আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও নারী উন্নয়ন

আপডেট: মার্চ ৮, ২০১৭, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

তাজকিয়া আকবারী


৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসটির তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদেরকে যেতে হবে ১৮৫৭ সালে। ১৮৫৭ সালের এই দিনে নিউইয়র্ক শহরের সেলাই কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকরা অমানবিক ও বিপজ্জনক পরিবেশ, বৈষম্যমূলক মজুরি, দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শ্রমজীবী নারীর অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথে মিছিল বের করলে তা পুলিশি হামলার সম্মুখীন হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নারী শ্রমিকসমাজ সম্মিলিতভাবে নারী শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করে আন্দোলন শুরু করে। অতঃপর ১৯১০ সালের ৮ মার্চ ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ক্লারা জেটকিন এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালনের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে দিবসটির গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তায় নারী সমাজের অগ্রযাত্রাকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ ১৯৮৫ সালে ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
দেশে নারী আন্দোলনের এই প্রতিবাদী ধারাকে তুলে ধরে দিবসটি পালনের লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন কমিটি গঠিত হয়। অতঃপর এ যাবত বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ও বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন হয়ে আসছে। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়- “নারী-পুরুষ সমতায় উন্নয়নের যাত্রা-বদলে যাবে বিশ্ব, কর্মে নতুন মাত্রা।”
স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে স্বাধীন চলাফেরা জন্মগত অধিকার হওয়া সত্বেও এ অধিকার থেকে নারীদের বঞ্চিত করা হয় সুকৌশলে। শিশুকাল থেকেই নারীকে বোঝানো হয় বাইরে যাওয়া তার জন্য নিরাপদ নয়। পরবর্তীতে স্বামী-সন্তান, সংসারের বোঝা কাঁধে চাপিয়ে বন্ধ করে দেয় স্বাধীন চলার পথ। এভাবে পরিবার ও সমাজ নারীর চলাচলকে করে দেয় সংকুচিত, নারী বাধ্য হয় এই শৃঙ্খল মেনে নিতে এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র পরিসরে জীবন যাপনে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও নারী নির্যাতনের সংখ্যা নিছক কম নয়। তবে দেশ-কাল-পাত্র ভেদে  নির্যাতনের ধরনে হয়ত ভিন্নতা থাকতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী দেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশ এখনো নির্যাতনের শিকার। জীবনের কোন না কোন সময়ে তারা স্বামীর অথবা তার পরিবারের মাধ্যমে শারীরিক, মানসিক, যৌন, আর্থিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ২০১১ সালে এর হার ছিল ৮৭ শতাংশ। বাল্য বিবাহ, রেজিস্ট্রিবিহীন বিবাহ, মারধোর করা, বহুবিবাহ, তালাক, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, কন্যা সন্তান জন্ম দিলে অত্যাচার, কম খাবার খাওয়া এবং পরিশ্রম বেশি করা, নারী পাচার, অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌন নির্যাতন, পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্ত নারীদের প্রতি বৈষম্য, বার্ধক্যে নারীদের প্রতি বৈষম্য, ফতোয়াবাজি প্রভৃতি দ্বারা নারী নির্যাতিত হয়। নির্যাতিত নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত করে।
এই সকল নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারী সমাজ সংগঠিত হচ্ছে । নারীরা আজ ক্রমেই সচেতন ও সোচ্চার হয়ে উঠছে। প্রতিবাদ, সেই সঙ্গে প্রতিরোধও করছে নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচারকে। কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রত্যয়ী পদযাত্রা ক্রমেই গভীর ও দীর্ঘতর হচ্ছে । সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল কর্মকা-ে অধিক মাত্রায় অংশ নিচ্ছে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের নারী। বিশ্ব নারীমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার বিষয়েও তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
১৯৯৫ সালে বেইজিঙে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্বনারী সম্মেলনে গৃহিত বেইজিং প্লাটফরম ফর অ্যাকশন, সিডো সনদ ইত্যাদিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার নারী উন্নয়নে বিভিন্ন আইন প্রনয়ণ ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নারীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণ কর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
কবি নজরুল ইসলামের পংক্তি দুটির যথার্থতা ফুটে উঠেছে নারী উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন এখন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এই ইতিবাচক চিত্র আজ সর্বজনস্বীকৃত। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে শুরু করে মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন দপ্তরে নারীর অংশগ্রহণ আজ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক কর্মকা-, সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি, রাজনীতিতে নারী পুরুষের সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এদেশের উন্নয়ন অভূতপূর্ব। বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের ‘রোল মডেল’।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ নারী ও শিশু। তাদের উন্নয়ন তাই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত । নারীর ক্ষমতায়নের মূল হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। তাই বিনামূল্যে বই বিতরণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃত্তি-উপবৃত্তি প্রদান ও অবৈতনিক নারী শিক্ষার প্রবর্তন করে সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সুখি-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ই এ সরকারের কাক্সিক্ষত প্রত্যাশা।
কন্যা, জায়া, জননী হিসেবে নারী যেমন মমতাময়ী, তেমনই কর্তব্যপরায়ণ। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা বিধান এবং আর্থ সামাজিক কর্মকা-ের মূল ধারায় নারীর পূর্ণ ও সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ নারীর সামগ্রিক আর্থ সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকার কর্তৃক গৃহিত এসকল উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে সফলতা পেতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস। শুধু নারীর সচেতনতাই নারীকে রক্ষা করবে না, যদি না নির্যাতনকারী শক্তির মধ্যে মানবতার, নৈতিকতার উন্মেষ ঘটানো যায়, যদি না বিবেককে জাগ্রত করা যায়। তাই আসুন সম্মিলিতভাবে আমরা আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি।
পিআইডি ফিচার