আব্দুস সোবহানের মেয়াদ শেষ, কে হচ্ছেন রাবির নতুন উপাচার্য?

আপডেট: মে ৫, ২০২১, ১০:৩৬ অপরাহ্ণ

ওয়াসিফ রিয়াদ, রাবি:


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের দায়িত্ব শেষ হচ্ছে আজ (৬ মে)। ২০১৭ সালের ৭ মে উপাচার্য পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুর্নীতির নানা অভিযোগে তাকে বারবার বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে। শুধু তাই নয় আগের মেয়াদে ২০০৯ সালে প্রথমবার উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পরও নজির রেখেছিলেন নানা দুর্নীতির। বিদায়ক্ষণে বিতর্কের মুখেই বিদায় নিচ্ছেন উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান।
শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার পরিবর্তন করে নিজ মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ-
রাষ্ট্রপতিকে অসত্য তথ্য দিয়ে অবসরগ্রহণ, বিভিন্ন নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিসহ বিস্তর অভিযোগ নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। মেয়াদের শেষ সময়ে এসেও বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি। সর্বশেষ রোববার (২ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স কমিটিতে অনিয়মের চেষ্টার অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উপাচার্যের বাসভবন, প্রশাসনিক ভবন ও সিনেট ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। তাদের বাঁধার মুখে ফিন্যান্স কমিটির সভা স্থগিত হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই উপাচার্যের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তিনি সবচেয়ে বিতর্কিত হন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে। ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ৩০০ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিতে জমা দেন শিক্ষকদের একাংশ। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্তে নামে ইউজিসি। তদন্ত শেষে ২৫টি অভিযোগের প্রমাণ পায় ইউজিসি। পরে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ মোট ৭৩৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ইউজিসির তদন্ত কমিটি। যেখানে ৩৬ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন এবং ৭০০ পৃষ্ঠার সংযোজনী প্রতিবেদন।
মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতে নিয়োগের আবেদন যোগ্যতা শিথিল-
ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতে উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান ৪৭৫তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগ-নীতিমালা পরিবর্তন করেন। এতে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা কমানো হয়। আগের নীতিমালায় আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিলো সনাতন পদ্ধতিতে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত চারটি স্তরেই প্রথম শ্রেণি। আর গ্রেড পদ্ধতিতে এসএসসি ও এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫০, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০। একইসঙ্গে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মেধাক্রম প্রথম থেকে সপ্তমের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু সেই যোগ্যতা কমিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.২৫ এ নামিয়ে আনা হয় এবং মেধাক্রমে থাকার শর্তও তুলে দেওয়া হয়।
নিয়োগের যোগ্যতা শিথিলের পর উপাচার্যের কণ্যা সানজানা সোবহান ও জামাতা এটিএম শাহেদ পারভেজ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এর মধ্যে মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করা সানজানা নিয়োগ পান ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। আর শাহেদ নিয়োগ পান ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)। মেয়ের মেধাক্রম ছিল ২১ এবং জামাতার ৬৭তম। আগের নীতিমালায় তারা নিয়োগের আবেদনই করতে পারতেন না।
রাষ্ট্রপতিকে অসত্য তথ্য প্রদান ও অবসর গ্রহণ-
অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান ২০১৭ সালে ৭ মে দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর একই বছরের ২১ জুন রাষ্ট্রপতিকে না জানিয়ে উপাচার্যের পদে থেকে ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। আবার ওই দিনই তিনি বিভাগ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। ফলে উপাচার্যের পদে সাময়িক শূন্যতা সৃষ্টি হয়।

ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আখতার ফারুককে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালনের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে ২৪ জুন রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের অনুমতির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি ২৯ জুন অবসরে যাওয়ার অনুমতি আবেদন করেন। উপাচার্য পদে সাময়িক শূন্যতা পূরণে ‘রাষ্ট্রপতির অনুমতি ছাড়াই’ এক দিনের জন্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আখতার ফারুককে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য নিয়োগ দেন। যা ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের পরিপন্থী।
উপাচার্যের বাড়ি ভাড়া নিয়ে দুর্নীতি-
উপাচার্য আবদুস সোবহান ২০১৭ সালের মে মাসে দায়িত্ব নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনে ওঠেন। এ জন্য ২০১৩ সাল থেকে অধ্যাপক হিসেবে তার নামে বরাদ্দ করা ডুপ্লেক্স বাড়িটি কাগজপত্রে ছেড়ে দিয়েছেন বলে দেখানো হলেও আসবাব রাখার জন্য প্রায় দেড় বছর দখলে রাখেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ি ভাড়ার আয় থেকে বঞ্চিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে কে হচ্ছেন রাবির নতুন উপাচার্য? এই নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা ও সমালোচনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাবিতে উপাচার্য হওয়ার দৌড়ে আছেন বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা, সাবেক উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান। রাবির প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের বর্তমান আহ্বায়ক ও প্রাণ রসায়ন ও অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুর রহমান ভিসি হওয়ার দৌড়ে আছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। রাবির ভিসি হিসাবে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম আলোচিত আরেক নাম। ভিসি হিসেবে আলোচিত অন্যদের মধ্যে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জিনাত আরার নামও রয়েছে। তার পারিবারিক ঐতিহ্যও আওয়ামী লীগের রাজনীতির ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। তার বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন। অধ্যাপক জিনাত আরা রাবিতে উপাচার্য হলে-এটা হবে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রথম নারী উপাচার্য। রাবির আগামী উপাচার্য পদের জন্য বাংলার অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদীর নামও আলোচিত।