দেড়শো বছরের ঐতিহ্য শিবগঞ্জের আদি চমচম, জিআই পণ্যের স্বীকৃতি চাই জেলাবাসী

আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৪, ১১:২৭ অপরাহ্ণ


সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার আদি-চমচমের ইতিহাস বাংলার নবাবি আমলের। শিবগঞ্জের আদি চমচম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১৫০ বছরের ঐতিহ্যের ধারক। প্রাচীন বাংলার-রাজধানী গৌড় তথা অবিভক্ত ভারতের মালদহ জেলার থানা ছিলো শিবগঞ্জ। সে সময় এ অঞ্চলে ছিলো অনেক ময়রার বসবাস। দেশভাগের পর অনেকে মালদহে চলে গেলেও বেশকিছু পরিবার থেকে যায় শিবগঞ্জ উপজেলায়। সেই সময় থেকে শুরু করে তারা এখনও পৈতৃক এ পেশা ধরে রেখেছেন। এ চমচমের নাম শুনলেই জিভে জল চলে আসে। নানা আকারের সু-স্বাদু চমচমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চমৎকার ডিজাইন আর কড়া মিষ্টির আবরণের ভেতর গোলাপি আভাযুক্ত নরম অংশ।

ঐতিহ্যবাহী এ চমচম পাওয়া যায় কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌর শহরের তিনটি দোকানে। অতুলনীয় স্বাদ, গন্ধ আর বর্ণের সংমিশ্রণে পোড়ানো ইটের মতো রঙ আদি চমচমের। সেই আদি চমচমের জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতির ঘোষণা চান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাবাসী।

জানা গেছে, ১৮৫৮ সালের দিকে শিবগঞ্জ বাজারে ‘আদি চমচমের’ আবির্ভাব ঘটান স্থানীয় নরেন্দ্র কুমার সরকার। তার মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সোনামসজিদ, কানসাট ছাড়িয়ে তৎকালীন মহকুমা শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তার মৃত্যুর পর এ ব্যবসার হাল ধরেন তার ২ ছেলে তাবল সরকার ও ইন্দ্রভূষণ সরকার। বর্তমানে ৩ পুরুষের আদি চমচমের ব্যবসায় চালাচ্ছেন ইন্দ্রভূষণ সরকার ছাড়াও তাবল সরকারের ছেলে অরুণ কুমার সরকার এবং অপর ভাই বিজয় কুমার সরকারের ছেলে রিপন কুমার সরকার।

শিবগঞ্জ বাজারে পাশাপাশি তিনটি আদি চমচমের দোকান। আদি চমচম, আসল আদি চমচম ও নিউ আদি চমচম। তিনটি দোকানকে কেন্দ্র করেই বিখ্যাত মিষ্টি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে। গরুর খাঁটি দুধের ছানা ছাড়া আদি চমচম তৈরি অকল্পনীয়।

এছাড়া যে কেউ ইচ্ছা করলেই আদি চমচম তৈরি করতে পারে না। এ চমচম তৈরির সঙ্গে এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও পানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য জড়িত রয়েছে। এর আগে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিষ্টি তৈরির কারিগররা এই আদি চমচম তৈরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। সুস্বাদু আদি চমচম তৈরির জন্য একমাত্র শিবগঞ্জের পানি ও আবহাওয়াই উপযোগী।

আদি চমচমের মূল বিশেষত্ব হচ্ছে কড়া পাকে বিশেষ কায়দায় ছানা, মেওয়া ও চিনির সমন্বয়ে তৈরি মিষ্টি। অস্থিরচিত্তে বা আনমনে থাকলে কখনোই আদি চমচম তৈরি করা সম্ভয় নয়। মাপমতো চুলার আগুনের তাপ দিয়ে আদি চমচমের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হয়। চিনি সিরা (রস) তৈরিতেও বিশেষভাবে নজর রাখতে হয়।

আগুনের তাপের তারতম্য হলে স্বাদ-গন্ধ-বর্ণে আদি চমচমের স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যায়। এ অঞ্চলের আদি চমচম তৈরির প্রসিদ্ধ কারিগর ছিলেন ভাদু সাহা। তার হাতের তৈরি মিষ্টি ছিল অতুলনীয়। তিনি প্রায় আধামণ ওজনের আদি চমচমও তৈরি করতে পারতেন। স্বাধীনতা-উত্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে তার তৈরি বিশাল এ আদি চমচম প্রদর্শিত হয়।
শিবগঞ্জে আদি চমচম প্রতিকেজির দাম ৩০০ টাকা। প্রতিটির ওজন ৭৫ গ্রাম থেকে ১৫০ গ্রাম। তবে ৫ থেকে ৮ কেজি ওজনের আদি চমচমও তারা সরবরাহ করেন ৬০০ টাকা কেজি দামে।

বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে অনেক মানুষ বড় আকৃতির এ আদি চমচম অর্ডার দিলে তারা সরবরাহ করে থাকেন। শিবগঞ্জ উপজেলা শহরের তিনটি দোকান থেকে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ মণ আদি চমচম বিক্রি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আদি চমচম নিতে এই দোকানগুলোতেই মানুষ ভিড় করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রবীন আইনজীবী সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা তাসেম মিয়া উকিল সাত বছর আগে তার বাসায় খাবার টেবিলে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে গল্পের ছলে বলেছিলেন, ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক সফরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এসেছিলেন এবং তাসেম বোডিং রাতযাপন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু রাতের খাবার শেষ করার পর, তাসেম মিয়া উকিল শিবগঞ্জের আদি চমচম খাইয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আদি চমচম খেয়ে ভীষণ প্রশংসা করেছিলেন।

সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সাবেক জি এম মো. শামিমুল হক শামিম শিবগঞ্জের আদি চমচমকে জি আই পণ্যের স্বীকৃতির দাবি জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক জায়গায় চমচম তৈরি করেন। তবে শিবগঞ্জের চমচমের সাথে অন্যদের তৈরি করা চমচমের তুলনা হয় না। তাই এই মিষ্টিতে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দেয়া উচিত।
নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মাজহারুল ইসলাম তরু জানান, ১৫০ বছরের আদিচমচম দারুন সুস্বাদু। তার ধারনা বাংলাদেশে আদিচমচম এর সমতুল্য কোন চমচম নেই। কাজেই এটাকে জি আই পণ্যে হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিয়াউর রহমান এমপি ও সাধারণ আব্দুল ওদুদ এমপিও জি আই পণ্যের দাবি জানান।