আফগানিস্তান : আফগানদের না কার ?

আপডেট: অক্টোবর ১৯, ২০২১, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

অধ্যক্ষ মজিবুর রহমান:


কাবুলিওয়ালার ছোট্ট খুকি ‘মিনি’-র কথা আমাদের মনে আছে সবারই। সেই ছোট্ট মেয়েটি, পড়ে থাকে সুদূর কাবুলে। ‘মিনি’-র কথা মনে হলে কাবুলিওয়ালার মনটা ছটফট করে কেঁদে ওঠে। বিদেশ বৈভবে বসে মিনির জন্য তার কতই না মমতা। সেই ছোট্ট খুকি কি খাচ্ছে, কি খাচ্ছেনা, ঘুমোচ্ছে না কি ঘুমোচ্ছেনা, নাকি কাঁদছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আফগানিস্তানে আজকের ‘মিনি’রা কি করছে? কাবুলিওয়ালা না থাকলেও তাদের প্রজন্ম তো রয়েছে। আফগানিস্তানে মিনিরা আজকে মিছিল করে বলছে, আমরা বোরকা পরতে রাজি আছি কিন্তু আমাদের চাকরি করতে দিন, আমাদের মেয়েদের স্কুলে যেতে দিতে হবে। অন্ততঃ ২৫০ জন নারী বিচারক প্রাণ ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন নারী বিচারক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। নারী আইনজীবী, নারী পুলিশরাও প্রাণ ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের একটাই উদ্দেশ্য তালেবানদের হাত থেকে রক্ষা পেতে দেশত্যাগ করতে হবে। তালেবানদের পূর্ব এবং বর্তমান সময়ে সরকার কিংবা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নারীর কোনো অংশিদারিত্ব নেই। ২১ বছরের এনজিও কর্মী ফারকুন্দা জাহিদবাগ জানান, তালেবান যোদ্ধারা তার অফিসে এসে নারীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। অথচ একদিন আফগানিস্তান শান্তির স্বর্গরাজ্য ছিল। সকল জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট ছিল। যেখানে মৌলানা জালাল উদ্দিন রুমী বালখী, হাকিম সানাই, হাকিম জামি, শেখ মোহাম্মদ রোহানির মত বহু সুফি-সাধকদের জন্ম হয়েছিল। সেই আফগানিস্তানের আজ হালফিল অবস্থা কী ? খান আব্দুল গাফফার খান বলেন, ‘নিজেদেরকে আফগান ভাবতে না পারলে আফগানিস্তান টিকবে না।’ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ‘রিসেপ তাইপে এরদোগান’ বলেন, তালেবানদের গঠিত সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মতে, আফগানিস্তানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠিত না হলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা রয়েছে।
১০০ বছরের মধ্যে আফগানিস্তানের জাতীয় পতাকা প্রায় ১৮ বার পরিবর্তিত হয়েছে। তা কোনো দেশের জন্যই শুভ নয়। অথচ ১৯০১-১৯১৯ সালের মধ্যে বাদশা হাবিবুল্লা খানের আমলে মসজিদের ছবি সংবলিত পতাকা ছিল। ১৯২১ সালে বাদশা আমানুল্লাহ পতাকা থেকে মসজিদের ছবি বাদ দেন। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট ‘নূর মোহাম্মদ তারিক লাল রঙের পতাকা পরিবর্তন করেন। ১৯৯২ সালে মুজাহিদিনরা সাদা-কালো-সবুজ রঙের পতাকা করেন। ১৯৯৬ সালে তালেবানরা কলেমা শাহাদত সংবলিত পতাকা বের করেন। ২০০১ সালে আমেরিকান সৈন্যরা আফগানিস্তান দখল করলে রব্বানি ক্ষমতায় এসে পতাকা পরিবর্তন করেন। ২০০৪ ও ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এবং ২০১৪ সালে আশরাফ গনি পতাকা পরিবর্তন করেন। ২০২১ সালে এসে তালেবানরা আবার তাদের পতাকা উড়ান। এভাবে বার বার পতাকা পরিবর্তিত হতে দেখা যায় আফগানিস্তানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের উপর বসে থেকেও আফগানিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বর্গকিলোমিটারের ভূখ- আফগানিস্তান খনিজ সম্পদে পৃথিবী বিখ্যাত। এখানে সোনা, দস্তা, পারদ, রূপা, তামা, লোহা, প্লাটিনাম, ইউরেনিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, ক্রোমাইট, লিথিয়াম সহ আরও অনেক খনিজ সম্পদ রয়েছে সেখানে। তাছাড়াও বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাসতো রয়েছেই। বিশেষ করে আনজির, হাসার, নুরাবা ও পাঞ্জ নদী এবং গজনিতে প্রচুর পরিমাণ সোনা রয়েছে। পাঞ্জ নদীর উপত্যকায় ‘সমতি’ খনিতে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ মেট্রিকটন সোনা রয়েছে।
নিজেরা এতো সম্পদশালী হয়েও আফগানিস্তানিরা আফগান হতে পারেনি। গবেষকগণের মতে আফগান না হতে পারার কারণ হিসেবে আফগান দুর্নীতিবাজ, পাকিস্তানি দুর্নীতিবাজ, রাশিয়া, চীন, আমেরিকার নাম চলে আসে। বিশেষজ্ঞগণের মতে, আফগানিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, টানা ১৬ থেকে ২০ বছর যদি স্থিতিশীল পরিবেশ থকে, যদি আধুনিক বিজ্ঞান মনস্করা দায়িত্ব পান, যদি পর্যাপ্ত বিদেশি বিনিয়োগ মেলে, যদি তারা আফগান হতে পারে তবে, আফগানিস্তানের উজ্জ্বল রা যায়।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, বখতিয়ারপুর ডিগ্রি কলেজ দুর্গাপুর