আমার দেখা ২৫শে মার্চের কালরাত্রি

আপডেট: এপ্রিল ৫, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

ইয়াসমিন রেজা ফেন্সী:


২৫শে মার্চ। জাতীয় গণহত্যা দিবস। ভয়াল কাল রাত্রি।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ আমাদের পরিবারের জন্য ছিল একটি কঠিন রাত। আমার লেখার তেমন অভ্যেস নেই, তবুও, মনে হলো কিছু অজানা কথা না বললে শান্তি পাব না। তাই লিখছি।
আমার বাবা মরহুম মো. আবদুল হাকিম। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যা ৬ টায় কারফিউ জারি করা হয়। রাজশাহীতে তৎকালীন পবা থানা, বর্তমান বোয়ালিয়া থানা, সপুরা ছয়ঘাটি পাড়া, পুরাতন নওহাটা রোড ছয়ঘাটি মসজিদের সামনে রাস্তার পশ্চিম পাশেই আমাদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির দেয়ালে লাল ক্রস চিহ্ন দেয়া হয় সন্ধ্যার দিকে। রাতে বাড়ি ঘেরাও করার জন্য।
বাড়ির সামনে স’মিলের এক বিহারি কর্মচারী আমাদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়। বাবা ২/৩ দিন থেকে বাড়ি আসতে পারেন নি। মিটিং মিছিল নিয়ে ব্যস্ত। ২৫ তারিখ সন্ধ্যার পর আমরা ভাইবোন সকলে তাড়াতাড়ি খেতে বসেছি। বাড়ি থেকে পালাতে হবে তাই। এমন সময় আমার বাবা কালো চাঁদর মুড়ি দিয়ে বাড়িতে হাজির।
মা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন বাড়িতে লাল চিহ্ন, কারফিউ শুরু হয়েছে। এসময় তুমি কেন আসলে। বাবা বললো, কাল রাত থেকে কিছুই খাইনি। আমাকে ভাত খেতে দাও। কিন্তু চতুর্দিকে হইচই শুনে, মা শুকনা কিছু খাবার দিয়ে বাবাকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে বললেন। ২ দিন পর আমরা বাবাকে পেয়ে কত খুশি কিন্তু কিছুক্ষণ পর চলে যেতে হলো।
বাবাকে ধরিয়ে দেবার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। বাবার বন্ধু দড়িখররোনার হোসেন চেয়ারম্যান। এ নামেই সবাই চিনে। তিনি সব সময় বাবার সাথে থাকতেন। অনেক বার গুলির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। পরবর্তীতে হোসেন চেয়ারম্যানের বড় মেয়ের সাথে আমার বড় ভাই আলি রেজার বিয়ে হয়। সে সূত্রে হোসেন চেয়ারম্যান আমাদের তাহই।
যা হোক, বাবা চলে যাওয়ার পর আমাদের ছোট চাচা অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন এসে হাজির। তিনি তখন সেরিকালচারে চাকরি করতেন। চাচাকে দেখে আমরা কান্নাকাটি শুরু করলাম। তাঁর চেহারা উস্কোখুস্কো। কাঁদছেন খুব। মা ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে?
চাচা বললেন, সপুরা গোরস্থানের সামনে পাকিস্তানি আর্মিরা ধরে খুবই মারধর করেছে। গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এ সময় উপশহর ক্যান্টনমেন্টের পাঞ্জাবি এক ধোপা, দেখতে পেয়ে তাদের অনেক বুঝিয়ে চাচাকে মুক্তি করান। কারণ ওই ব্যক্তি সপুরা দিয়ে প্রায় যাওয়া-আসা করতো- তাই চিনতেন যে তিনি সাধারণ লোক।
আমার মা অতি সাহসী নারী ছিলেন। তিনি চাচাকেও নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বললেন।
পরে আমার বড় ভাই, খালাতো ২ ভাই, আমার দুই খালা লতা ও ছবিÑ এদের পাশের বাড়ির দোতলায় লুকিয়ে রেখে আসলেন।
তারপর, মা আমি আমার ছোট ভাই গারসেল, রেজা, ছোট বোন সেহেলি রেজা, ২ বছরের মামাতো বোন রিতাকে নিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরতে লাগলেন। কেউ সাহস করে আশ্রয় দিতে পারলেন না। এ সময় আমাদের পাশের বাড়ির ইসমাইল (দফাদার) মামা আমাদের আশ্রয় দিলেন। প্রতিবেশি, আমাদের পরিবারকে খুবই সম্মান দিতেন। ইসমাইল মামার বাড়িতে আমাদের একটা ঘরে লুকিয়ে রাখলেন। আমরা উসখুস করছি আমাদের বাড়ি রেখে এখানে ঘুমাবো না। মা পরে বুঝিয়ে বললেন।
রাতে অনেক গাড়ি ভর্তি পাকিস্তানি আর্মিরা আসলো। আমাদের বাড়ি তল্লাশি করে, তছনছ করলো। এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজ করে শেষে আমরা যেখানে লুকিয়ে ছিলাম সেখানে হাজির।
আমার মা ও ইসমাইল মামা আমাদের কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে ঘুমাতে বললো। এবং মা একটা শাবল হাতে দরজার পাশে থাকলো। যদি আর্মিরা ঘরে ঢুকে পড়ে, কেউতো বাচঁবো নাÑ মা বললো মরবই যখন একটা পাকিস্তানি আর্মিকে মেরেই মরবো। একজন সাহসী, অলিখিত মুক্তিযোদ্ধা আমার মা- ডা. জেসমিন আরা জুবেলা।
এ বাড়িতে আর্মিরা এসে ডাকাডাকি শুরু করলো। তখন ইসমাইল মামা বের হয়ে আসলেন। না হলে যদি ঢুকে পড়ে আর্মিরা। ইসমাইল মামা বের হবার সাথে সাথে আর্মিরা ধরলো, চড় থাপ্পর মারলো। তারপর বাবার কথা, পরিবারের কথা কোথায় লুকিয়ে আছি জিজ্ঞেস করলো। মামা বললো ওনারা বড় মানুষ হয়তো ঢাকায় চলে গেছে। আমি কিছুই জানিনা। কী মনে করে তারা ফিরে গেল। এভাবে আমাদের ২৫শে মার্চ কাল রাত্রি পার হলো।
সকালে মা বুঝতে পারলো এখানে থাকা নিরাপদ নয়। তাই ভাবলো বাড়ি থেকে সোনাদানা, টাকা যা আছে নিয়ে আসি। বাড়ির দিকে যেতেই দেখেন, সাদা পোশাকে ক’জন লোক বাড়ি পাহারা দিচ্ছে।
আমার দুই খালা, খালাতো ভাইদের ট্রেনে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মা আমাদের নিয়ে দাদার বাড়ি গেলেন। ওখানে কদিন থাকার পর নানার বাড়ি গেলাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের কানসাট কলাবাড়ি। এ পর্যন্ত বাবার সাথে আমাদের দেখা নাই। আমরা এক কাপড়ে খালি হাতে বেরিয়ে পড়লাম।
যখন ভারতে যাবার জন্য লোকজন বাড়ি ঘর ফেলে পালাতে লাগলো। আমার বড় ভাই মাকে বললো, বাবা সবার অনুরোধে ভারতে যাবার জন্য বর্ডারের কাছে অপেক্ষা করছে। লোক মারফত খবর দিয়েছে আমাদের যাবার জন্য।
মা আমাদের নিয়ে কিভাবে সোনা মসজিদ পর্যন্ত যাবেন- বুঝতে পাছেন না। আমি আবার পাগলা নদীতে গোসল করতে গিয়ে, ঝিনুকে পা কেটে ফেলেছি। রক্ত বন্ধ হচ্ছেনা। গামছা দিয়ে পা বেঁধে অনেক কষ্টে একটা গরুর গাড়িতে করে রওনা দিলাম। আমরা সবাই ছোট।
হাজার লোক ভারতে প্রবেশ করছে। আমরা পৌছার পর দূর থেকে বাবকে দেখতে পেলাম। কতদিন পর বাবার সাথে দেখা। সেই মুহূর্ত ভোলার নয়।
পরবর্র্তীতে বাবা ভারতের গৌর ক্যাম্পের (মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প) কমান্ড ইনচার্জের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কানসাট কলাবাড়ি থেকে আমার ৫ মামাসহ আরও আত্মীয় স্বজনকে বাবা ভারতে নিয় গৌড়বাগানে ট্রেনিং করান। যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অনেকেই মারা গেছেন। বেঁচে আছেন অনেকে।
আমাদের ভরা সংসার সুন্দর বাড়িঘর সবশেষ। ১৯৭১ এর ১৮ই ডিসেম্বর ফিরে এসে দেখি থাকার জায়গা নাই। সব লুটপাট করে, বোম্ব মেরে বাড়ি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় দুই সেনা পাহারা দিচ্ছেন।
আমরা কোথায় থাকবো, কী খাবো। পরে মাহবুব জামান ভুলু চাচা, হাদী চাচা আরও নেতৃবৃন্দ আমাদের সপুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) রেস্ট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
৬ মাস পর অনেক কষ্টে একটা ঘর বানিয়ে আমরা বাড়িতে ফিরে আসি। শুন্য ঘরে আয় নেই, খাবার নেই। কী দুঃসহ পরিস্থিতি। যাক পুরো কথা বলতে গেলে সিনেমা বানানো যাবে। আমার বড় ভাই আরও অনেক কিছু জানেন।
মা মারা গেলেন ক্যান্সার হয়ে ৭ আগস্ট ১৯৮৮ সালে। বাবা মারা গেছেন ১০ এপ্রিল ২০০০ সালে স্ট্রোক করে। দু’জনেই অর্থাভাবে এক রকম বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন।
বাবার নেই কোনো মুক্তিযোদ্ধার সনদ, পরিচিতি পরিবারের খোঁজও কেউ নেয়ার নেই।
আমি তার মেয়ে হিসাবে তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমি আবার জেলা ম্ুিক্তযোদ্ধা ভাতা প্রদান কমিটির সদস্য নিজেকে অসহায় মনে হয়।
অনেকেই বলেছিলেন, আমাদের হাকিম ভাইয়ের জন্য এবার কিছু করবোই।
পরে সবাই ভুলে য়ায়। বাবা গৌড় ক্যাম্পে থাকাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করার জন্য ২টি নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন “পিশাচের হতাশা” ও “রক্তের বদলা’। আজ কারও কাছে অনুরোধ করতেও বালো লাগেনা। বাবার সনদ পাবার জন্য। বাব, মা শুয়ে আছেন সপুরা গোরস্থানে। আমরা ছেলে, মেয়েরা দোয়া ছাড়া কিছুই করিনি তাদের জন্য।
লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা