আত্মসংযম

আপডেট: জুন ২৯, ২০১৭, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


আত্মসংযম অর্থ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। যে বা যারা নিজেকে বা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে কিংবা জানে সে বা তারাই যোগ্য মানুষের মর্যাদা পায়। যারা সংযমী তারা নির্লোভ। কোন মোহই তাকে অসংযমী করতে পারে না। পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে তাঁদের অবস্থান। আমরা অনেকেই বাহ্যিকভাবে সংযমী হলেও প্রকৃত অর্থে সংযমকে লালন কিংবা ধারণ করতে পারি না।
এ না পারাটা অনেকটাই স্বাভাবিক কিন্তু এ না পারাটা নিয়ে আমরা যতটা না চিন্তিত তাঁর চেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত বাইরের ভড়ংটা বজায় রাখতে। এ ভড়ং বা লেবাসটাই খারাপ। সবাই সবকিছু পারে না কিংবা পারা সম্ভবও নয়। যা আমি পারি না সেটাকে আয়ত্ব করার চেষ্টার চেয়ে তা পারি বলে প্রমাণ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা আমাদের মূল সত্যি থেকে বিচ্যুত করে। এ বিচ্যুতি ব্যক্তি পরিবার, সমাজ-তথা একটা জাতি সম্পর্কে অন্যের মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতে পারে। প্রকান্তরে প্রকৃত সংযমের চর্চা ব্যক্তি, সমাজ তথা জাতিকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করে ইতিবাচকতা মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ়তর করে। সংযম একান্তই আপন সত্ত্বার সংগে যুক্ত। সংযম মানুষকে পরিশীলিত হতে শেখায় পরিবারই হচ্ছে এ শিক্ষার প্রথম সূতিকাগার। যে কেউ ইচ্ছে করলেই ওই অমূল্য রতœটি আয়ত্ব করতে পারে।
সংযমী হলে একজন মানুষ কী কী উপকারিতা পেতে পারে সেটা জানা দরকার। আত্মসংযমকে আমরা আত্ম-শৃঙ্খলাও বলতে পারি। এবং এ শৃঙ্খলা বোধ বা চর্চা আমাদের নানাভাবে জীবনে সাহায্য করে। মূলতঃ সংযমের চর্চা মানুষের বিষণœতা, ভয়, খারাপ কাজের প্রতি আসক্তি এবং যে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ থেকে মুক্তি পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সংযম মানুষকে শেখায়-
* ধ্বংসাত্মক, অতিরঞ্জিত, বদ্ধমূল ধারণা এবং নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে।
* নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার এবং সারা জীবনের ভারসাম্য রক্ষার জ্ঞান দেয়।
* অতি আবেগকে দমন করে পরিমিতিবোধ বা সংযত আচরণ করতে সাহায্য করে।
* নিজের অসহায়ত্ব দূর করে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে।
* মানসিক ও আবেগীয় নিরাসক্তিকে সুস্পষ্ট করতে সাহায্য করে মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
* নেতিবাচক ধারণা ও ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে অবদান রাখে।
* মানুষের নিজেকে শ্রদ্ধা করতে, আস্থা, অর্ন্তনিহিত শক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছা শক্তিকে বেগবান করতে সাহায্য করে।
* নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে সহায়তা করে।
* সর্বোপরি একজন মানুষকে দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হতে সাহায্য করে।
শিষ্টাচার বা আত্মসংযম বৈচিত্রপূর্ণভাবে মানুষের উন্নয়নে সাহায্য করে সত্যি। কিন্তু কিছু কিছু বাধাও মানুষের ইতিবাচক বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কখনো কখনো।
যেমন-
১) কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বোঝার অভাব।
২) প্রবল ও অনিয়ন্ত্রিত আবেগের প্রভাব।
৩) আগে-পিছে না ভেবে হঠাৎ করে কোন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা।
৪) ইচ্ছাশক্তি ও নিয়মানুবর্তিতার অভাব।
৫) নিজেকে পরিবর্তন করা বা উন্নতি করার চেষ্টা না থাকা।
৬) নিয়ম-কানুন বা নিয়ন্ত্রণকে শ্রদ্ধা না করা বা ভালো না লাগা।
৭) নিজের সামর্থ্যরে উপর বিশ্বাস না থাকা।
সংযম বা অন্য যে কোন ভালো কিছু আয়ত্ব করার ক্ষেত্রে যে বাধাটা থাকুক না কেন মানুষ তা অতিক্রম করতে পারে চেষ্টা করলেই। সুতরাং, সংযমী হবার অনুপ্রেরণায় জীবনকে নতুন নতুন সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত করতে মানুষ আত্মনিয়োগ করে, খুঁজে বের করেছে সংযমী হবার মূল মন্ত্র। একজন মানুষ যদি সেগুলোর চর্চা করে তাহলে অনায়াসেই সব বাধা অতিক্রম করে সে হতে পারে সকল, সুখি, গ্রহণযোগ্য ও অনুসরণীয় ব্যক্তি।
১) ধ্যান করা: যে কোন সমস্যা সমাধানে অন্তত:পক্ষে ৫ মিনিট অন্য সব চিন্তা দূরে রেখে শান্তচিত্তে ধ্যানমগ্ন হওয়া। দেখবেন কোনো না কোনো সদুপায় আপনার সামনে উপস্থিত হবে।
২) পরিমিত ও সুষম খাবার গ্রহণ: মানুষের সহজপাদ্য খাবার খাওয়া উচিৎ। মিষ্টি বা চর্বিজাতীয় খাবার সহজে পরিপাক না হওয়ায় শারীরিক ক্ষতি করে।
৩) ব্যায়াম করা: প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করা। যারা অফিসে বসে বসে কাজ করে। বা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যাদের কাজ করতে হয় তাদের কিছুক্ষণ পর পর উঠে খানিকটা হেঁটে নেওয়া উচিত। নিয়মিত ৪০-৪৫ মিনিট হাঁটা এবং হালকা ব্যায়াম করা প্রতিটি মানুষের খাবার গ্রহণের মতো অবশ্য করণীয় কাজ।
৪) ঘুম: পর্যাপ্ত ঘুম সুস্থ শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য। প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য।
৫। মানুষের কোন কিছু পাবার বা করার ইচ্ছা তাকে ¯্রােতের মতো তাড়িত করে। কিন্তু এ তাড়নাকে প্রশ্রয় না দিয়ে অন্ততঃ কিছুটা সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। হতে পারে সেটা মাত্র ১০ মিনিট। তড়িঘড়ি না করে তাতে সময় নিলে তাতেই বেশি সাফল্য আসে।
৬) নিজেকে ভুলে যাওয়া: কোনো কাজ করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল হয়ে যায় তাহলে তাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে মূল লক্ষ্যের দিকে মনোনিবেশ করা উচিৎ। যদি ভুলকে আঁকড়ে ধরে অযথা আক্ষেপ করি তাহলে শরীর, মন, সময় সবই নষ্ট হবে। কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে ভুলে যাওয়াই সর্বোত্তম পন্থা এক্ষেত্রে। সব কিছু ভুলে নতুনভাবে শুরু করলে সহজেই ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
জীবনের সবক্ষেত্রেই সংযমী হলে সাফল্য আপনিই ধরা দেয় মানুষের জীবনে। সাময়িক ত্যাগ মানুষকে উপহার দিতে বৃহত্তর প্রাপ্তিকে। সুতরাং, ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে বৃহৎ কল্যাণকে গ্রহণ করতে আমরা সকলেই আত্ম-সংযমী হতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হবো।