আজ মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সর্বস্তরে বাংলা কবে হবে!

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান ‘শহিদ দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। দিবসটি বিশ্বের সকল জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় ঐক্য ও বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান ‘শহিদ দিবস’। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বিস্তারিত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে এ দিবসটি।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে শোক, শক্তি ও গৌরবের প্রতীক। ১৯৫২ সালের এ দিনে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে প্রাণ দিয়েছিলেন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারসহ আরও অনেকে।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্ত¯স্নাত গৌরবের সুর বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বের দেশে দেশে মানুষের প্রাণে অনুরণিত হচ্ছে। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আজ সারাবিশ্বের সকল নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস মহান একুশে-আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের ৩০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দাবি উত্থাপন সহ বিশ্বের সকল ভাষা সংক্রান্ত গবেষণা এবং ভাষা সংরক্ষণের জন্য বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু অঅমরা মনে করি এই ইন্সটিটিউটের পরিধি বাড়ানো দরকার। অন্তত বিভাগীয় শহরগুলোতে ভাষা ইন্সটিটিউিট প্রতিষ্ঠাও কাক্সিক্ষত। আঞ্চলিক ভাষা এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বিভাগীয় পর্যায়ের ভাষা ইন্সটিটিউিটগুলো। আর গবেষণার জন্য প্রযোজনীয় বরাদ্দের দাবি তো থাকবেই।
মহান ভাষা আন্দোলন জাতীয় ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ আন্দোলন ছিল মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজস্ব জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন। মানবিক সত্তা জাগরণের এক অন্যন্য দলিল মহান একুশে। ন্যায্যতা, সমমর্যাদা ও মানবিক রাষ্ট্র ভাবনার উন্নত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি একুশের চেতনায় উদ্ভাসিত। একুশের অবিনাশী চেতনা পরবর্তীকালে স্বাধিকার ও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অসীম প্রেরণা ও শক্তি যুগিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং তাঁরই নেতৃত্বে দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতি অর্জন করে বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।

মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ বিশ্বে বিরল ঘটনা। মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে বাঙালি জাতি যে ইতিহাস রচনা করেছিল, শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্ব আজ তাকে স্মরণ করছে সুগভীর শ্রদ্ধায়।
ভাষা আন্দোলন ও একুশের চেতনা জাতিসত্তার শিকড়ের সাথে সম্পর্কিত। একুশ আমাদের দুঃসময়ে সাহস যোগায় লড়াই-সংগ্রামে জাতিকে পথ দেখায়। একুশের পথ ধরেই জাতি স্বাধীনতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছে। গর্বিত জাতি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। একুশ বাঙালিকে অন্যায়, অবিচার ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে। তাই এ দেশের মানুষ কখনই সামরিক ও স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করেনি। আপোস করেনি গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে। আর এসব কিছুরই প্রেরণা হয়ে আছে মহান একুশে। বাঙালির জীবন জুড়ে একুশ ভালবাসার অনন্য প্রতীক হয়ে আছে। সে ভালবাসা শুধু মাতৃভাষা বাংলার প্রতি প্রীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি হতে শুরু করে যা কিছু মহৎ ও মানবিক, সর্বত্রই সুবিস্তৃত এর আলোকছটা। একুশের চেতনা যতদিন আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করে রাখবে ততদিন কোনো দানবই জাতিকে পরাস্ত করতে পারবে না এটাই প্রমাণিত সত্য।
একুশের চেতনা ধারণ করে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষের সাথে যোগসূত্র স্থাপিত হবে, লুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো আপন মহিমায় নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে উজ্জীবিত হবে এবং গড়ে উঠবে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য বিশ্ব।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দায় পূরণে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগি হতে হবে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের হার না মানা চেতনাকে সঙ্গী করে দেশ গঠনে ব্রতী হলে কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। টেকসই উন্নয়ন ধারণার বীজ এখানেই উপ্ত আছে। একটি সুখি-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এ অপরাজেয় চেতনা হোক আমাদের নিত্যসঙ্গী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ