আক্কেল সেলামি

আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০১৬, ১১:০৬ অপরাহ্ণ

রফিকুজ্জামান রণি


চিবিদ বনে বাস করতো বিরাট এক অজগর! লোভী। ব্যাঙের বাচ্চা সামনে পড়লেই সে টুপ করে গিলে ফেলতো। এ নিয়ে বনরাজ সিংহের কাছে বহুবার নালিশ করা হয়েছে। লাভ হয়নি। ব্যাঙখেকো অজগর বরং নিজের কাজেই সোচ্চার হয়ে উঠলো। কারো কথা তো তোয়াক্কা করেই না, উল্টো সে হুঁশিয়ারি ঝাড়লোÑ ‘এরপর যে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করতে যাবে, তার পুরো গোষ্ঠী পেটের মধ্যে চালান করে দেবো।’
ব্যাঙেরা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলো। কথা বাড়ানোর সাহস করলো না। সরলতার সুযোগ পেয়ে অজগরের উৎপাত এবার বেড়ে গেলো। বাচ্চার সঙ্গে এখন মা ও বাবা ব্যাঙকেও খেতে শুরু করলো সে। নিরীহ ব্যাঙগুলোর মাংস খেয়ে সে অল্পদিনেই বেলুনের মতো ফুলতে লাগলো।
অজগরের নিষ্ঠুর আচরণে ব্যাঙগোষ্ঠী অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো। ভাবলো, এভাবে লাই দিলে পৃথিবীর সকল ব্যাঙ একদিন অজগরের পেটে চলে যাবে। অনুবীক্ষণযন্ত্র লাগিয়েও তখন পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ব্যাঙ জাতীয় কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। উত্তরসূরিদের জন্যে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হলে অনতিবিলম্বে সাপটাকে শায়েস্তা করতে হবে।
অজগরের বর্বরতা বন্ধের জন্য জরুরি মিটিং ডাকা হলো। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো, খবরটা যে করেই হোক বেজির কানে পৌঁছুতে হবে। সাপ কেবল বেজিকেই ভয় পাবে। যেই কথা সেই কাজ!
অজগরের কা-কারখানার কথা শুনে বেজি তো অবাক! ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠলোÑ‘কী! নিরীহ প্রাণীগোষ্ঠীর সাথে বাহাদুরি! এর শাস্তি ওকে পেতেই হবে। কৌশল খাটিয়ে বেয়াদবটাকে আটকানোর ব্যবস্থা করো তোমরা। তারপর যা করার আমি নিজেই করবো।’
আশ্বাস পেয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরলো তারা। ভাবনা হলো, বিরাট এই বিষধর সাপকে কীভাবে বন্দি করবে তারা! কৌশল অবলম্বন ছাড়া কোনোভাবেই এ-কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।


ভাবতে ভাবতে চমৎকার একটা বুদ্ধি মাথায় এলো। ফিসফিসিয়ে পরস্পরকে জানিয়ে দেয়া হলো বিষয়টা। অপেক্ষা শুধু মোক্ষম চালটা চালানোর।
দিনটি ছিলো শনিবার। দ্বিপাক্ষিক শান্তিচুক্তির প্রস্তাব নিয়ে ব্যাঙদের বিশেষ প্রতিনিধিদল অজগরের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হলো। দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে উভয় পক্ষের সার্বিক স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টা চিন্তা করে সন্ধি করা হলো। প্রস্তাব অনুকূলে থাকায় অজগর সানন্দে গ্রহণ করলো।
ব্যাঙনেতারা বললোÑ ‘দাদা, আপনি আমাদের চেয়ে সবকিছুতেই বড় ও ক্ষমতাধর। আপনি আমাদের গুরুতুল্য। গুরুর জন্যে কিছু করতে পারলেই আমরা ধন্য হবো। যেহেতু গুরু মানছি তাই কষ্ট করে আপনাকে খাদ্য জোগাড় করতে দেয়া ঠিক হবে না। আমরাই আপনার জন্যে সুস্বাদু এবং পুষ্ঠিকর খানাখাদ্যের ব্যবস্থা করে রাখবো। শুধু ছোট্ট একটা অনুরোধ রক্ষা করলেই আমরা কৃতজ্ঞ হবো।’
‘কী অনুরোধ?’ অহংকারে গ্রীবাদেশ ফুলিয়ে অজগর প্রশ্ন ছোঁড়ে।
‘আজ থেকে আমরা প্রতিদিন তিনবেলা আপনাকে একটা করে তাজা মুরগি খেতে দেবো। আপনার চাহিদা থাকলে বাড়ানোরও চেষ্টা করবো। তারপরও দয়া করে আমাদের বাচ্চাকাচ্চাগুলো খাবেন না। আমরা জানি, আপনার অনেক দয়া; একটু দয়া করুন প্লিজ।’
অজগরতো খুশিতে আত্মহারা! তারপরও মুখে গম্ভীরভাব ফুটিয়ে জবাব দিলোÑ ‘আচ্ছা, তোমারা যেহেতু আমাকে এতোই মান্যগণ্য করো, তোমাদের ভালো দিকটা তো তখন  অবশ্যই দেখতে হয়। প্রস্তাবটা মানতে আমার কোনো আপত্তি নাই।’
‘তাহালে আগামীকাল থেকে আপনি আমাদের আস্তানায় নিয়মিত যাবেন। আপনার জন্যে ভিআইপি রুমে মুরগির ব্যবস্থা করে রাখবো।’
অজগরের সম্মতি পেয়ে, ধন্যবাদ দিয়ে ব্যাঙনেতারা বাড়ি ফিরে এলো।
আগামীকাল থেকে অজগর মুরগি খেতে চলে আসবে। মোক্ষম খেলাটা খেলানোর এটাই তো সুযোগ। বনের সব ব্যাঙ একজোট হয়ে বড় একট ঘর বানাতে আরম্ভ করলো। পুরো ঘরটাই শক্ত কাচ দিয়ে তৈরি করা হলো এবং কোথাও কোনো ফাঁক রাখা হলো না। শুধুমাত্র একটা দরোজা আর ভেতরে কয়েকটা গোপন রুম বানানো হলো। কাচঘরের গোপনরুমগুলোর ভেতরে কতোগুলো বেজি লুকিয়ে রাখা হলো। ভেতরে যে বড় বড় পাঁচটা বেজি ওঁৎ পেতে আছে, বাইরে থেকে তা বুঝাই যায় না। ঘরের এক কোণে একটা মরা মুরগি শুইয়ে রাখা হলো।
লিকলিকে জিভ নাড়তে নাড়তে সময় মতো অজগর এসে হাজির হলে। ব্যাঙনেতারা কাঁচঘর দেখিয়ে বললোÑ ‘আপনার সম্মানে কেমন ভিআইপি রুমের ব্যবস্থা করেছি দেখুন!’ অজগর তো মহাখুশি। সবাইকে ধন্যবাদ দিলো।
তারা বললোÑ ‘তো আর দেরি নয় দাদা। আপনার খাবার প্রস্তুত করা আছে। ছটফট খেয়ে নিন। কত দূর থেকে কষ্ট করে এসেছেন আপনি!’
অজগর খেতে যাবে, এমন সময় তাকিয়ে দেখলো মুরগিটা কেমন মরার মতো পড়ে আছে। ফলে বেঁকে বসলো সেÑ  ‘ওটাতো মরা মুরগি। নড়াচড়া নাই। আমি মরা মুরগি খাই না।’
মহাবিপদ হয়ে গেলো! মুরগিটা যে আসলেই মরা অজগর বেটা এতো তাড়াতাড়ি বুঝে ফেললো! এখন উপায়? সব পরিকল্পনা কি তাহলে চুলোয় গেলো! সবার কপালে চিন্তাররেখা নেমে এলো। উফ, কী হবে এখন!
ঠিক অই সময় পেছন থেকে চালাক একটা ব্যাঙ হঠাৎ অট্টহাসি ছড়িয়ে বলে ওঠলোÑ ‘কী অজগর দা, মরা মুরগি আর তাজা মুরগির চেহারা কী এতো তাড়াতাড়িই ভুলে গেলেন? আরে ওটাতো আস্ত একটা জ্যান্ত মুরগি গো দাদা! আপনিও আসতে দেরি করেছেন আর বেচারাও ঘুমিয়ে পড়েছে..হা হা হা। একবার কাছে গিয়েই দেখুন না কেমন কককড়ত… করে ওঠে। ঘুমিয়ে থাকলে তো আরো ভালো দৌড়ঝাঁপের ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই সাবাড় করে ফেলতে পারবেন।’
প্রথমে একটু লজ্জা পেলেও পরক্ষণেই আবার অজগর বেটা পরিতৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে বললোÑ ‘ও…তাই! আগে বলবে না মিয়া? বাব্বা কী ক্ষুধাটাই না পেয়েছে। তাই চোখেমুখে কেমন উল্টাপাল্টা দেখছি। যাই আগে খেয়ে আসি, তারপর কথা।’ দ্রুতপায়ে অজগর কাচঘরে ঢুকে পড়লো।
ঢোকার সাথে সাথে দরোজা বন্ধ করে দেয়া হলো। বন্দি হয়ে গেলো লোভাতুর অগজর। নিñিদ্র দরোজা গলিয়ে বের হওয়ার আর সুযোগ রইলো না। মুরগির কাছে গিয়ে সে তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। আমার সঙ্গে চালাকি! দেখাচ্ছি মজা। কিন্তু ক্ষোভের আগুন কাচঘরের বাইরে আসার আগেই গোপনকক্ষ থেকে বের হয়ে বেজিগুলো তাকে ঘিরে ধরলো। সে স্তম্ভিত হয়ে গেলো। পালাতে গিয়েও ব্যর্থ হলো। মুহূর্তের মধ্যে বেজির দল টেনে-হিঁচড়ে চিহ্নভিন্ন করে ফেললো তাকে। বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যাঙেরা দেখলো আর হাততালি দিলো। অজগরের ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার পর হৈচৈ করে দরোজা খুলে দিলো এবং বেজিগুলোর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো।
সেই থেকে চিবিদ বনে আর কোনো অজগরের উৎপাত রইলো না।