আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষায় এক হয়ে কাজ করতে হবে : বাদশা || সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬২তম বার্ষিকী উদ্যাপন

আপডেট: জুলাই ১, ২০১৭, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা-সোনার দেশ

মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬২তম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহী জেলা ও মহানগর কমিটির
আলোচনা সভায় আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাশের আহ্বায়ক সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ, যা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তৎকালীন সাঁওতাল আদিবাসীরা যে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন তা এখনো পূরণ হয়নি, এখনো আদিবাসীরা নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তাই আদিবাসীদের সার্বিক উন্নয়ন এবং সংস্কৃতি রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে এক হয়ে কাজ করতে হবে। একইসাথে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টায় রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে (মিয়াপাড়া) আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফজলে হোসেন বাদশা এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি বিমল চন্দ্র রাজোয়াড়।
বক্তব্য দেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, সমাজসেবক সূর্য হেমব্রম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি কল্পনা রায়, ব্লাস্ট রাজশাহী জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট আবদুস সামাদ, লেখক ও গবেষক প্রশান্ত কুমার সাহা, ওয়ার্কার্স পার্টি রাজশাহী জেলার সভাপতি রফিকুল ইসলাম পিয়ারুল, ন্যাপ রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম, কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য রাজকুমার শাও, আদিবাসী যুব পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি নবদ্বীপ লাকড়া, রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক সুসেন কুমার শ্যামদুয়ার, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ কুমার মুন্ডা, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হেমন্ত মাহাতো প্রমুখ। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহী মহানগর সাধারণ সম্পাদক আন্দ্রিয়াস বিশ্বাস।
প্রসঙ্গত, সাঁওতাল বিদ্রোহের মহানায়ক সিধু-কানু-চাঁদ-ভৈরব-ফুলমনি মুরমু এর নেতৃত্বে জমিদার, মহাজন, পুলিশ, ঠিকাদার ও ব্রিটিশ সরকারের জুলুম অত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও গ্রামকে গ্রাম অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন আদিবাসী সাঁঁওতালসহ সকল শ্রেণির সংগ্রামী গরিক মানুষ সমবেত হয়ে কৃষকদের অধিকারের দাবীতে গণসংগ্রাম গড়ে তোলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হন। ব্রিটিশের সাথে লড়াই করে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল জীবন দিয়েছিলেন।
রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল অ্যাকাডেমি : গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজশাহী শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল অ্যাককাডেমি এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৬২তম দিবস সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস পালন করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রাজমাহী বিভাগীয় কমিশনার নূর উর রহমান বলেন বর্তমান সরকার সকল জাতীগোষ্ঠীর সংস্কৃতি রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি সিধু, কানু দিবসের গুরুত্ব, সঠিক ইতিহাস ও চেতনাকে লালন করার জন্য সকল আদিবাসীকে পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান। তিনি সকল আদিবাসী জনগণকে নেশা থেকে বিরত এবং সকল শিশুকে স্কুলে পাঠানোর পরামর্শ প্রদান করেন।
আলোচনার পূর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র‌্যালিটি নগরীর শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াথানার প্রধান ফটক দিয়ে ঘুরে পুনরায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে ফিরে আসে। আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সর্বিক) ও রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালাচারাল অ্যাকাডেমির উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ, আদিবাসী মুক্তিমোর্চার সভাপতি যোগেন্দ্রনাথ সরেন, আদিবাসী বিষয়ক লেখক ও গবেষক গাব্রিয়েল হাঁসদা। অন্যান্যদের মধ্যে অ্যাকাডেমির বেঞ্জামিন টুডু ও মানুয়েলসহ সকল কর্মকর্তা কর্মচারী, শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ আদিবাসী জনগণ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে প্রধান অতিথি বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।
সিসিবিভিও : দিবসটিকে মাথায় রেখে সিসিবিভিও-রক্ষাগোলার যৌথ উদ্যোগে সাকুড়া রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের সভাপতি সিরিস মিঞ্জ-এর সভাপতিত্বে গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। র‌্যালিটি গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম প্রদক্ষিণ করে পুনরায় গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে এসে শেষ হয়। দিবসটির র‌্যালি ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে ইউপি হলরুমে বক্তব্য দেন, সিসিবিভিও’র রক্ষাগোলা স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহাবুব জামান তপন, বিজ্ঞান শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী নিরাবুল ইসলাম নিরব, গোগ্রাম ইউপি সদস্য সুধীর টপ্প্য, গোদাগাড়ী হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি কৃষ্ণ কুমার সরকার, রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের নেতৃত্ব নিপেন মিঞ্জ, ঝর্ণা লাকড়া, সুদক্ষণ টপ্প্য, বিমল তির্কী, শ্রীদেবী তিজ্ঞা, নিবারণ তির্কী ও রিনা রানী মঞ্জ। র‌্যালি ও আলোচনা সভায় ৩০টি ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনসমূহের দুই শতাধিক নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীবান্ধব সরকার। ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর সমস্যাসমূহ ও নির্যাতন প্রতিরোধে সকলকে একতাবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সিসিবিভিও’র রক্ষাগোলা স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহাবুব জামান তপন বলেন, “আমরা জানি ইংরেজ রাজত্বের দু’শ বছরের শাসন ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতবর্ষে বহু কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল। এর মধ্যে সন্নাসী বিদ্রোহ, ২৪ পরগনা জেলার তীতুমীরের বিদ্রোহ, ফরিদপুর জেলার দুদু মিয়ার বিদ্রোহ, সান্তাল-কৃষকদের বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, নীল চাষীদের বিদ্রোহ এবং বগুড়া ও পাবনার রায়তদের বিদ্রোহ অন্যতম। এসব বিদ্রোহ বা বড় বড় মুক্তি সংগ্রামের মধ্যে সান্তাল হুল বা সান্তাল বিদ্রোহের গুরুত্ব সমাধিক। সুতরাং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির পুর্ব পুরুষদের বীরত্ব বর্তমান প্রজন্মের নিকট তুলে ধরতে হবে।”