আমাদের হাসান স্যার

আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০২১, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার:


ছাত্রকাল থেকেই যার নামের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তিনি আমাদের হাসান আজিজুল হক স্যার। তখন পর্যন্ত জানতাম না তাঁর পেশা-চিন্তা সম্পর্কে। ততোদিনে আমি তাঁর কয়েকটি গল্প পড়েছি, পড়ে খুব যে ভালো বুঝেছি এ দাবি করবো না। তবে এটুকু বুঝতে বিলম্ব হয়নি যে তিনি একজন প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। এই প্রগতিশীল মানুষটিকে দ্যাখার জন্যে নানা সুযোগ খুঁজি। একদিন এক সাহিত্যাসরে তিনি বক্তৃতা করবেন শুনে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রথম দেখি। সম্ভবত সেটা ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটারিয়ায়। তখন ‘পূর্ণাশা’ পত্রিকার অন্যতম কর্মাধাক্ষ ও সম্পাদক অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র বিজন গোলদার। আমি ও বিজনদা ছিলাম জোহা হলের আবাসিক ছাত্র। সে সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি আমাকে ¯েœহ করতেন এবং তাঁর সংগৃহীত গ্রন্থ আমাকে পড়তে দিতেন। মূখ্যত তাঁর সহযোগিতায় আমি প্রথম ‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’, ‘পাতালে হাসপাতালে’ নামের গ্রন্থ দুটি পড়ার সুযোগ পাই। ওই ‘পূর্ণাশা’র সভাপতি ছিলেন হাসান স্যার। আমি ‘পূর্ণাশা’র কোনো একটি সংখ্যার প্রকাশনা উৎসবের অনুষ্ঠানে গিয়ে স্যারের প্রথম ও দীর্ঘ বক্তৃতা শুনি। সুন্দর বাচনভঙ্গি তাঁর শারীরভাষা আমাকে মুগ্ধ করে। বক্তৃতায় হাস্যরস এবং শোষিত সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে তাঁর শোষক-উৎপীড়কদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ আমাকে মুগ্ধ করে। তাঁর লেখা পড়ে ভাসা ভাসা যা বুঝেছিলাম বক্তৃতা শুনে তার বেশি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অনুধাবন করি। যেনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের বক্তৃতার মতো। আমাদের, কাজী মান্নান স্যার, আবদুল খালেক স্যার, জুলফিকার মতিন স্যার, আবু বকর সিদ্দিক স্যার এবং অন্যান্য শিক্ষক যেমন ক্লাসে বক্তৃতায় বোঝাতেন অনেকটা সে রকম। সেইদিন থেকে আমি তাঁর একজন ভক্ত হয়ে উঠি এবং তাঁর লেখা সংগ্রহের চেষ্টা করি। যখনই তাঁর বই বেরিয়েছে জানতে পারি, সেটা সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। এই ভাবে ক্রমান্বয়ে আমি স্যারের ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ পাই। তিনিও পরম স্নেহে আমাদের কাছে ডেকে নিয়েছেন। তাঁর বাসভবনে বিজনদার সঙ্গে যেতাম, পরে একা কিংবা কোনো বন্ধুকে নিয়ে হাজির হতাম। স্যার একটুও বিরক্ত হতেন না, বরং আমাদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন।

প্রফেসর হাসান আজিজুল হক ছিলেন দর্শন বিভাগের শিক্ষক। লেখালেখি ও সাহিত্য বিচার সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব একটি দর্শন ছিলো। তিনি কখনোই মর্ডানিজন বা পোস্ট মর্ডানিজমের বিতর্কে যেতেন না, রোমান্টিসিজম কিংবা দাদাইজমের বিচারে সাহিত্য কতোটা সাফল্যলাভ করেছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলে লেখকের গুণ বিচারে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বরং বলতেন, যারা লিখছেন, তারা নিরবধি লিখে যান, কাল বিচার করবে কে কোন্ ইজম বা তত্ত্বে সাহিত্য রচনা করেছেন। সবই কালের গর্ভে জমা থাকবে। কেউ রবীন্দ্র-নজরুল-হেমিংওয়ে প্রমুখের মতো কালজয়ী হবেন কিংবা চ-ীদাস-কালিদাসের মতো অমর হয়ে থাকবেন, সেটাও আগামী দিনের পাঠক নির্ধারণ করবে অথবা বিচার করবে। একজন সুস্থ চিন্তার লেখক কখনোই ধর্মান্ধ আর সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসীর পৃষ্ঠপোষক হতে পারেন না।

হাসান আজিজুল হক অত্যন্ত রাজনীতিক সচেতন লেখক। অবশ্য তিনি সেই লেখক যিনি শাসক শ্রেণির অনাচার-অত্যাচার সম্পর্কে লিখে ঘরে আত্মগোপনে থাকেন নি। রাজপথে শোষিতের পক্ষে নেমে এসেছেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন আমাদের মতো মাঠকর্মীদের অগ্রসৈনিক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আপোসহীন আন্দোলনে তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, পরামর্শও দান করেছেন। আবার অগ্রভাগেও থেকেছেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাাপতিরও দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র রাজশাহীর আহ্বায়কেরও দায়িত্ব সানন্দে গ্রহণ করেছেন। নাট্যকর্মী মলয় ভৌমিক, অধ্যাপক এসএম আবু বকর এবং আরো অনেকেই ছিলেন এই আন্দোলনের নেতা। প্রফেসর সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন, প্রফেসর শহীদুল ইসলাম, ভাষা সৈনিক গোলাম আরিফ টিপু, ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন, সাংবাদিক সাঈদ উদ্দিন, সাইদুর রহমান আরো অনেকে ছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও নির্মূল কমিটির অন্যতম নেতা। এই সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ওয়ার্কাস পার্টির আজকের সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা ও সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রমুখ। রাজশাহী শহরে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামে এই ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা কর্মীদের প্রাণীত করেছে, সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে। গড়ে উঠেছে একটি সুস্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ। আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা দিগন্তে হাসান আজিজুল হকের স্পর্শ লেগে আছে। লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি নিরলস ছিলেন। তাই তাঁর এই অতুল্য অবদানের জন্যে শহরে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্থাপনার নানকরণ করে তাঁকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখার উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিক ও সামাজিক দল ও সংগঠনগুলো ভাবতে পারেন।

এই মহানগরে রানী হেমন্তকুমারী, স্যর যদুনাথ সরকার, চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক, রজনীকান্ত সেন প্রমুখ নানা সূত্রে বাস করেছেন। যদিও তাঁদের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, হয়নি কোনো স্থাপনা, এখন আমরা কি এখন আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে পারি না? অনেক গুণীজনের সম্পত্তি আজকে দখল করা হয়েছে। তাঁদের নামগন্ধ কোথাও নেই। বরেন্দ্র জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা কুমার শরৎকুমারের নামও কোথাও নেই। তাঁর ছবিটা পর্যন্ত অবজ্ঞায় বাথরুমে ফেলে রাখা হয়। শরৎকুমারের সহকর্মী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র অমর কীর্তি পর্যন্ত অবহেলায় নষ্ট হয়। হাসান আজিজুল হক যে হবেন না, আমরা সে শঙ্কামুক্ত হতে পারি? পারি কি নিশ্চিন্ত হতে? ভয় হয়, তাই দই দেখলেও চুনের ভয়ে আতঙ্কিত হই।
অবিভক্ত বাংলার হাসান আজিজুল হক চাইতে। তাঁর ‘আগুন পাখি’ এবং অন্যান্য রচনায়ও তার ছাপ রয়েছে। তিনি জন্মসুত্রে ছিলেন বর্ধমানের যবগ্রামের সন্তান। ১৯৩৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম সেখানে। মা জোহরা খাতুন আর বাবা মোহাম্মদ দোয়া বখশ। সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টে বাংলা ভাগ হওয়ার প্রায় সাত বছর পর হাসান আজিজুল হক মাধ্যমিক পাস করে বাংলাদেশের খুলনার ফুলতলায় এসে বসবাস শুরু করেন এবং বিএল কলেজে ভর্তি হন। তখন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পুলিশী নির্যাতনের শিকার হন। রাজশাহী কলেজে অনার্স পড়তে আসেন। বলা যায় সেই সূত্রে রাজশাহীর সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র গড়ে ওঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে মাস্টার্স করে কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে খান সারোয়ার মোর্শেদ তাঁকে ১৯৭৩ সালে দর্শন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদান করেন। সেই থেকে ৩১ বছর তিনি শিক্ষকতা করেছেন এবং এই মহানগরীতে অযুত রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন। তার সমান্তরালে লেখালেখি করেছেন।

আজ তিনি নেই। আমাদের অভিভাবক নেই। পরামর্শ দেয়ার এবং আলোচনা সভায় বক্তব্য দেয়ার লোকও নেই। আর যাঁরা আছেন, তাঁদেরও অবস্থা পরিণতির দিকে। কয়েকদিন আগে প্রফেসর কায়েস উদ্দিন নিরুদ্দেশ যাত্রা করলেন। এইভাবে ক্রমান্বয়ে একে একে কবির ভাষায় নিভিছে দেউটি। তবুও আমাদের এগোতে হবে। তাঁর রেখে যাওয়া চেতনা, দিকনির্দেশনা যদি আমরা মনেপাণে ভালোবেসে মেনে এগোই তাহলে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। আমাদের হাসান স্যার অমর ও অমলিন হবেন বলে বিশ্বাস করি।
লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়