আজ বিশ্ব পানি দিবস।।। নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসীরা

আপডেট: মার্চ ২২, ২০১৭, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

একে তোতা, গোদাগাড়ী


পানি শূন্যতায় মহানন্দা নদী। ছবিটি গোদাগাড়ি উপজেলার সুলতানগঞ্জ এলাকা থেকে তোলা- সোনার দেশ

পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি কমে গেছে। নদী দুইটির মাঝে অসংখ্য চর জেগে ওঠায় তিনভাগে বিভক্ত হয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। ফলে এ অঞ্চলে কৃষি কাজে সেচ ও নিরাপদ পানির সঙ্কট দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকায় প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর প্রায় ৪০ ভাগ ও মহানন্দা নদীর ৮০ ভাগ অংশে পানি থাকে না। জেগে ওঠা চরগুলোতে চাষ হচ্ছে ধানসহ বিভিন্ন ফসল। লোকজন মহানন্দা নদী পায়ে হেঁটেই পার হচ্ছে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর এ অবস্থার কারণে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছে শত শত জেলে।
স্থানীয় লোকজন আরো জানান, পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নদী সংলগ্ন এলাকায় খাবার পানির জন্য বসানো নলকূপগুলোতে পানি কম উঠে। এদিকে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানি কমে যাওয়ার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। প্রতি বছর ৫ থেকে ১০ ফিট পানির স্তর নিচে চলে যায়। খরায় পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে খাবার পানির জন্য বসানো হস্তচালিত নলকূপগুলোতে পানি পাওয়া যায় না। মে মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়।
বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজন জানায়, হস্তচালিত নলকূপগুলোতে নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় লোকজান বাধ্য হয়ে পুকুর নালার দূষিত পানি ব্যবহার করে। আবার ২-৩ কিলোমিটার দূরে সেচের জন্য বসানো গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে লোকজন পান করে। বরেন্দ্র অঞ্চলে শুধুমাত্র নিরাপদ পানি সঙ্কটের কারণে স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় বলে শিক্ষকেরা জানান।
একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে আদিবাসীরা নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গোদাগাড়ী উপজেলার ৮০টি আদিবাসী পল্লিতে বসবাসকারী ৫০ হাজার মানুষের জন্য হস্তচালিত নলকূপ রয়েছে মাত্র ৩০টি। উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের চৈতন্যপুর আদিবাসী পল্লিতে বসবাসকারী ৭০টি পরিবারের জন্য হস্তচালিত নলকূপ আছে মাত্র একটি। খরায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এ নলকূপটিতে পানি ওঠে কম। আর বর্ষাপড়া আদিবাসী পল্লিতে ৬০টি পরিবারের জন্য একটি হস্তচালিত নলকূপ থাকলেও বছরে ৭-৮ মাস ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।
এই গ্রামের আদিবাসী নেতা কর্নেল লুইস বলেন, একটি হস্তচালিত নলকূপ থেকে বেশি মানুষ পানি সংগ্রহ করায় এবং প্রচণ্ড খরায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপটি বারবার অকেজো হচ্ছে। কিন্তু তাদের পক্ষে অর্থ অভাবে নলকূপটি মেরামত করা সম্ভব হয় না। ইউনিয়ন পরিষদে থেকে সাহায্যে পাওয়ায় গেলে তখল নলকূপটি মেরামত করা হয়।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য বিমল চন্দ্র রাজোয়াড় বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বেশি গভীরতা দিয়ে হস্তচালিত নলকূপ বসানো গেলে পানি পাওয়া যাবে। কিন্তু আদিবাসীরা দারিদ্র হওয়ায় অর্থ খরচ করে বেশি গভীরতা দিয়ে হস্তচালিত নলকূপ বসাতে পারছে না। সরকারিভাবে আদিবাসী পল্লিগুলোতে একাধিক নলকূপ বসানোর দাবি জানান এই আদিবাসী নেতা।
এদিকে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করে বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরুপ প্রভাব পড়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। তার সঙ্গে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি কমে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের জন্য বসানো গভীর নলকূপগুলোতে পানি উঠছে কম। এজন্য কৃষকদের সেচ খরচ বেড়ে গেছে। কৃষকেরা জানান, বৃষ্টি নির্ভর আমন ধান চাষ হয়। অথচ গত কয়েক বছর ধরে সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে আমন চাষ।
এ প্রসঙ্গে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও ইউডিপিএস নদী ও জীবন প্রকল্প ২ ফোকাল পারসন আমিনুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মৌসুমে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানির চাপ বাড়ায় নদীর দুই পাড় ভাঙছে। শুল্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নদীর দুই পাড়ে বিশাল চর জেগে উঠছে। নদীর গভীরতা কমে গেছে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে ডেজিং করে গভীরতা ফিরিয়ে এনে পানি সংরক্ষণ করতে হবে। আর বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যাপক বনায়ন ঘটানো গেলে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাবে। তখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উপরে উঠে আসবে।
আমিনুল ইসলাম আরো বলেন, জলবায়ূ পরিবর্তনে পদ্মা ও মহানন্দা নদী ছাড়াও তিস্তা, আত্রাই ও করতোয়া নদীতে পানি হ্রাস পাওয়ায় উত্তারঞ্চলে নিরাপদ পানির উৎস কমে যাচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ