আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০২০, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


আজ ভয়াল পঁচিশে মার্চ। জাতীয় গণহত্যা দিবস। ভয়াল, ভয়ংকর ও দুঃসহ স্মৃতিতে মোড়ানো এই দিবস। যতদিন একজনও বাঙালির অস্তিত্ব বেঁচে থাকবে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তার জাতিসত্তার বেদনানীল সেই দুঃসহ স্মৃতিকে সে লালন করবে। এই স্মৃতিই তাকে জাগরিত করবে, বিদ্রোহী হতে, বিপ্লবী হতে মন্ত্রণা যোগাবে, অসত্য, অসভ্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন যুগ যুগ ধরে বর্ষিত হবে।
এবার চতুর্থবারের মত ২৫ মার্চের কালরাতের দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ ২০১৭ জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। ২০ মার্চ ২০১৭ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় প্রতি বছর বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পালনের জন্য ২৫ মার্চকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত একটি দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম নির্বিচার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। এমন নিষ্ঠুর নৃশংসতা কোনো জাতিগোষ্ঠিকে সইতে হয়নি-যা হয়েছিল বাঙালি জাতিকে। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী একটি জাতিসত্তাকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার হীন সংকল্প নিয়ে একটি ঘুমন্ত জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। রক্ত স্রোতে ভেসেছিল বাংলার মাটি, বারুদের গন্ধে বাতাস হয়েছিল ভারী। ওই দিনের ওই কালরাতে কত মানুষ হত্যার শিকার হয়েছিল- এর সংখ্যা গণনা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। শুধু ঢাকা শহরেই হাজার হাজার মানুষ ঘুমের আতঙ্ক ভাঙ্গতেই লাশ হয়ে গিয়েছিল। পাড়ায়-পাড়ায়, বস্তিতে, রাস্তায়, অফিসে, ছাত্রাবাসে যে যেখানে ছিল, সেখানেই তারা লাশ হয়ে গিয়েছিল। এসব স্থানে জমে উঠেছিল লাশের স্তূপ। বাঙালি নেতৃত্বকে আলোচনার ঘূর্ণাবর্তে ফেলে, আপোসের কথা বলে পনরই মার্চ থেকে পরবর্তী সময়গুলোতে পাকিস্তানি পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের পোষ্যদের পাকিস্তানে পার করে এবং পাকিস্তান থেকে সেনাবাহিনী ও অস্ত্র, গোলা-বারুদ এনে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নিখুঁতভাবে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে।
বাঙালি নেতৃত্বকে লে. জেনারেল এজিএম পীরজাদা ২৫ মার্চের সকালেই ক্ষমতা হস্তান্তরের খসড়া দলিল চূড়ান্ত এবং বঙ্গবন্ধু মুজিব ও ইয়াহিয়ার স্বাক্ষরের পর তা আনুষ্ঠানিক হবে এমন ধারণার ধূম্রজালে আবদ্ধ করে রেখেছিল।
এদিন দুপুরের পর থেকেই বাঙালি নেতৃত্ব ও জনগণের মনে ধারণা বদ্ধমূল হয়ে পড়ে যে, রাত থেকেই কিছু ঘটতে শুরু করবে। বঙ্গবন্ধু মুজিব এরপর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের যার যার এলাকায় চলে যাওয়ার জন্য জনে জনে নির্দেশ দিতে শুরু করেন এবং যার যার এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বলেন। তখন অনেক নেতা তাঁকেও আত্মগোপন করতে বলেন। তিনি সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, “আমি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে হানাদাররা আমার খোঁজে ঢাকা শহরের সকল লোককে হত্যা করবে।”
আলোচনা ও আন্দোলনের অবস্থাদৃষ্টে ঢাকার হাজার হাজার মানুষ দ্রুত অবনতিশীল অবস্থার ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে সে সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছিলেন। ফলে হাজার হাজার পরিবার গাঁয়ের বাড়িতে চলে যেতে শুরু করেছিল। কিন্তু তার পরও লক্ষ লক্ষ বাঙালি স্ত্রী-সন্তান, পরিজন নিয়ে ঢাকাতেই থেকে গিয়েছিলেন।
সন্ধ্যার পর ঢাকাসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে সৈন্যরা মাথা থেকে পা পর্যন্ত সশস্ত্র হয়ে বের হতে শুরু করে। তেজগাঁ বিমান বন্দরের নিকট সেনাবাহিনী অবস্থান নিয়েছে, এ খবর বঙ্গবন্ধু মুজিবের ধানমণ্ডি বাসভবনে পৌঁছায়। সেনাবাহিনীর শহর অভিমুখে অভিযানের খবর বিদ্যুৎ বেগে প্রচারিত হওয়ার পর ঢাকা শহরের সর্বত্র হাজার হাজার ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়। অনেক স্থানে রাস্তার পাশের গাছ কেটেও ব্যারিকেড দেয়া হয়। কিন্তু উন্নতমানের অস্ত্রের শক্তি ৩ এম-২৪ ট্যাংকের কাছে সে দিনের প্রতিরোধ বালির বাঁধের মত ভেঙ্গে যায়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাত ১১টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পিলখানার ইপিআর সদর দপ্তরও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে হামলা পরিচালনা করে। ৩০৩ রাইফেল দিয়ে শুধু মাত্র দেশপ্রেমকে সম্বল করে বাঙালি ইপিআর সেদিন রাতে হানাদার বাহিনীকে রুখে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার ইপিআর ও পুলিশ সদস্য সেদিন শহিদ হোন।
রোকেয়া হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং পুরাতন ও নতুন বস্তি এলাকায় সে রাতে যা হয়েছিল তা অসংখ্য বিষাদ সিন্ধুর জন্ম দিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার “সিডনি মর্নিং হেরাল্ড” পত্রিকার ভাষ্যমতে শুধুমাত্র পঁচিশে মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। পরবর্তী নয় মাসে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পূর্ণতা দিয়েছিল সেই বর্বর ইতিহাসকে।
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মাচর্ রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে ৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার হলো আরো ৩ হাজার লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট, লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক- শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।’
পাইকারি এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তনের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়, “১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।”
বাঙালি জাতির সেই চরম দুর্দিনে ইতিহাস বা সময় থেমে থাকেনি। ইতিহাস বাঙালি জাতির পক্ষেই নীরবে কাজ করে গেছে। পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতের কিছু পরে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসযোগে প্রেরিত এক বার্তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে প্রেরিত ইংরেজি বার্তা বাংলায় অর্থ এই দাঁড়ায়-“বাঙালি ভাই-বোন ও বিশ্ববাসীর কাছে আমার আবেদন রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প ও পিলখানা ইপিআর ক্যাম্পে রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে হাজার হাজার লোককে হত্যা করেছে। হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে আমরা লড়ে যাচ্ছি। আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন এবং যে কোনো স্থান থেকেই হোক।
এমতাবস্থায় আমি বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করছি। তোমরা তোমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে মাতৃভূমিকে রক্ষা কর। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। জয় বাংলা।”
এর আগে সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠকের পর ভূট্টো সাংবাদিকদের জানান “পরিস্থিতি অত্যন্ত আশংকাজনক।” সাংবাদিকরা ছুটে এলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। ভূট্টোর বক্তব্যের কথা শুনে তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তখন দেশি-বিদেশি অসংখ্যা সাংবাদিকের ভিড়। খবর এলো ইয়াহিয়া খান সাদা পোশাকে প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করে গোপন বিমানযোগে ঢাকা ছেড়ে করাচি চলে গেছেন। জুলফিকার আলী ভূট্টোও তার অনুগামী হন।
এরপরের ন’ মাসে নৃশংস ও বর্বরতার প্রতিরোধে বুকের তাজা রক্তে সম্মিলিত সংগ্রামের যে ইতিহাস বাঙালি জাতি রচনা করেছিল, এমনটি এর আগে হাজার বছরে কোনো দিন কেউ করতে পারেনি। অহিংস অসহযোগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত থাকবে।
লন্ডনের টাইমস্ পত্রিকায় এদিনের সংখ্যায় পল মার্টিনের পাঠান এক বার্তায় বলা হয়, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে বিভিন্ন বিপ্লববাদী দল ছাত্রদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ট্রেনিং দেয়া শুরু করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের বহু গ্রামে একটি গণবাহিনীর সূচনা হিসাবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হয়েছে। এই গণবাহিনীর ভবিষ্যৎ কাজ হবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করা।”