আমার হৃদয়ের সেই গহীন কোণে তাঁর নিত্য বসবাস জাস্টিন টুডু

আপডেট: জুন ১১, ২০১৭, ১:২০ পূর্বাহ্ণ

তেত্রিশ…


২০০০ সালের ৩ অক্টোবর মন্ট্রিয়লের নটরডেম বাসিলিকায় কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বাবা পিয়েরে ইলিয়ট ট্রুডো’র কফিনে মাথা ঠেকিয়ে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো।

মিশেলের মৃত্যুটা বাবার কাছে এত বেশি হঠাৎ করে এসেছিলো যে তিনি দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে গিয়েছিলেন। সেই মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে শুরু করে। সেই সময় শাসা আর আমি বাবার পাশে বসে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার করেছিলাম। তারপর, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে এক শুক্রবারের শান্ত বিকেলে বাবা আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন।
এই শোক সাগরের মধ্যে থেকেও আমার মনে পড়েছিলো, তাঁর মৃত্যুর সংবাদটা জানানোর পর পরই আমাদেরকে প্রচুর গণমাধ্যম কর্মীর মুখোমুখি হতে হবে। কয়েক সপ্তাহ আগ থেকেই যখন বাবার শারীরিক অবনতির কথা সবাইকে জানানো হয়েছিলো, তখন আমাদের পিন্স দ্য এভ্যুনিউ বাড়ির চারিদিকে সাংবাদিকরা ভীড় করে থাকতো। আর আমাদের একেবারে ব্যক্তিগত কাজে যখন আমরা বাড়ির বাইরে যেতাম বা বাড়িতে ফিরে আসতাম, তখন ক্যামেরার লেন্সের আলো আমাদের চোখে এসে লাগতো। শাসা সবকিছু ছেড়ে একেবারে চুপচাপ বাড়ির মধ্যে থাকতে লাগলো, কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিলো না, আমাকে অন্তত ফোনটা ঠিকমত ধরতে হতো।
এমন এক মুহূর্তে আমি আমার পুরনো বন্ধু টেরি ডাইমন্ট’কে ফোন করলাম। সে তখন মন্ট্রিয়ল রেডিও’তে উপস্থাপকের কাজ করতো। আমি তাঁকে শুধু জানালাম, সপ্তাহের ছুটির দিনগুলো কাটাতে আমি তার কাছে আসছি। আসলে আমি এমন একটা জায়গাই লুকাতে চাচ্ছিলাম যেখানে গণমাধ্যম কর্মীরা যেন আমাকে খুঁজে না পায়। পরের কয়েক দিনে বাবার সরকারি অন্তোষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারে শাসা, সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তা আর বাবার কয়েকজন পুরনো বন্ধু ছাড়া আমি আর সবার কাছ থেকে এক রকম লুকিয়েই ছিলাম। এর ফলে, আমি আমার সেই কঠিন বিষাদময় দিনে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে কিছুটা নীরবে হাফ ছেড়ে কাজ করতে পারছিলাম।
সেই সপ্তাহের শেষদিনেই বাবার অন্তোষ্টিক্রিয়ায় আমাকে যে শোকগাথা পাঠ করতে হবে, তা লিখে ফেললাম। আমি জানতাম, টেলিভিশন আর সংবাদপত্র বাবার সব কীর্তিতে তাদের অনুষ্ঠান আর পাতা ভরিয়ে দিয়েছে। সেজন্য আমি জানতাম, সবাই বাবার কীর্তি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারছে। কিন্তু বাবা হিসেবে তিনি কত বড় মাপের ছিলেন, তা সত্যিই তারা কেউ জানে না। আমার বন্ধুরা আমাকে কয়েকটি গল্পের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো যেগুলো দিয়ে আমি আমার শোকগাথা’য় শুরু করেছিলাম। আমি আমার বাবার কিছু প্রেরণা আর দর্শনের কথাও উল্লেখ করেছিলাম যার মাধ্যমে তিনি দেশ হিসেবে কানাডার মূল্যবোধ আর স্বপ্নযাত্রা কানাডার জনগণ আর তাঁর সন্তানদের মধ্যে ঢুকাতে চেয়েছিলেন। সেই সাথে গোটা দেশের মানুষ আমার বাবার প্রতি যে ভালোবাসা জানিয়েছিলেন, তাদের প্রতি আমার পরম কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার শোকগাথা আমি শেষ করেছিলাম।
মঙ্গলবার সকালে বাবার অন্তোষ্টিক্রিয়ার জন্য আমি যখন নটরডেম বাসিলিকায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম, তখন মাথায় বার বার ফিরে ফিরে আসছিলো উইলিয়াম সেক্সপীয়ারের নাটকের বিভিন্ন লাইন। আবার ভাবছিলাম, সেই সব “সম্মানিত ব্যক্তিদের” কথা যারা সব সময় রাজনৈতিকভাবে বাবার প্রতিপক্ষ ছিলেন। আমি বারবার ভাবছিলাম, একই সাথে কীভাবে বাবাকে শেষ বিদায় জানাবো আর সেই শেষ বিদায়ে তাঁর সম্পর্কে স্তুতিবাক্য উচ্চারণ করবো। শেষ পর্যন্ত বাবার প্রতি আমার যে গভীর ভালোবাসা আর আবেগ আছে তা দিয়েই কিছুটা নাটকীয় কথায় আমি আমার কথা শুরু করেছিলাম। সম্ভবত আমার সেই কথাগুলো ধনুকের তীরের মত ছুটে গিয়ে সবার আবেগকে বিদ্ধ করেছিলো। বিষয়টা আমি এখন অনুধাবন করতে পারি। কিন্তু সত্যি বলতে কী সেই সময় ওটা নিয়ে খুব বেশি ভাবার অবকাশ পাই নি। আমার মনে হয়েছিলো, ওভাবে অমন সব কথাগুলোই আমার বলা প্রয়োজন। আসলে কথাগুলো আমার একেবারে ভিতর থেকে এসেছিলো।
আমি শেষটা করেছিলাম সবার সামনে বাবাকে আর গোটা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিতে যে, আমি তাঁকে খুবই ভালোবাসতাম এবং সব সময়ই ভালোবেসে যাবো।
২০০০ সালের শরতে কানাডার জনগণ তাদের প্রিয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ইলিয়ট ট্রুডো’কে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললো। আর শাসা, সারাহ আর আমি হারিয়ে ফেললাম আমাদের বাবাকে। বাবা যে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, সেজন্য তিনি আমাদেরকে তাঁর অনুপস্থিতি সামলে নেবার জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু এটাতো সত্যি তোমরা কখনো তোমাদের বাবা বা মা’কে হারানোর মতো একটা বিষয়ে কখনো নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে না। কারো পক্ষেই এটা সম্ভব না। এটা মানতেই হবে, এমন এক মুহূর্ত বা ঘটনা কারো জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এনে দেয়। বাবা-মা যে কোনো কারো জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন বা জীবন চলার আবর্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এটা শুধু ছোট ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেই প্রয়োজ্য নয়, বয়স্কদের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। অন্য যে কারো চেয়ে বাবার প্রতি আমার টানটা ছিলো সবচেয়ে বেশি। সেজন্য আমার জীবনে তাঁর অনুপস্থিতি এক গভীর আর স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
আমাদের সেই চরম দুঃখের দিনে কানাডার জনগণ পরম ভালোবাসার সাথে আমার আর আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলো। আমি জীবনে কখনো ভুলবো না, কোনো কিছু পাওয়ার আশা ছাড়াই কত বেশি ভালোবাসা আর মমতা তারা আমাদের দেখিয়েছিলেন। খুব বেশি লোকের ভাগ্যে এমন ভালোবাসা জুটে না যে, তাদের বাবা মারা গেলেন, আর ত্রিশ মিলিয়ন মানুষ গভীর ভালোবাসা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালেন। ওই সময় হঠাৎ যে পরিবর্তনটা ঘটেছিলো সেটাও কিছুটা মনে রাখার মতো। বাবা যখন রাজনীতি ছাড়লেন আর জনগণের সম্পৃক্ততা থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেললেন, তখন আমার বয়স ছিলো তেরো। আমার সেই কৈশোর আর যৌবনের শুরুর সময়টা আমি বলতে গেলে লোকচক্ষুর আড়ালেই কাটিয়েছিলাম। কিন্তু বাবার অন্তোষ্টিক্রিয়ার পর আমি যেসব রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলাচল করতাম সেখানকার মানুষদের কাছে আমি এক পরিচিত মুখ হয়ে গেলাম।
বাবার অভাবটা আমি তিলে তিলে বুঝতে পারছিলাম। ওটা ছিলো অন্যরকম এক কষ্ট আর বেদনার, তবে একই সাথে বাবার মৃত্যু এক ধরনের স্বাধীনতার স্বাদের অনুভূতিও এনে দিয়েছিলো। আমি আমার শোকগাথা’য় তাঁর কথা থেকেই বলেছিলাম, তিনি যে মূল্যবোধ এর কথা সব সময় বলে এসেছেন, সেটা যেন আমাদের সবার জীবনে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। আজ তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন মনে প্রাণে মনে করি, তাঁর দেয়া সব উপদেশগুলো একই সাথে ছিলো সবার ও আমার জন্য।
মানুষজন আমাকে প্রায়ই প্রশ্ন করে, এই যে আমার বাবা নেই আর এই যে আমাকে আর অমনভাবে উপদেশ দেবার কেউ নেই, এর জন্য কী আমার খুব খারাপ লাগে, বিশেষ করে আমি যখন তাঁরই পদাংক অনুসরণ করে লিবারেল পার্টির নেতা হয়েছি। বাবা হারানো অন্যান্য সবার মতো আমিও আমার বাবার অভাবটা তিল তিল করে অনুভব করি, কিন্তু ওই যে উপদেশ নেয়ার যে বিষয়, সেখানে আমি কোনো অভাববোধ করি না। সত্যি বলছি, আমাদের খুবই ঘনিষ্ঠ ও গভীর সম্পর্ক ছিলো। তিনি আমাকে যুক্তিবাদী-বিবেকবান ও দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সারাজীবন আমার সাথে তাঁর জীবনের মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি আর আগ্রহের বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। ওই কারণেই, যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁর অভাববোধ করলে, আমি আমার হৃদয়ের গভীরে কান পেতে রাখি তাঁর কন্ঠস্বর শুনবো বলে।
আমার হৃদয়ের সেই গহীন কোণে তাঁর নিত্য বসবাস, আর সেখান থেকেই তিনি আমাকে অবিরাম উৎসাহ দিয়ে চলেছেন।
(চলবে)