আমরা কবে জয়ী হবো

আপডেট: জুন ২২, ২০২৪, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


‘আমরা করবো জয় একদিন’ আমেরিকায় ইংরেজি ভাষায় লেখা গানটির অনুবাদ আমরা শুনে আসছি দীর্ঘদিন থেকে। প্রথম শুনেছিলাম একটি কলেজে শিক্ষকদের পিকনিক অনুষ্ঠানে একজন প্রিন্সিপালের কণ্ঠে। শুনে আপ্লুত হয়েছিলাম।
ভাবতাম, ‘আমরা কারা’ একদিন জয় করবো। যাদের উদ্দেশ্যে গানটি পরিবেশিত তারা কি গানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় সুযোগ পাবে!

নিষ্ঠ-অনিষ্ঠের সম্ভাবনার দেশ আমেরিকার গীতিকার পিট সিগার (মৃত্যু ১৯১৪) গানটি রচনা সুরারোপ ও কণ্ঠ দান করেন। এটি বাংলার প্রখ্যাত গণ গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস অনুবাদ করে ও কণ্ঠ দিয়ে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেন। সারা বিশ্বের দুঃখী মানুষ এখন যার উত্তরাধিকার।
গানটির মর্ম উপলব্ধি করলে বোঝা যাবে আসলে দুর্দশা পীড়িত মানুষকে সামনে রেখে এগোনোর আয়োজন। এরা কারা?

এ গানের মর্ম উপলব্ধিতে সহায়ক হতে পারে ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যের অসাধারণ গানটি: সংকোচের বিহবলতা (গীতবিতান, স্বদেশ, ১১ সংখ্যক গান)
“মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তিধর, নিজেরে করে জয়।”

এ গানে পারিপার্শ্বিকের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জীবনপথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা আমাদের মানসিক দ্যোতনা দান করে। এতে আমাদের অগ্রগতি কতখানি হয়েছে আমরা বুঝি। গানটি উড়িষ্যার পাণ্ডুয়া নামের একটি ‘নিভৃত পল্লীতে’ রচিত। এগানের রস আমরা অনুভব করি আজও।

পিটি সিগারের গানের রচনার প্রেক্ষিতে সমগ্র জীবন। যে জীবন দহনে মুহ্যমান। আমরা অধিকাংশই এ যন্ত্রণা বুঝি: তবে সমাধান করবে কে? স্থানীয় সুধিজনের চেয়ে অভিভাষীর সংখ্যা আমেরিকায় বেশি, সেখানে কে, কাকে কিভাবে জয় করবে তার পথ কতটুকু! তবুও জয়ের উন্মাদনা এ গানে কম নেই। গণ-সংগীতের আসরে এর মূল্যও কম নয়। এখানে দারিদ্র জয়ের আকাক্সক্ষাতেই শ্রোতার পরিতৃপ্তি। শক্তি প্রয়োগ করে জয়ের পরিণতি শুভান্তিক যে হয় না, মাত্র শতবর্ষের মানব সভ্যতার উত্থান পতনের ইতিহাস আমাদের তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

একটা বাস্তব উদাহরণ আমরা রাখতে পারি। আমরা স্বশাসন চেয়েছি। বহুত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করেছি, কিন্তু স্থায়ী থাকতে দেয়া হয়নি। আমাদের জয় ধূলিসাৎ হয়ে যাবার পথে, আমরা বুঝিনি। আজও বুঝি না। নতুন করে ধুলিধূসর হবার উন্মাদনা। দিনের পর দিন আমাদের হাসি আনন্দ কেড়ে নেয়া হচ্ছে। এখান থেকে মুক্ত হবার আকাক্সক্ষা তৈরি করতে হলে ব্যক্তির উন্নয়নের উন্মাদনা সংযত করতে হবে। এ পথ বহু বঙ্কিম। নিজে করে অন্যকে শেখানো বড় কঠিন। এই ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’ বলে এগিয়ে আসা ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুরূহ। আমাদের পেছন ফিরে দেখতে হবে কারা ‘আমরা করবো জয়’ বলে আমাদের ধোকা দিয়েছে।

যাদের জীবন ও কর্মপদ্ধতি সমান্তরালে চলে না, তারা কিভাবে আমাদের জয়ের সুখ অনুভবে সহায়ক হবে। না দোষ আমরা গানের আন্তরিক স্রষ্টা পিট সিগার কিংবা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ওপর চাপাতে চাই না। এসব কথা বলে যারা খেলনা দিয়ে দারিদ্রের সাময়িক ঠাণ্ডা করে নিজেরা ফুলে ফেঁপে ছাড়িয়ে আবার সেপথে অগ্রসরমান তাদের বোঝাতে চাই। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষাÑঐ এল.এ. বে. লে. পাস্, জয়ী জীবনের জন্য শিক্ষা আমরা তা পরিবেশন করি না। যেটুকু করি তাতে জীবনকে সুন্দর করার শিক্ষা নেই আছে ব্যক্তির সমৃদ্ধি। ধান ভানতে শিবের গীত বাদ দিয়ে বলি কবে আমরা নিশ্চিত হবো চোখে ঠুলি দিয়ে মাথায় পা রেখে যারা হাওয়ায় ফেরি করে তাদের ধোকাবাজি থেকে মুক্ত হবো।

আলাউদ্দীনের প্রদীপ হাতে কেউ আসে না। সবই দুষ্ট কল্পনা। আমরা শুনে সান্ত¦না পাই; কিন্তু জগতে কোথাও এমনটি ঘটার নজির কেও দেখাতে পারবে না। ‘বড় কথা বড় ভাব’ নিয়ে সবাই আসে; কিন্তু স্বভাব ভুলে না। আমাদের দেখতে হবে রাজনীতিকে কারা জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করে আমাদের রুটি রুজিকে কঠিন করে তুলছে। আবেগ নয়, মুক্তবুদ্ধি প্রয়োগ করে সত্য ধারণের মাধ্যমে কদিনের জীবনকে চিরজীবনের সুঘ্রাণে ভুরে তুলতে পারবো। না এটাও একধরনের আত্মপ্রকাশ। আমাদের বুঝতে হবে সুখ-দুখ-বঞ্চনা-প্রতারণা সবই জীবনের সঙ্গী। একে এড়িয়ে চলার শক্তিই হলো ‘আমরা করবো জয়’ এর শিক্ষা।

এ শিক্ষা কি স্থায়ী হয়! না নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করার কায়দা-কসরত দেখাতেই সময় চলে যায়। আমরা চিহ্নিতদের চিনি। তাদের ধোকাবাজি থেকে মুক্ত হতে পারলেই আমরা সবাই মুক্ত হবো। রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘এই ধরণির মাটির বাঁধন’ যতদিন দৃঢ় থাকবে। না হলে জিন্দাবাদ সিন্দাবাদের সিন্দুকে আবদ্ধ থেকে যাবে। আমরা জয়ী হতে পারবো না।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ