আব্দুল জলিল ছিলেন মাটি ও মানুষের প্রিয় নেতা

আপডেট: মার্চ ৬, ২০১৭, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

মো. গোলাম সামদানী



১৯৩৯ সালে মো. আব্দুল জলিল নওগাঁ শহরের চকপ্রাণ মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন নওগাঁ শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। জলিল ছিল তাঁর পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। ১৯৫৭ সালে নওগাঁ কে.ডি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬০ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. অনার্স (রাষ্ট্র বিজ্ঞান) ও ১৯৬৪ সালে এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে ব্যারিষ্টারী (বার এট ল) পড়ার জন্য তিনি বিলেত যান।
১৯৬৯ সাল। তখন দেশে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চলছ্ েএ সময় বঙ্গবন্ধু বিলেত যান এবং অধ্যয়নরত প্রাক্তন ছাত্র নেতাদের নিয়ে এক বৈঠক করেন। জলিলের পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৬৯ সালেই দেশে ফিরে আসেন এবং ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলনে। সেই সাথে শেষ হয় তার ব্যারিষ্টারী পড়ার সকল আয়োজন।  ১৯৭০ সাল। ঐতিহাসিক নির্বাচনে নওগাঁ মহকুমার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় আব্দুল জলিলের উপর।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাক সামরিক জান্তা ক্ষমতা      হস্তান্তর না করে বিভিন্ন তালবাহানা ও কালক্ষেপন শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ যা স্বাধীনতার ভাষনে সারাদেশবাসী আন্দোলিত ও উজ্জিবিত হয়ে উঠে, যা স্বাধীনতার দলিল হিসাবে পরিচিত। ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সমগ্র বাঙালি জাতি প্রতিবাদে প্রতিরোধের দূর্গ গড়ে তোলে। পাক সামরিক জান্তা পূর্ব পরিকল্পিত নীলনকশার প্রতিফলন ঘটায়। গ্রেফতার করেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা সর্ব্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে।
ফুঁসে উঠে সমগ্র বাঙালি জাতি। শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। আব্দুল জলিল নওগাঁ মহকুমার আপামর জনসাধারণ, কর্মরত ই.পি.আর. পুলিশ আনছার বাহিনীকে সংগঠিত করে জীবন বাজী রেখে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ১৯৭১ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এতদ্ব অঞ্চলের প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে আব্দুল জলিল নওগাঁ থেকে যাওয়ার সময় ৭৪ জন ছেলে ও তার দলবল নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান এবং বালুরঘাটে আত্রাই নদীর পূর্বতীরে শ্মশানকালী মন্দিরের পার্শ্বে একটি গৃহে অবস্থান গ্রহণ করেন। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ভর্ত্তি ও বাঙালিপুর, মধুপুর, কামাড়পাড়া, প্যারিলাসহ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশ কয়েকটি ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনা করেন। ঐসব ক্যাম্প থেকে হায়ার ট্রেনিং এর জন্য শিলিগুড়ির পানিঘাটায় পাঠিয়ে দেওয়ার বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন আব্দুল জলিল।
নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ সব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে জীবন বাজি রেখে দেশ মাতৃকার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আব্দুল জলিল শুধু মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠকই ছিলেন না- ‘বঙ্গবাণী’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার মালিকও ছিলেন। আব্দুল জলিলের সাহায্য সহযোগিতায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় বালুরঘাট নিউমার্কেট এলাকায় সুনীতি প্রিন্টিং ওয়ার্কস থেকে উক্ত ‘বঙ্গবানী’ পত্রিকাটি প্রকাশিত ও প্রচারিত হতো। উক্ত পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক খন্দকার মকবুল হোসেন ও সহ সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন খন্দকার আবু বককর সিদ্দিকী। উক্ত ‘বঙ্গবানী’ মোট ২৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিল এমন কেউ কেউ বর্তমানে বড় মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, দু’লক্ষ মা’বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এদেশের বিজয় অর্জিত হয়। আব্দুল জলিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে একজন মহান সংগঠক ছিলেন। ১৯৭২ সালে আত্রাই রাণীনগর নকশালী রাজনীতির ব্যাপক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। শ্রেণি শত্রু খতমের নামে নকশালরা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। আব্দুল জলিল নিজের জীবন বিপন্ন করে বড় ঝুঁকি নিয়ে নকশালদের ব্যুহ ভেঙে চুরমার করে রক্তাক্ত প্রান্তরে সোনালী সূর্য্যরে আলো প্রদান করেন। দমন করেন নকশালী তৎপরতা।
১৯৭৩ সালে তিনি সর্ব্ব প্রথম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নওগাঁ সদর আসনে এম.পি. নির্বাচিত হন। দেশ পুনর্গঠনের কাজে পুরো মাত্রায় আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু বিধি বাম স্বাধীনতার বিপক্ষের শত্রুরা মাথাচারা দিয়ে উঠে।
মানবতা বিরোধীরা, যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদর আলশামস্ বাহিনী ও দেশি-বিদেশি শত্রুরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অতর্কিত হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ তার গোটা পরিবারকে হত্যা করে। জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে জারি করা হয় সামরিক শাসন। গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয় গলা টিপে। অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আব্দুল জলিলকেও গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ ৪ বছর কারাভোগের পর ১৯৭৯ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন।
১৯৮২ সালে পুনরায় সামরিক শাসন জারি করার পর গ্রেফতার করা হয় আব্দুল জলিলকে। ১৫ দিন অজ্ঞাত স্থানে বন্দী রেখে অবর্ণনীয় দৈহিক নির্যাতন চালানো হয় তার উপর । জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর মা’র মৃত্যু হলেও সামরিক জান্তা মাতৃ মুখখানা এক নজর দেখার জন্য কোন সুযোগ দেয় নাই।
১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি পর পর দু’বার নওগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের এম.পি নির্বাচিত হন এবং সংসদে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেন।
আব্দুল জলিল আধুনিক নওগাঁর রূপকার। তার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের ফিরিস্তী এক কথায় প্রকাশ করা যাবে না। নওগাঁ জেলার সকল উপজেলাতেই তার হাতের স্পর্শে অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। নওগাঁ শহরকে তিলোত্তমা শহরে পরিণত করা তার লালিত স্বপ্ন। জাতীয় পর্যায়ে তিনি অনেক গুরু দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা অবস্থ্য়া আব্দুল জলিল অনেক সফলতার পরিচয় দেন। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন কালে সারাদেশের নেতাকর্মীদের উপর তার সুদৃষ্টি ছিল প্রখর। কোথাও কেহ লাঞ্ছিত, নীপিড়ীত হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রতিবাদের তীর ছুঁড়ে মারতেন ও অত্যন্ত বিচক্ষণতার মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। আব্দুল জলিল একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন রাজনীতিবিদ।
আব্দুল জলিল স্বৈরাচারদের বহু প্রলোভন জুলুম, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। কখনও নীতিভ্রষ্ট হননি, আদর্শচ্যুত হন নি কিংবা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। নওগাঁবাসীর কল্যাণ ও উন্নয়নে তিনি সদাই সর্বদা স্বচেষ্ট।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ও যোদ্ধাদের খরচ মোকাবিলায় মোঃ আব্দুল জলিল মহান স্বাধীনতার ৯ মাস যুদ্ধে ভারতের প্রত্যেকটি রিসিপশন ক্যাম্পের জন্য নওগাঁ ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ব্যাংক থেকে ৭১,৮০,০০০/- টাকা তিনি ঐ ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ও কোষাধ্যক্ষকে ডেকে নিয়ে এসে ব্যাংকের ভোল্ট রেজিষ্টারে এন্ট্রি করে উক্ত টাকা গ্রহণ করেন। সেই অর্থ দিয়ে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পগুলো পরিচালিত করেন। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধুর নতুন সরকারের নিকট খরচ অন্তে ৩৪,৫২,০০০/- টাকা ফেরত দেন। তিনি কোন টাকা পয়সা আত্মসাৎ করেন নাই।
অঙ্গীকার ছিল নওগাঁয় একটি কৃষি কলেজ স্থাপন গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও বেকার সমস্যা সমাধানে ব্যাপক পরিকল্পিত কর্মসূচি তার হৃদয়ে গ্রথিত আছে। বয়সের ভারে কিছুটা দুর্বল হলেও তিনি অত্যন্ত সচল ও কর্মঠ ছিলেন। নওগাঁবাসীর উন্নতি ও মঙ্গল কামনা তার ধ্যান জ্ঞান ছিল ।
মহান এ মানুষটিকে আমরা হারায় ২০১৩ সালের ৬ মার্চ আজকের দিনে। ব্যাংককের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নি:স্বাস ত্যাগ করেন । মহান এ নেতার মৃত্যুতে পুরো দেশে সেদিন শোকের ছায়া নেমে আসে । সারাজীবন যিনি মেহনতি মানুষের কথা ভেবেছেন সেই মহান নেতার মৃত্যুকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না তার কোটি ভক্ত । আর তাই সে দিন নওগাঁ সহ পুরো দেশ যেন শোকাচ্ছন্ন ছিল । মহান এ নেতার লাশ ব্যাংকক থেকে যখন ঢাকায় আনা হয় সেখানে হাজারো নেতাকর্মী তার শেষ দর্শন শেষে  নেতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করে । এরপর মহান এ নেতার লাশ হেলিকপ্টার যোগে নওগাঁ জেলা স্টেডিয়ামে আনা হয়। এখানে আমি গোলাম সামদানী সহ জেলা মুক্তিযাদ্ধা সংসদের কমান্ডার হারুন-অল রশীদ বর্তমান ডেপুটি কমান্ডার আফজাল হোসেন, সহকারী জেলা ইউনিট আবুল কালাম আযাদ, উপস্থিত হয়ে নেতার লাশ হেলিকপ্টার থেকে নামানোর মুখ্য ভূমিকার পালন করে। এরপর মহান নেতার লাশ নওগাঁ শহরের তার চকদেবপাড়া বাসায় নেওয়া হয় । এ সময় মুক্তিযুদ্ধের অ্যতম সংগঠক আব্দুল জলিল কে চির বিদায় জানাতে গিয়ে অশ্রসজল হয় নি এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে না । দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা বর্তমান নওগাঁ সদও আসনের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মাালেক নওগাঁ-১ আসনের বর্তমান সাংসদ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার সহ অনেককেই দেখেছি প্রিয় নেতার হারানোর অশ্রসজল চোঁখ। সেদিন মহান এ নেতার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমান করেছিল আব্দুল জলিল নওগাঁর মানুষের হৃদয়ে কতটা জায়গা নিয়ে ছিলেন। সেদিন আমার ও আমার সংসদেও পক্ষ থেকে প্রিয়নেতা কে শেষ গার্ড অফ অনার দেওয়ার সুভাগ্য হয়েছিল। দেখতে দেখতে প্রিয় নেতার ৪ বছর পার হলো প্রয়ান দিবস। এবার দলীয় ভাবে মহান এ নেতার ৪র্থ মৃত্য বার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণ সভা হচ্ছে। যেখানে থাকবেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। নওগাঁ নওযোয়ান মাছে অনুষ্ঠিত এ স্মরণ সভায় মহান নেতার প্রতি ভালবাসা হাজারো অনুরাগীসহ দলীয় নেতা কর্মীরা উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধার আর ভালবাসায় স্মরণ করবেন মহান মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সংগঠককে ।
আব্দুল জলিল নওগাঁর অভিভাবক, ছিলেন। কিন্ত তিনি নেই আছে তার মহান আদর্শ। তার স্বপ্নের নওগাঁর আছে এবং থাকবে। মহান এ নেতার যে সব স্বপ্ন অপূরণ ছিল। আগামীতে তা পুরণের মাধমে আমরা যুগ যুগ স্মরণ করতে চাই । স্যালুট এ হে মহান নেতা তোমাকে, তোমার আদর্শ কে । (লেখক : কমান্ডার, নওগাঁ সদর উপজেলা কমান্ড, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ)।