আগুন ও অ্যাসিডে পোড়া রোগির চিকিৎসায় গর্ভফুল

আপডেট: জুলাই ১১, ২০১৭, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

বাংলা ট্রিবিউন এর প্রতিবেদন


মানবসন্তান জন্মের পরে প্রসূতি ও নবজাতকের নাড়ির সংযোজক  গর্ভফুলের জায়গা হয় ময়লার ভাগাড়ে বা ডাস্টবিনে। গ্রামে-গঞ্জে তা লুকিয়ে পুঁতে ফেলা হয় মাটি-কাদায়। শিশু জন্মের পরে অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত এই গর্ভফুলই এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগুনে ও অ্যাসিডে পোড়া রোগিদের চিকিৎসায়।
আগুনে পোড়া রোগিদের চিকিৎসায় মূলত ব্যবহার করা হয় গর্ভফুলের পর্দা বা ঝিল্লি। ইংরেজিতে একে বলে অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটসহ দেশের শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এই অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা গর্ভফুলের ঝিল্লি বা পর্দা দিয়েই করা হচ্ছে আগুনে ও অ্যাসিডে পোড়া রোগির চিকিৎসা। এছাড়া চোখের অপারেশন, নারীর জননাঙ্গের অপারেশন, পেটের অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসায়ও এই গর্ভফুলের পর্দা বিশেষভাবে ব্যবহার হচ্ছে। অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা সংরক্ষণ করা হচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চ নামক প্রতিষ্ঠানে। এই টিস্যু ব্যাংকে অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন সংরক্ষণ করা হচ্ছে চিকিৎসা সেবার জন্য। গত ১০ বছরে এই টিস্যু ব্যাংক থেকে আড়াই হাজারের বেশি রোগির চিকিৎসায় অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একজন সুস্থ মায়ের সন্তান জন্মদানের পরে গর্ভফুল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। এরপরে গর্ভফুল থেকে অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা সংগ্রহ করে বিশেষ কৌশলে রেডিয়েশন দিয়ে ও স্টেরিলাইজড পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত করে প্লাস্টিকের ব্যাগে তা সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। এরপরে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র ও চাহিদাপত্র অনুযায়ী আগুন বা এসিডে পোড়া বা অন্যান্য অপারেশনের জন্য রোগিকে অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, বিশেষ এই চিকিৎসা পদ্ধতির নাম  অ্যালোগ্রাফট।
তবে হেপাটাইটিস বি, এইডস এবং যেকোনও ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগির কাছ থেকে গর্ভফুল সংগ্রহ করা হয় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইন্সটিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চের পরিচালক ড. এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন সংগ্রহ করে টিস্যু ব্যাংকে সংরক্ষণ করছি এবং দেশের শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যা সরবরাহ করা হচ্ছে।’ তিনি জানান, সাধারণত অ্যাসিড বা আগুনে পোড়া রোগির ব্যান্ডেজ বাঁধার সময় অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা ব্যবহার করলে রোগী দ্রুত আরোগ্য হয়।  ড. এস এম আসাদুজ্জামান আরও জানান, অপথালমোলজিক্যাল ডিফেক্ট, ভ্যাজাইনোপ্লাস্টি, অ্যাবডোমিনাল ওয়াল রিকনস্ট্রাকশন ইত্যাদির জন্যও অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন ব্যবহার হচ্ছে।
জানা গেছে, সাভারের গণকবাড়িতে পরমাণু শক্তি কমিশনের কার্যালয়ে এই টিস্যু ব্যাংক গড়ে তুলতে গবেষণার কাজ শুরু হয়। সেবাদান কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯০ সালের পরে। ২০০৩ সালে এটিকে টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চ ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হয় যা চলতি বছর ইন্সটিটিউটে রূপ পায়। চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার রোগী এই টিস্যু ব্যাংক থেকে সেবা নিয়েছেন। সরকার টিস্যু ব্যাংকের সেবা সম্প্রসারণের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দও দিয়েছে।
অ্যাসিড বা আগুনে পোড়া রোগির চিকিৎসায় অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পরমাণু শক্তি কমিশনের এই উদ্যোগটি খুবই ভালো। টিস্যু ব্যাংক থেকে টিস্যু নিয়ে রোগিরা সুস্থ হচ্ছে, এটা খুবই কার্যকর উদ্যোগ। ডা. সেন বলেন, ‘ছোট বার্নে (অল্প পোড়া) এটা বেশ কাজে লাগে। সাধারণত মানবদেহের ৫-১০ শতাংশ পোড়া রোগির চিকিৎসায় অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা দিয়ে ভালোভাবে ব্যান্ডেজ বাঁধা যায়।’ তিনি জানান, টিস্যু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যদি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাহলে আরও টিস্যু নেয়া সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে টিস্যু ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেবেন বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে (২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) ৮ হাজার ৭৪টি অ্যামনিওটিক সাকস (সম্পূর্ণ গর্ভফুল) সংগ্রহ করে টিস্যু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার থেকে ৩৭ হাজার ৬০০ পিস অ্যামনিওটিক মেমেব্রেন বা পর্দা দেশের শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরবরাহ করেছেন। যা অ্যালোগ্রাফট পদ্ধতিতে আড়াই হাজারের বেশি রোগির চিকিৎসায় ব্যবহার হয়েছে।
ইন্সটিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চের টিস্যু ব্যাংকিং অ্যাক্টিভিটিজ ইন বাংলাদেশ শীর্ষক এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে (২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) ২ হাজার ৫৮৯ রোগী টিস্যু ব্যাংক থেকে অ্যামনিওটিক মেমব্রেন বা পর্দা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে ২ হাজার ১৮১ জন ছিলেন আগুন (বিদ্যুতে পোড়ারোগীসহ) ও অ্যাসিডে পোড়া গুরুতর আহত রোগী। এছাড়া ২২৭ জন অপথালমোলজিক্যাল ডিফেক্ট (আগুনে পোড়া, টিউমারজনিত অপারেশন, আলসার ইত্যাদি জনিত রোগে আক্রান্ত) রোগী সেবা নিয়েছেন। অন্যদিকে, ভ্যাজাইনোপ্লাস্টির (জননাঙ্গের অপারেশন) জন্য অ্যামনিওটিক মেমব্রেন বা পর্দা নিয়েছেন এমন রোগির সংখ্যা ছিল ৩০ জন। অ্যাবডোমিনাল ওয়াল রিকনস্ট্রাকশন (পেটের দেওয়াল পুনর্নির্মাণ) অপারেশনের জন্য এই টিস্যু নিয়েছেন ৩৭ জন। এছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসার জন্য ১১৪ জন টিস্যু ব্যাংক থেকে নিয়েছেন অ্যামনিওটিক মেমব্রেন।