আমরা কবে মুক্ত হবো

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০২২, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


জগৎ জোড়া শাসন পদ্ধতির পরিবর্তন, পরিমার্জন ইত্যাদি নিয়ে তোড়জোড় কম হয়না। বাইরের দৃষ্টিতে এটা শুভলক্ষণ। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাপ্রার্থী সবাই নিজ নিজ সমর্থে প্রচেষ্টারত, কেউ মানবকল্যাণ আবার কেউ আত্মতুষ্টি নিয়ে। অথচ এর শুভান্তিক কল্যাণ কোথায় তা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারছে কতজন। এর কারণ- যে ভাবেই চিহ্নিত করা হোক না কেন, ব্যক্তির কামনা-বাসনা কখনো সমষ্টির কামনায় মিলিত হয়, আবার হারিয়ে যায় বাস্তবতার অভিঘাতে। শাসন ব্যবস্থার এই পরিণতি মানুষকে বহুধা বিভক্ত করে। এখান থেকে মুক্ত হতে না পারাটাই মানবভাগ্যের ট্রাজেডি।

আমরা একটা উদ্দেশ্যে সামনে রেখে সংগ্রামে অবতীর্ণ হই, এতে জনকল্যাণের মানসিকতা বাইরে যতটুকু প্রদর্শিত হয়, ভেতরে ব্যক্তির উন্নতি যশ-খ্যাতির লিপ্সা থাকে বেশি। তাই স্থায়ী শান্তি হয়না। আমাদের আচরণ ন¤্র থাকে বাইরে; কিন্তু ভেতরে থাকে কঠিন। এই কঠিনকে সবার গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তোলার সাধনা চলে নিরন্তর। সাধনায় সিদ্ধি লাভ হলে আবার স্বরূপে ফিরে আসে। এ কারণে স্থায়ী শান্তির দেখা পাওয়া যেন সোনার হরিণ।

অনেকে ধর্ম, কেউ কেউ মতবাদ দিয়ে স্থায়ী শান্তির পথ খোঁজেন। মনে রাখা ভালো, ধর্ম বা মতবাদে দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায়, যে সব নীতি নির্ধারণ বর্তমান, তা কোনটি অভ্রান্ত আমরা সবটা পরখ করিনি। কেবল ক্ষমতা ব্যক্তিস্বার্থ মনে রেখে দ্বিচারণ করে এসেছি। ফলে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এর কারণ, নেতা যা করবেন, তা অভ্রান্ত! এমনটি হলে সাধারণ মানুষ মেনে নেবে কতদিন! কিছুদিন শক্ত শাসনে মুখ বন্ধ রাখবে। তারপর ভুক্তভোগী জেগে উঠবে। আমরা বিষয়টি যদি জাগ্রতভাবে ভাবতাম, তবে কোনো ফাঁক ফোকর দিয়ে ছিদ্রান্বেষণ হতো না।

একটা বিষয় লক্ষণীয় কোনো ব্যক্তি উচ্চাভিলাষ তাকে নানা কিসিমের অভিনয় দক্ষ করে তোলে। অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে সুবিধাভোগের অভিপ্রায় তাকে অভিনয় শেখায়। অভিনয় এবং স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা সবার দৃষ্টিগোচর হয়না। ধরা পড়লে আর নিস্তার থাকে না। ধরা পড়া না পড়ার কৌশল যার কাছে যত বেশি জ্ঞাত, তারাই কিছুটা স্থায়ী থাকতে পারে। আমরা এত সবের খোঁজ নিতে যাবনা। ছা পোষা মানুষ লবণ-পান্ত জোগাড়কেই বড়ো করে দেখি। মাঝে মাঝে পলান্নের লোভে আমরা দলিত হই। ভুল হয় তখনি। তবে কোথায় হবে আমাদের স্থান। এ নিয়ে ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

সততার বিষয় অনেকটা আপেক্ষিক। এই আপেক্ষিকতা কাটিয়ে উঠলে কী হোত কী হতোনা বলা কঠিন। তবে সততার একটা নিজস্ব মূল্য আছে। কেবল ব্যক্তির নয়, গোটা জাতির ইতিহাস খোঁজার দরকার কম। আমরা ব্যক্তিগতভাবে সৎ থাকতে চাই কিন্তু সন্ততি আর চেলা চামুন্ডারা যে সাগরচুরি করে সেদিকে নজর দেইনা। অযোগ্যের শিরোমনি তাকেই উচ্চাসনে বসাই। তখনই শুরু হয় বিপর্যয়। তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়। শাসন শোষণ ঠিকই চলে তবে অস্বাভাবিক।

ইতিহাসের বিষয় মানুষ এতসব ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নেয় না। নিলে হয়তো সংখ্যাহীন জীবন হানি ঘটত না। বলতে গেলে আমরা জীবনের বিনিময়ে জীবনকে উজ্জ্বল করার সাধনারত। জানিনা, এ খেলা কখন বন্ধ হবে। অনৈতিহাসিক অনেক কল্পনার বিষয় আছে, যাকে আমরা ধর্মের নামে চালিয়ে দেই। মানছিও অনেকে। তা কার্যকর করার ব্যবস্থা নেই না। নিলে আমাদের খোলস খুলে যাবে। সুতরাং শাসন শোষণের সূত্রগুলো এমনি ভাবেই বলে আসছে। আমরা ভাবিনা, আর ভাবলেও অতি কল্পনার জগতে বিরাজ করি। নিজে পালন না করে অন্যকে পালনের নির্দেশ ঠুঁকি। সব চেয়ে বিপর্যয় বা বিড়ম্বনা এখানেই।

বংশানুক্রমিক বা ভুজবলের ক্ষমতা আর প্রকাশ্যে নেই। এসেছে নির্বাচন। এই নির্বাচন আসলে আমরা পরিবর্তিত হই। আচার-আচরণ বিশেষ করে লোকধর্মে অধিক মনোনিবেশ করি। মানবধর্ম দূর থেকে হাসে। অথচ শাসনের শিরোমনি মানবধর্ম। মানবধর্ম এড়িয়ে চললে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। আমরা মানবধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারলে যাবতীয় আড়ম্বর ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। সুতরাং শাসন-শোষণে লোকধর্ম দেখানো কাজের চেয়ে মানবধর্মে আত্মনিয়োগ, ব্যক্তি অথবা সমাজের জন্য কল্যাণের একথা মানতেই হয়। আমরা কবে মানব হবো! একটা জাতির তুল্যমূল্য, তা অস্বীকার করার অর্থ নিজের অস্তিত্বের অবলুপ্তি কামনা।

জাতির জীবনে নির্মম কলঙ্কতিলকে এই তো সেদিন সংঘটিত হলো। আওয়ামী পরিবারের সন্তান হয়েও সরকারি চাকরি এবং শিক্ষকতার জন্য সরাসরি দলের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে পারিনি। এখন জীবন আর রাজনীতিতে বড়ো ফাঁক। কিছু বুঝি অনেকটা বুঝি না। তবুও নিজেকে স্বাধীনতা সম্পৃক্ত ভাবলে কৃতার্থ হই। আমার জীবনের তিন দশকের মধ্যে স্বাধীনতা আমাদের ধরা দেয়। মানবধর্মের জন্য ত্যাগী মহান ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু হত্যার দাগ দগদগে। কিছু মানুষ নামের দ্বিপদ যে পথের পথিক হয়ে শিরোনাম হয়ে উঠলেন। আমরা চিরকাল আড়ালেই রয়ে গেলাম। বুঝলাম না, আমাদের স্বাধীনতা ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। সেই ছিনতাই এবং প্রথম বলি বঙ্গবন্ধু। তার পর চার নেতা। এরা মিথ্যার কাছে হার মানেন নি। তাই অসত্যের কাছে সাময়িক হার মানেন।

প্রায় দু’দশক আমাদের মর্মবেদনা বহন করতে হয়েছে। বাংলার মানুষকে দেখতে হয়েছে কৃত্রিম আদর-যত্ন। আমরা ন্যায় বিচারের মুখোমুখি হতে পারিনি।

‘নদীর একুল ভাঙ্গে ঐ কুল গড়ে’ শীলার মত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। বিচার হলো। মূল অপরাধীরা অন্তরালেই রয়ে গেলেন। আমলা বাহিনী যেসব দুর্বৃত্ত সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা অক্ষত রয়ে গেলেন, তাদের সন্তান-সন্ততি এখন ঘরে-বাইরে মুখর।

স্বাধীনতাকামী মানুষের মন ১৫ই আগস্টের ভয়াবহতায় নেতিয়ে পড়ে। সেই দুঃসহ দূর্যোগের মাঝে চার নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতখানায় নির্মম হত্যা। বিচার চাওয়ার ভাষাও তখন পাথরচাপা।

আমরা ক্ষমতার ছায়ায় বসে বাতলিয়ে দেয়া ছকে দিবস উদযাপন করছি। অধিকাংশই ভাড়াটে, নুতনত্ব কই। না আছে ত্যাগ, না আছে শাসনের মানুষের শিক্ষা। দু’একটা কেতাবি গল্প কাহিনী পরিবেশন করে আসর শেষ! এ যেন নিত্যদিনের রুটিন করা কর্মধারা। এতে জাতি শেখে না। পোড় খেয়ে যখন শেখে, কিছুদিন পর আবার পুরাতন হয়ে যায়- ‘সামনে যা পাও লুট করে খাও’ পর্যায়ে। এটা কোনো দিবস উদযাপনের তাৎপর্য নয়। আমাদের সামনে যারা আসছে, তাদের শিক্ষণীয় বিষয় পরিবেশন করে হৃত গৌরব জীবন্ত করতে পারলে দিবসের তাৎপর্য উঠে আসবে। আমরা আংশিক মুক্ত হবো।
লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ