আপনি কোলন ক্যানসারের কতটা ঝুঁকিতে রয়েছেন?

আপডেট: অক্টোবর ২৯, ২০১৯, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


কোলন (মলাশয়) বা বৃহদান্ত্রে টিউমার বেড়ে গেলে কোলন ক্যানসার হয়। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের এই রোগ বেশি হয়। কিন্তু বর্তমানে অল্প বয়স্কদেরও এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। এর সম্ভাব্য কারণ- শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা ও খাবার সম্পর্কে অসচেতনতা। পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলেই নিয়মিত কোলন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু এই রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে তার আগেই স্ক্রিনিং করা উচিত। লাইফস্টাইলে কিছু স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন এনে এই রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
কম বসুন : একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার সঙ্গে পিঠ ব্যথা, হৃদরোগ, স্থূলতা, ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস ও ডায়াবেটিসের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আপনি কি জানেন বিরতি ছাড়া দীর্ঘসময় বসে থাকলে কিছু ক্যানসার বিকাশেরও ঝুঁকি বেড়ে যায়? যেমন কোলন ক্যানসার। দীর্ঘসময় বিরতিহীন বসে থাকলে শরীরে প্রদাহের মাত্রা বেড়ে যায়। গবেষণায় পাওয়া গেছে, কোলন ক্যানসার ডেভেলপের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। আপনি ডেস্কে কাজ করলে অন্তত প্রতি ঘণ্টায় উঠে দাঁড়িয়ে কিছু সময় হাঁটুন।
কিছুক্ষণ সূর্যালোকে থাকুন : নিয়মিত সূর্যালোকে সময় কাটানোর অনেক উপকারিতা। এতে কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ হতে পারে। কিন্তু বেশিক্ষণ সূর্যের নিচে থাকাও ঠিক নয়। সুস্থ থাকতে আপনার শরীরে ভিটামিন-ডি প্রয়োজন। মানব ত্বক সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলে ভিটামিন-ডি তৈরি হয়। গবেষণায় পাওয়া গেছে, ভিটামিন-ডি এর ঘাটতিতে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আপনার প্রান্তীয় অঙ্গ ও মুখমণ্ডল সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসা প্রয়োজন। স্কিন ক্যানসার বিকাশের ভয় থাকলে সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করতে পারেন। স্কিন টোনের ওপর ভিত্তি করে ৩০ মিনিট পর্যন্ত রোদে থাকতে পারেন। ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট তৈলাক্ত মাছ খেয়েও উপকার পেতে পারেন।
অ্যাসপিরিনের ডাবল ডোজ: গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে, অ্যাসপিরিন ক্যানসার থেকে সুরক্ষা দিতে পারে, এমনকি এটি বিকশিত ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারে। যাদের পরিবারের কোনো সদস্যের অন্ত্রে ক্যানসার ধরা পড়েছে তাদের কোলন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা ১০ গুণ বেশি। তারা দিনে দুটি লো-ডোজের অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট খেলে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এটি যদিও বিতর্কিত থেরাপি। কারণ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে সেবন করলে পেপটিক আলসার অথবা পরিপাকতন্ত্রের ক্রনিক মাইনর ব্লিডিং থেকে রক্তশূন্যতা হতে পারে। কিন্তু ক্যানসার এড়াতে চাইলে এই ঝুঁকি না নিয়ে উপায় নেই।
বাদামী চালের ভাত খান : উচ্চ আঁশের খাবার ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে কিনা এটি পুরোনো বিতর্ক। কিন্তু শেষপর্যন্ত গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে উচ্চ আঁশের খাবার ক্যানসার থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। প্রচুর পরিমাণে গোটা শস্য বা অপ্রক্রিয়াজাত শস্য (বিশেষ করে বাদামী চাল ও ওটস) অন্ত্রকে ক্যানসার থেকে রক্ষা করতে পারে।
বাঁধাকপি খাবারে রাখুন : বাঁধাকপির মতো সবুজ শাকসবজি কাটলে, রান্না করলে, হজম হলে একটি কেমিক্যাল উৎপন্ন হয় যা ক্যানসার কোষকে দুর্বল করতে পারে। ফলে ক্যানসার কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রতিরোধ হতে পারে। ক্যানসার দমনকারী মূল কেমিক্যালটি সিনগ্রিন নামে পরিচিত, যা শরীরে ক্যানসাররোধী উপাদান অ্যালাইল আইসোথিওসায়ানেটে রূপান্তরিত হয়। আপনার ডায়েটে বেশি করে ব্রোকলি, বাঁধাকপি ও ফুলকপির মতো শাকসবজি রাখুন।
তৈলাক্ত মাছ খান : ভালো হজমের জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রয়োজন রয়েছে। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ তৈলাক্ত মাছের কয়েকটি সেরা উৎস হলো: সার্ডিন, ম্যাকারেল ও স্যালমন। কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত যেসব রোগী প্রতিদিন ন্যূনতম ০.৩ গ্রাম ওমেগা-৩ খেয়েছিল তাদের মৃত্যু ঝুঁকি ৪১ শতাংশ কমেছিল। বেশি পরিমাণে তৈলাক্ত মাছ খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি শতাংশে কমবে।
নিয়মিত ওজন দেখুন : স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রেখে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি দূর করতে পারেন। শুধু তাই নয়-এতে অন্যান্য ক্যানসারের ঝুঁকিও কমে যাবে। চল্লিশোর্ধ্ব প্রায় ৩ হাজার মানুষের ওপর চালানো গবেষণায় যাদের বডি মাস ইনডেক্স পঁচিশের ওপর ছিল (অতি ওজন বা স্থূল) তাদের কোলন পলিপের উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত এসব পলিপ নিজেরা ক্ষতিকর নয়, কিন্তু তারা শেষপর্যন্ত ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। ওজন কমান, স্বাস্থ্যকর ডায়েটের ওপর থাকুন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করুন- এতেই আন্ত্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে নিচে নামবে। ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করুন।
স্ক্রিনিং করুন : কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ করতে অথবা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে নিয়মিত চেকআপের গুরুত্ব রয়েছে। কোলোরেক্টাল ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ে আন্ত্রিক পলিপ (যা পরে ক্যানসার হতে পারে) ধরা পড়বে। এ ধরনের পলিপ শুরুতেই অপসারণ করে কোলন ক্যানসারের আশঙ্কা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে পারেন।
কোলন ক্যানসারের কয়েকটি দিক
* বৃহদান্ত্রের প্রাচীরে পলিপ (মাংসপিণ্ড) সৃষ্টির মাধ্যমে এটির শুরু হয়।
*চূড়ান্ত পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। যদিও দেখা দেয় তা গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল সমস্যা (যেমন- পায়খানা ক্লিয়ার না হওয়া বা অল্প পায়খানা হওয়া, বমি হওয়া, মিউকাস ডায়রিয়া ইত্যাদি)।
* কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি ও সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
* উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার, কম চর্বিযুক্ত খাদ্য কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ করে।
* নিয়মিত স্ক্রিনিং করলে এ রোগের প্রাথমিক পর্যায় ধরা পড়তে পারে।
* ৫০ বছর বয়স বা তদুর্ধ্বে এ রোগের বিস্তার হচ্ছে কিনা জানতে নিয়মিত স্ক্রিনিং করা উচিত।
কোলন ক্যানসার কি? : কোলনে (মলাশয়) বা বৃহদান্ত্রে কোষের অস্বাভাবিক বা অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি হলে কোলন ক্যানসার হয়। বেশিরভাগ কোলন ক্যানসার হয় ননক্যান্সারাস বা বিনাইন টিউমার (এডিনোমেটাস পলিপ) থেকে, যা ম্যালিগন্যান্ট (অতি ক্ষতিকর) টিউমারে রূপ নেয়। ম্যালিগন্যান্ট টিউমার থেকে ক্যানসারযুক্ত কোষ রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়াতে পারে। ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি হয় এবং শরীরের সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ বা ধ্বংস করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মেটাস্টেসেস। ফলাফল মারাত্মক হয়ে চিকিৎসার বাইরে চলে যায়।
উপসর্গ : এ রোগে প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ দেখা দেয় না বললেই চলে। তবে ক্যানসার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপসর্গেরও বিকাশ হতে পারে। * ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া, * মলত্যাগের সূচি পরিবর্তন হওয়া, * অনিয়ন্ত্রিত কিংবা অল্প পায়খানা হওয়া, * রেক্টালে রক্তপাত বা মলের সঙ্গে রক্ত বের হওয়া, * পেটে ব্যথা ও পেটে গ্যাসের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হওয়া, * ঘনঘন মলত্যাগ করা, * দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভূত হওয়া, * অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস, * লোহিত রক্তকণিকার অভাব (আয়রন ডেফিশিয়েন্সি এনিমিয়া) হওয়া।
কোলন ক্যানসারের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় : সাধারণত শারীরিক কোষ সুশৃঙ্খলভাবে বেড়ে ওঠে, বিভাজিত হয় এবং মারা যায়। কিন্তু ক্যানসার হলে কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পায় ও কোষের মৃত্যু ঘটে না। কোলন ক্যানসারের সঠিক কারণ এখনও অজ্ঞাত। তা স্বত্ত্বেও এই ক্যানসারের কিছু সম্ভাব্য কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ হয়।
১. পলিপ : সচরাচর কোলন ক্যানসারের উদ্ভব হয় বৃহদান্ত্রের প্রাচীরে থাকা প্রিক্যান্সারাস পলিপ থেকে। পলিপকে প্রধানত দুভাগে বিভক্ত করা হয়। যেমন- এডিনোমাস : এসব পলিপকে মলাশয়ের আস্তরণের উপাদানের মতোই লাগে। কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে পার্থক্য ধরা পড়ে। এসব পলিপ ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। হাইপারপ্লাস্টিক : এসব পলিপ থেকে ক্যানসার খুব কমই হয়ে থাকে। সাধারণত এসব পলিপ ক্ষতিকর হয় না। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এডিনোমাস ও হাইপারপ্লাস্টিক পলিপ নির্মূল করা না হয় তাহলে তারা ধীরে ধীরে বিপজ্জনক কোলন ক্যানসারে রূপ নেবে।
২. জিন : জেনেটিক সমস্যা বা ক্ষতি থাকলে অনিয়ন্ত্রিত বা অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি হতে পারে। পারিবারিক সদস্যের কাছ থেকে এ সমস্যা চলে আসে। কিছু মানুষ জেনেটিক মিউটেশন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা তাদের শরীরে ক্যানসারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক সমস্যা কিংবা জেনেটিক মিউটেশন নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও ক্যানসার উপযোগী পরিবেশের অভাবে ক্যানসার হতে পারে না।
৩. বৈশিষ্ট্য, অভ্যাস ও খাদ্য : কোলন ক্যানসারের জন্য বয়স একটি বিষয়। কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত ৯১% রোগীর রোগ ধরা পড়ে ৫০ বছর বয়সে কিংবা তদুর্ধ্বে। স্থূল মানুষের ও ধূমপান বা তামাক সেবনকারীর কোলন ক্যানসার হতে পারে। কোলন বা মলাশয় পরিপাকক্রিয়ার একটি অংশ। তাই খাদ্যের ওপর ভিত্তি করেও এ সমস্যা হতে পারে। কম আঁশযুক্ত খাদ্য, বেশি চর্বিযুক্ত ও ক্যালরিযুক্ত খাদ্য, লাল মাংস, প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং অ্যালকোহলের আধিক্যে কোলন ক্যানসার হতে পারে।
৪. শারীরিক সমস্যা ও চিকিৎসা : কিছু কিছু শারীরিক সমস্যা ও চিকিৎসার কারণে কোলন ক্যানসার হতে পারে। যেমন- * ডায়বেটিস, * হরমোন সমস্যার কারণে দেহের কোনো অংশের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা গ্রোথ হরমোন ডিসঅর্ডার, * অন্ত্রে বা মলাশয়ে প্রদাহ কিংবা ক্রোন’স ডিজিজ .* অন্যান্য ক্যানসারের জন্য রেডিয়েশন চিকিৎসা।
রোগ নির্ণয় : রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা নেন ও রোগীর ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক মেডিক্যাল বা রোগের ইতিহাস জেনে নেন। সাধারণত কোলনস্কোপি বা বেরিয়াম এনিমা এক্স-রে করলে কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে।
চিকিৎসা : ক্যানসারের ধরন ও পর্যায়ের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করা হয়। এ সময় রোগীর বয়স, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও শরীরের অন্যান্য দিকও বিবেচনায় রাখা হয়। যেকোনো ক্যানসারের জন্য একক কোনো চিকিৎসা নেই। সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে কোলন ক্যানসারের চিকিৎসা করা হয়।