আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ সাহস ও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান উত্তরের চার জেলার কিশোরী শিক্ষার্থীরা

আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০২০, ৯:৪৩ অপরাহ্ণ

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি:


দেশের চলমান নারী নির্যাতন এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা যখন বেড়ে চলেছে ঠিক সে সময় উত্তরের চারটি জেলায় কন্যা শিশুদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থা। এই মুহূর্তে দেশের গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং রাজপথের আলোচিত বিষয় ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং নেটজ বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের মোট ৩২টি স্কুলে কন্যা শিশুদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ চলছে।
সরেজমিনে চার জেলার এই আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচি দেখা যায়, প্রশিক্ষণে নেয়ার পর স্কুল পড়ুয়া কন্যাশিশুদের আত্মবিশ্বাস যেমন বেড়েছে, ঠিক তেমনি নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুতও তারা। নাচোলের দুলাহার উচ্চ বিদ্যালয়ের সানোয়ারা সাহস করে কারো সাথে কথা বলতে পারতো না। বাইরে একা বের হতে ভয় পেতো। সে এখন কারো সাথে কথা বলতে কিংবা একা বের হতে ভয় পায় না। তার জীবনে যেন এক নতুন সকাল শুরু হয়েছে। সানোয়ারা বলে, ‘এখন আমি আর কোনো কিছু ভয় করি না। এখন নিজেকে যেকোনো বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবো এবং অন্যকেও রক্ষা করতে পারবো।’
বৃটিশ শাসকদের অত্যাচারে নাচোলের রানী ইলা মিত্র যেমন এগিয়ে এসেছিলেন তেমনি নাচোলসহ আশেপাশের এলাকার ৩২টি স্কুলের শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
শুধু সানোয়ারা নয়, এই স্কুলে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ নিয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদ শুরু করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। বাল্যবিয়ে, যৌন নিপীড়ন, লিঙ্গ বৈষম্য, অপুষ্টি, কন্যা শিশুর প্রতি অসচেতনতা যখন চারিদিকে ঘিরে ধরেছে ঠিক তখনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কন্যা শিশুদের নতুন জীবনের আলোর পথ দেখাতে শুরু করেছে এই আত্মরক্ষা মূলক প্রশিক্ষণ। প্রকল্প সম্বনয়কারী মাহবুবর রহমান জানান, আত্মরক্ষামূলত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মেয়েরা সাহসী হচ্ছে। তারা ভয়কে জয় করেছে। এখন আর মুখ লুকিয়ে না থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। অভিভাবকরাও বুঝতে পারছেন মেয়েরা কোনো অংশে কম নয়। মেয়েরা যে যৌন হয়রানির শিকার হয় তা কমানোর জন্যই মূলত এই প্রশিক্ষণ। আগামীতে এই প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহবুবর রহমান বলেন, এখন চারটি জেলায় এই কর্মসূচি চলছে- সামনে এর সংখ্যা আরো বাড়াতে চাই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা এই প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দিতে চাই। উত্তর-পশ্চিমের স্কুলগুলোতে চলা এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৬৪০ জন কিশোরী।
বালিয়াডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া খাতুন বলে, আগে আমি জানতাম না নিজেকে রক্ষা করতে কিন্তু আজ আমি নিজকে রক্ষায় পরিপূর্ণভাবে প্রশিক্ষিত হয়েছি। রাস্তায় চলাফেরার সময় আমরা মেয়েরা নানা রকম হয়রানির শিকার হই। কিন্তু এখন নিজেকে রক্ষা করতে পারবো। আমার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অভিভাবক চম্পা বেগম বলেন, মেয়েদের মধ্যে যে জড়তা ছিলো এই আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা জড়তা কাটিয়ে উঠেছে। তারা কথা বলতে শিখেছে, তারা প্রতিবাদ করা শিখেছে এবং বখাটে ছেলেদের হাত থেকে তারা নিজেকে রক্ষা করার সুয়োগ পেয়েছে।
নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা বলেন, সরকারিভাবে আমরা যেখানে পৌঁছাতে পারছি না ডাসকো সেখানে কিছুটা হলেও কভার করছে। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার সুবাদে সে সব জায়গতে পৌঁছাচ্ছে এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ও নেটস বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এই প্রশিক্ষণ নিয়ে সানোয়ারার মত অনেকেই নিজের পাড়াপ্রতিবেশিকে শেখাচ্ছে আত্মরক্ষার এই প্রশিক্ষণ। আত্মরক্ষার প্রশিক্ষক সম্পা আক্তার বলেন, সকল ধরনের অন্যায় ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে আমরা এদের প্রস্তুত করছি। এরাই আগামীর সবুজ বাংলাদেশ। আর এভাবেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল পড়ুয়া কিশোরীদের অদম্য সাহস আর উঠে আসা সব ধরনের নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ।
নেটজ বাংলাদেশের কর্মকর্তা সারা খাতুন বলেন, এই কর্মসূচির ফলে নারীরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও নিজেদের রক্ষার পাশাপাশি কন্যা শিশুদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। উত্তরে চারটি জেলায় আলো ফুটতে শুরু করেছে। এতে করে সামগ্রিক উন্নয়নে এগিয়ে যাবে। তবে এই কর্মসূচি পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেবার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। এই আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী সংগঠন ডাসকো ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আকরাম জানান, বাংলাদেশের অন্যতম বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রবণ এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে সমস্ত স্কুলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে সে সমস্ত এলাকার সামগ্রিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে এই সব স্কুল পড়ুয়া কিশোরীরা এখন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পার করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ