কারণে আওয়ামী লীগ অসম্প্রদায়িক নীতি বিকাশের ক্রটি বা ব্যর্থতা নয়। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু নতুন সংবিধানের আওতায় কোন নির্বাচন না হওয়ায় আওয়ামী লীগের সমর্থন ভিত্তি যাচাই করার কোন সুযোগ ছিল না। তাছাড়া ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের একটা শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান লক্ষ করা যায়, যা ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। আইউব খানের সামরিক শাসনের চার বছরের মাথায় সংবিধান জারি, সামরিক শাসনের আপাতঃ প্রত্যাহার এবং আইউব খানের নিজের রাজনৈতিক দল গঠন ইত্যাদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহে নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসন প্রত্যাহারের পর সকল রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিচালনার জন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টে নেতৃত্ব শূন্যতার সৃষ্টি হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পৃথকভাবে আত্মপ্র্রকাশ করতে শুরু করে। আওয়ামী লীগও এই সুযোগ ১৯৬৪ সালের মার্চে এককভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময় আওয়ামী লীগ যে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে তা এই সংগঠনের সাংগঠনিক ও ভাবাদর্শিক বিকাশের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। ১৯৪৯ সালের ঘোষণাপত্রে বর্ণিত ধর্মীয় প্রাবল্য এই দ্বিতীয় ঘোষণাপত্রে একেবারেই অনুপস্থিত। এই সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আওয়ামী লীগের সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ আসে। ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাড়াও’ শীর্ষক সাম্প্রাদিয়ক দাঙ্গা বিরোধী ঐতিহাসিক পোস্টার এই সময় প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। এইভাবে সামগ্রিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক অসাম্প্রদায়িকীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। পূর্ববঙ্গের মত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনঅধ্যুষিত একটি এলাকায় একটি রাজনৈতিক সংগঠনের এভাবে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চরিত্র গ্রহণ অপরিসীম তাৎপর্যবাহী একটি ঘটনা। এ ধারাই আওয়ামী লীগের পরবর্তী বিকাশ ঘটে। ফলে এটা শুধুমাত্র বিশেষ একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক চরিত্রের উর্দ্ধে উঠে অসাম্প্রদায়িক এবং ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম হয়।
পঞ্চাশের দশকেই আওয়ামী লীগের বিকাশের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধে আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্মসূচি এই সময়ই স্পষ্টতর হয়ে উঠে। ১৯৫৫ সালের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের রিপোর্ট থেকে বিষয়টি বোঝা যায়। পাকিস্তান গণপরিষদে প্রদত্ত হোসেন শহীদ সোহাওয়ার্দীর ভাষণেও প্রগতিশীল বুর্জোয়া ধারার সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্ম পরিকল্পনার পরিচয় পাওয়া যায়। বাম ও কম্যুনিস্ট ধাঁচের রাজনৈতিক দলের বিপরীতে মিশ্র অর্থনৈতিক কর্মসূচিভিত্তিক একটি স্বকীয় চরিত্র পঞ্চাশের দশকেই আওয়ামী লীগ পরিগ্রহ করে। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের পর অপেক্ষাকৃত বামধারার নেতা-কর্মীদের সংগঠন পরিত্যাগ আওয়ামী লীগের নিরেট জাতীয়তাবাদী চরিত্র গ্রহণে সহায়ক হয়। ১৯৬৪ সালে গৃহীত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে জাতীয়করণের কর্মসূচি সংবলিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ সংগঠনটির প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চরিত্রে পূর্ণাঙ্গতা আনয়ন করে।
১৯৬১ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। পঞ্চাশের দশকের দৃঢ় সাংগঠনিক ও ভাবাদর্শিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ষাটের দশকের যাবতীয় কর্মসূচি বাঙালির স্বাধিকারের এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
সধশযরংঃড়ৎুৎঁ@মসধরষ.পড়স