আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের বেদনার কথন

আপডেট: আগস্ট ৯, ২০২০, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু


আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আদিবাসী বলতে দেশের শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গও চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারোদের নামটিকেই অগ্রগণ্যে রাখেন। জনসংখ্যার দিকে আদিবাসী সাঁওতালদের আধিক্য থাকলেও শিক্ষার হার এবং গোষ্ঠীবদ্ধতার বাইরে তারা তাদের পেশাগত দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে; সে কারণেই সাঁওতাল নামটি আড়ালেই থেকে যায়। এভাবেই উত্তরবঙ্গে অর্ধশতাধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও; অপরিচিতই থেকে গেছে দেশবাসীর কাছে। অনেক কাঠ-খড় শেষ পর্যন্ত সরকারের খাতায় ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী/আদিবাসীর নাম ঠাঁই পেয়েছে; যদিও সেখানে কিছুটা ভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। তথ্য মতে, হুদি এবং খারওয়াড়/খেড়োয়ার নামে কোনো জনগোষ্ঠী রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই; বরং যেটি জেনেছি, খেরোয়াড় (কযবৎড়ধিৎ) হচ্ছে আদিবাসী সাঁওতালদের একটি অংশের নাম। বৃহত্তর সিলেটাঞ্চলে কারো কারো মতে ১১৬টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, ২৩ মার্চ ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ গেজেট’- বাফকগুলোর নাম না থাকায় আশান্বিত হয়েও আশাহত হয়েছেন; প্রতিবাদ ও ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে চলেছেন বৃহত্তর সিলেটবাসী।
এ বছরের প্রথমার্ধে জানলাম আদিবাসীদের কোটা আর থাকছে না। পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক বলেছেন, ‘কোটা পদ্ধতি বিলোপের মাসখানেক আগে ৪০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি হলেও আমরা বলেছিলাম কোটা বিষয়ে সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হবে। সরকার যেহেতু কোটা প্রথা বিলুপ্ত করেছে এখন থেকে পরবর্তী আর কোপনভ বিসিএসে কোটা পদ্ধতি থাকছে না। ফলে ৪০তম বিসিএসেও কোটা থাকছে না। কাজেই ৩৮তম বিসিএসকেই বলা যায়- যেখানে কোটার সর্বশেষ প্রয়োগ হলো।’ শুধুমাত্র বিসিএস-এ নয় প্রথম থেকে অষ্টম নন-ক্যাডারে সব পদে কোটা বিলুপ্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা (প্রথম আলো ২১.১.২০২০)। তথ্যানুযায়ী, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা বরাদ্দ ছিলো। পিএসসি’র প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া যাওয়ায় ২৮ থেকে ৩৮তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে অন্তত ছয় হাজার পদ খালি ছিলো। এমন কী শুধু কোটার প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেওয়া হলেও এই বিসিএসেও মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৮১৭টি, নারী ১০টি ও ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর ২৯৮টিসহ মোট ১ হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রাখতে হয়। শুধু বিসিএস নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ অন্যান্য নিয়োগেও একই অবস্থা হয় (১.৭.২০২০)। উত্তরবঙ্গের প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীদের মধ্যে বিসিএস অবতীর্ণ হয়ে কাজে যোগদানের তালিকা অতীতে প্রণয়ন করেছিলাম। সেখানে প্রতীয়মান হয়েছে যে, দেড় ডজন থেকে বিসিএস ক্যাডারের তালিকা বাড়ানো যায়নি। পাহাড়ি অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা সব ধরনের ক্যাডারে বিচরণ করলেও উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীরা শিক্ষা ক্যাডারেই সর্বাধিক নিয়োগ পেয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিশ^বিদ্যালয়গুলোর ডিগ্রি নিয়ে শত শত আদিবাসী ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় মুখোমুখি হচ্ছে; কিন্তু কোথায়, কেন যেন মাঝপথে আঁটকে যাচ্ছে। দুর্মুর্খেরা বলে থাকেন, চাকরি পেতে মামা-চাচার জোর লাগে, রাজনৈতিক জ্যাক লাগে কিংবা বাঁ হাতের কারবারও নাকি বেশ কাজে লাগে। হয়তো এই যোগ্যতা আমরা উত্তরবঙ্গবাসী অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছি। মন্ত্রিসভায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে কোটা বহালের বিষয়ে প্রস্তাব করলেও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তা নাচক করে দিয়ে বলেছেন, ‘কোটা প্রত্যাহারের পরও যাদের অনগ্রসর শ্রেণি বলা হয়, তারা অনেক ভালো ফল করছে’ (২১.১.২০২০)। বেদনার কথা হলো, যেসব আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সুযোগ পেয়েছে, তারা শতভাগ সুযোগের সৎ ব্যবহার করেছে কিন্তু যারা পায়নি; তারা শূন্যতেই রয়ে গেছে। অনেক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের মধ্যে এখন একজনও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করতে পারেনি। এদের অনেকেই রয়েছেন প্রথম প্রজন্ম শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন। আর এই মুহূর্তে আদিবাসী কোটা বিলুপ্তের ঘোষণা একতরফা হচ্ছে কী না ভেবে দেখা দরকার।
বৈশি^ক দূর্যোগকালীন আমার দেশের বাজেট উত্থাপন, আলোচনা ও মহান সংসদে পাস হয়েছে। বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় সমতলের আদিবাসীদের জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের থেকে একটু বেশি। বিগত বছরে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিলো। অর্থাৎ সমতলের ২০ লাখ আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ মাথাপিছু মাত্র ২৫০ টাকা মাত্র, আর পূর্বের বছরটিতে ছিলো ২০০ টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য এই অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ ছিলো ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। বরাবরই সরকার প্রধানের নিকট আবেদন জানানো হয়েছে, সমতলের প্রায় ২০ লক্ষাধিক অনগ্রসর আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ সামান্যই। তবে দেশের আদিবাসী ও আদিবাসীদের বান্ধব গবেষকগণ অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের বিষয়টিও দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। তথ্য মতে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমতল ভূমিতে বসবাসরত আদিবাসীদের আর্থসামাজিক ও জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের পরিমাণ রাখা হয়েছে ৪৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। আমার দেশসহ সারা বিশে^ই অর্থনৈতিক মন্দা ও দরিদ্র্যতা বৃদ্ধির আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নভেল করোনা মহামারিতে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সে হিসেবে এখন দেশে ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে (কালের কণ্ঠ ৮.৬.২০২০)। অতীতেই অবলোকন করেছি, সমতলের ২০ লাখ আদিবাসীর মধ্যে ৮০ শতাংশই দরিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ লাখ আদিবাসীর মধ্যে ৬৫ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছেন। বৈশি^ক মহামারির কবলে পড়ে দিশেহারা হয়েছেন সমতল-পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসীরা। মহান জাতীয় সংসদে পাসকৃত বাজেটে গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে, মাথাপিছু গড় বাজেট বরাদ্দের তুলনায় আদিবাসীদের জন্য ২৬-২৭ শতাংশ কম এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য ৪৬-৪৭ শতাংশ কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থবছরের বাজেটে কোভিড ও কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিকে বিবেচনায় এনে প্রান্তিক ও আদিবাসী মানুষের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। মহামারিতে পর্যদুস্ত আদিবাসীরা দরিদ্র্যতাকে জয় করতে প্রয়োজন আরো সহযোগিতা, সহভাগিতা এবং বেঁচে থাকার জন্যে স্থায়িত্ব কৌশল। বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতাকে আরো সমুজ্জ্বল করতে আদিবাসীরা দাবি করেছিলেন অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ; সেটি তো হয়-ই নি; অপেক্ষাকৃত কম বরাদ্দে আদিবাসীরা হতাশই হয়েছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকায় অনেক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী বসবাস করেন। নির্বাচন পূর্ব কিংবা নির্বাচনোত্তর আদিবাসীদের নিয়ে সভা, মিটিং বা এলাকায় জনসভাগুলোতে উপস্থিত জাতিগোষ্ঠীর সম্মুখে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করে আদিবাসীদের প্রাপ্ত অধিকার বিষয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণে প্রতিশ্রুতি শোনান। আমরা তাদের প্রশংসা করি। তাদের পক্ষে সমর্থন দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে থাকি। মহান জাতীয় সংসদে আলোচনায় আমাদের সাংসদগণ ‘আদিবাসী শব্দ’ বেমালুম ভুলে গিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীতে অভ্যস্ত হোন। আমার একজন হিতাকাক্সক্ষী রহস্যটা উদঘাটন করে বলেছেন, এটি সাংবিধানিক বাধ্য বাধকতা রয়েছে। পবিত্র সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া’ শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘ কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি ক. উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা খ. সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’ অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে ব্যবহৃত শব্দটিকেই কথ্য ও লিখিতরূপে প্রয়োগ করতে হবে। সত্যিই আমরা আশাহত, রাজনৈতিক চক্রের বলয়ে আমাদের বেদনার্ত চেহারা, নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বিগ্নতা চাহনীর কোনো মূল্য নেই। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার্য না হয়ে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার বিশ্লেষণ একান্ত আবশ্যিক।
লেখক: সংবাদকর্মি