আত্মশুদ্ধিতেই বিষবৃক্ষের মুলোৎপাটন

আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০১৯, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

মো. সামিউল আলম


সমাজের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি দুর্নীতি। বর্তমানে সারা বিশ্ব জুড়েই দুর্নীতিকে মারাত্মক সামাজিক সংকট ও সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি স্তর ও প্রতিষ্ঠান আজ দুর্নীতির শিকার। সমাজকে কলুষিত করে তাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে দুর্নীতি যেন বদ্ধপরিকর। ১৭৫৭ সালে মীরজাফরের দুর্নীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতা। তারপর দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের বিষবাষ্পে লালিত দুর্নীতির বিষবৃক্ষ পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের নৃশংস বর্বরতা আর মানবতাবিরোধী অপরাধে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে কলুষিত করে শিকড় গেড়ে বসে। আর এ জন্যই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “.. সুখি ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কিনা সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।”
সাধারণ অর্থে ন্যায়নীতি, আদর্শ আর মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য আইন অমান্য করে কোনো কর্মকাণ্ড করাই দুর্নীতি। সাধারণত সমাজে তিন ধরনের দুর্নীতি দেখা যায়, যেমন : ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি/রাজনৈতিক দুর্নীতি, সরকারি দুর্নীতি ও বেসরকারি দুর্নীতি। যখন কোনো দেশ ও সমাজে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, সমাজে জবাবদিহিতার অভাব থাকে, সমাজে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সক্রিয় সুশীল সমাজের অনুপস্থিতি থাকে, দুর্নীতি প্রতিরোধী আইনের কার্যকরী প্রয়োগের অভাব পরিলক্ষিত হয়, সর্বোপরি মানুষের দারিদ্য্র আর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা থাকে তখন সেই সমাজে দুর্নীতির মাত্রাও অনেক বেশি হয়।
সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত পিতা-মাতার শিশু বেড়ে উঠছে তাদের দুর্নীতির টাকায়। শিশুটি লেখাপড়া করছে ভাল একটি স্কুলে, হয়তো ডোনেশনের নামে ঘুষের দুর্নীতির মাধ্যমে। পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, ভাল রেজাল্টও করছে। ভাল জায়গায় ভর্তি হচ্ছে। একসময় ভাল জায়গায় চাকরি হচ্ছে বা ব্যবসা করছে, সমাজে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে এসবের মধ্যেও হয়তো কোনো দুর্নীতি দৃশ্যমান। পরবর্তীতে নিজেও অনুসরণ করছে দুর্নীতিবাজ পিতা-মাতার পদাঙ্ক। সমাজের অন্যরা এ থেকে যে শিক্ষা নিচ্ছে তা আরও ভয়াবহ। কারণ প্রতিযোগিতামূলকভাবে সন্তানের প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সকল নীতি-নৈতিকতা, বিবেক, আইন, ধর্মীয় মূল্যবোধ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতিকেই প্রতিষ্ঠিত করছি। ফলে দেখা যাচ্ছে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ দুর্নীতিতে আক্রান্ত ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
দুর্নীতি যেমন প্রাচীন তেমনি এর শিকড়ও সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। দুর্নীতি আমাদের জাতীয় উন্নয়নে সবসময়ই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পরপর পাঁচবার সেরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আর তাই সময় এসেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন বিশ্বের কাছে বিস্ময়। আর এই দেশ ও সমাজের উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে হলে দুর্নীতিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আর এর জন্য নিতে হবে কিছু সমন্বিত ও কার্যকরী পদক্ষেপ। যেমনÑ নিয়ম-কানুন ও দুর্নীতি বিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ও প্রয়োজনে সংশোধন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, বিচার ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত মামলার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা, সরকারের সকল বিভাগের কাজের স্বচ্ছতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা, সমাজ থেকে একচেটিয়া ক্ষমতা দূর করা, এককভাবে একচেটিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দূর করা, জনগণের মধ্যে তথ্য অধিকার আইনের চর্”া বৃদ্ধি করা, ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা, বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে দেশপ্রেম ও দুর্নীতি বিরোধী চেতনা জাগ্রত করা এবং সর্বোপরি সক্রিয় সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী ও সোচ্চার হতে হবে।
প্রথম থেকেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিশেষ করে সরকার টানা তৃতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সে আলোকে আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে। কিন্তু দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসেবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় : জাতীয় শুদ্ধচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশলটি বান্তবায়নের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বেশ কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হচ্ছে। সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। কারণ দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ঠ্রীয় উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলন।
হাজার বছরের বাঙালি জাতির রয়েছে গৌরবময় সংগ্রামের ঐতিহ্যগাঁথা। যে জাতি বিদেশি বর্গীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য দিয়েছে লাখো জীবন ও সম্ভ্রম, সেই জাতির এগিয়ে চলার পথকে এই দুর্নীতি রূখে দিবে, এ হতে পারে না । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর দীর্ঘ সংগ্রামের চালিকাশক্তি ছিল একটি সুখি, সমৃদ্ধ ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আসুন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্যক্তিচেতনাকে সম্পৃক্ত করি এবং দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলি।
লেখক: তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী।