আওয়ামী লীগের ২০ তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলন: রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশা

আপডেট: অক্টোবর ১৬, ২০১৬, ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক
রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য বাংলাদেশের মত উর্বর স্থান বোধ করি বিশ্বে খুব কমই আছে। রাজনৈতিক দলের সঠিক পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। নানা রকম রাজনৈতিক জোটের কথা পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, যেমন ১৪ দলীয় জোট, ১৫ দলীয় জোট, ২০ দলীয় জোট ইত্যাদি। জোটের বাইরেও কিছু রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব আছে। সব মিলিয়ে দেশে ৫০টির অধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে, এমন অনুমান বোধ করি সত্যের কাছাকাছি যাবে।
পাকিস্তান আমলে দেশে এত রাজনৈতিক দল ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন বিভাজন ঘটেছে, আবার বেশ কিছু নতুন দলও গঠিত হয়েছে। দেশে এমন কিছু দল রয়েছে, যাদের নেতা-কর্মীদেরকে দেখতে হলে অণুবীক্ষণযন্ত্রের ব্যবহার করা ছাড়া উপায় নেই।
১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলিম লীগ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের নাম হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান জন্মের পরপরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ভয়ানক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১৯৪৮ সালে মুসলিম লীগ নেতা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ঢাকায় এসে যখন ঘোষণা করেন একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, ছাত্রদের পক্ষ থেকে প্রচ- প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়। সে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পরে দেশের সর্বস্তরে। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন।
পাকিস্তান জন্মের এক বছর যেতে না যেতেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উপলব্ধি জাগে মুসলিম লীগের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মানুষের কোন স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না, বরং মুসলিম লীগ নেতাদের হাতে পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণের ক্ষতি হবে। পূর্ব বাংলার স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য পৃথক একটি রাজনৈতিক দল গঠন অপরিহার্য। এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৪৯ সালের জুন মাসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের একটি রাজনৈতিক দল। দলীয় প্রতীক হয় গ্রাম বাংলার জীবন সারথী ‘নৌকা’। আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মলগ্নে ভাষা আন্দোলনের দায়ে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দী। কারাগারে বন্দী থাকলেও তরুণ নেতা শেখ মুজিবকে আওয়ামী মুসলিম লীগের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত করা হয়।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে হেরে যায়। কিন্তু ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইউব খানের সামরিক আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। আইউব খান রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে নেয়ার পর বুঝতে পারেন পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিব। তাই অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানো হয় শেখ মুজিবের ওপর। নানা অভিযোগ এনে শেখ মুজিবকে মাসের পর মাস জেলখানায় বন্দী করে রাখা হয়। এত নির্যাতনের মধ্যে থেকেও ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ঘোষণা করেন পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ ৬ দফা। ১৯৬৯ সালে দেশে ঘটে যায় এক গণঅভ্যুত্থান। পতন ঘটে আইউব শাসনের। শেখ মুজিব বাংলার মানুষের কাছে হয়ে যান ‘বঙ্গবন্ধু’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী করে রেখেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় নি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হন। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। দেশে শুরু হয় সামরিক শাসন। জাতির কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যায় ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক জেনারেল জিয়া।
বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করবার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের শেকড় এত গভীরে প্রোথিত যে, একে উপড়ে ফেলার কাজটি খুব সহজ ছিল না। তবে চেষ্টা কম হয় নি। জেনারেল জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে জেনারেল এরশাদও একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। দলটির নাম ‘জাতীয় পার্টি’। কাছাকাছি সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ডালিম-ফারুকদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে ‘ফ্রিডম পার্টি’। সামরিক ব্যক্তিদের হাতে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে নির্মূল করা। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের ওপর দিয়ে যে প্রচ- ঝড় বয়ে যেতে থাকে, ঝড় না বলে একে টর্নেডো বলাই শ্রেয়। লক্ষ্য করবার বিষয় আওয়ামী লীগে যখনই কোন সঙ্কট দেখা দিয়েছে, গ্রাম বাংলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা নিজেদের জীবন দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশে আজ এত উন্নয়ন। সমগ্র বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে বাংলাদেশের অগ্রগতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার দ্বারা দেশকে আজ অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্ত করেছেন। বাংলাদেশ যে অতি শীঘ্র একটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে, তার সব রকম ক্ষেত্র এখন প্রস্তুত। যুদ্ধাপরাধী এবং জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের চক্রান্তকে তিনি কঠোর হাতে দমন করতে সমর্থ হয়েছেন। চীন, জাপান, ভারত, আমেরিকাকে নিয়ে যেভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র নীতি সাজিয়েছেন, বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
দেশের মানুষের মধ্যে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা যে দ্রুত হারে বেড়ে যাচ্ছে, মানুষের সাথে কথা বলতে গেলেই তা উপলব্ধি করা যায়। সমাজের উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তন বেশি এসেছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা বলতে পারি। এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সমস্ত শিক্ষক শেখ হাসিনার তীব্র সমালোচনা করতেন, এখন তাঁরা শেখ হাসিনা বন্দনায় পঞ্চমুখ। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ  শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ একে অপরের পরিপূরক।
এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে আগামী ২২, ২৩ অক্টোবর তারিখে আওয়ামী লীগের ২০তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশে কার্যত কোন বিরোধী দল  নেই। বিভিন্ন দল থেকে নেতা-কর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদানের মহোৎসব চলছে। আওয়ামী লীগকে একটি বহমান বিশাল নদীর সাথে তুলনা করা যায়। বিশাল খর¯্রােতা নদীতে কিছু আবর্জনা ঢুকতেই পারে, তবে সেই আবর্জনা যেন নদীর বহমানতাকে নষ্ট করে দিতে না পারে,  সেদিকে অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।  আওয়ামী লীগের  আদর্শকে বরণ করা এবং আওয়ামী লীগের আদর্শকে ধারণ ও  লালন করা কিন্তু এক কথা নয়। আওয়ামী আদর্শকে বরণ করা হয়তো  সহজ , কিন্তু আওয়ামী আদর্শকে বুকে ধারণ ও লালন করা বেশ কঠিন কাজ , এর জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সাধনার প্রয়োজন। এ মূহুর্তে নবাগতদেরকে নয়, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের ত্যাগী নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদেরকেই সর্বাগ্রে মূল্যায়ন করা বাঞ্ছনীয় ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পরিবার, জাতীয় চার নেতা জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দীন আহমদ, জনাব ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর উত্তরসূরীদের সঠিক মূল্যায়ন আওয়ামী লীগের খানিকটা নৈতিক দায়িত্ব। বিভিন্ন অঞ্চল নিয়েই   গড়ে উঠেছে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভ’মি বাংলাদেশ । আশা করা যায় আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি গঠনের সময়  বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল  সমান গুরুত্ব পাবে। আওয়ামী লীগের এক সময়ের সাধারণ  সম্পাদক জনাব আবদুল জলিলের  মৃত্যুর ফলে উত্তরাঞ্চলে যে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিয়েছিল, সে শূন্যতা অনেকাংশে পূরণ করেছেন জাতীয় চার নেতার  অন্যতম নেতা শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সুযোগ্য পুত্র জনাব মোহম্মদ নাসিম এম.পি।  পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের আর একজন জাতীয় নেতা শহীদ এ এইচ এম  কামারুজ্জামানের সুযোগ্য পুত্র রাজশাহী মহানগরের সাবেক সফল মেয়র  জনাব  এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনেরও সঠিক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। পিতার নেতৃত্বের মহৎ গুণাবলী যে জনাব খায়রুজ্জামান লিটনের মধ্যে রয়েছে, ২০০৮ সালে রাজশাহীর মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন। রাজশাহীর মত একটি নি¤œমানের শহরকে তিনি মহা উচ্চতায় পৌঁছে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। কাজেই সুযোগ পেলে তিনি যে তাঁর পিতার মত বড় মাপের নেতা হতে পারবেন,  তাতে কোন সন্দেহ নেই। সবকিছু বিবেচনা করে যদি আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে জনাব খায়রুজ্জামান লিটনকে  একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেয়া হয়, তাতে উত্তরাঞ্চলের  আপামর জনসাধারণ যেমন আনন্দ অনুভব করবে, একই সাথে শহীদ এইচ এম  কামারুজ্জামানের বিদেহী  আত্মাও শান্তি পাবে।
লেখক: *উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী; সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: হনরঁ.বফঁ@মসধরষ.পড়স।