আমি এক শূন্য

আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০১৬, ১১:০৬ অপরাহ্ণ

মনি হায়দার

আপনে ডাক্তার? সামনে তাকায় মুহিন। সদ্য গোঁফ ওঠা একটা ছেলে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে গভীর আগ্রহের সঙ্গে। ছেলেটির গায়ে প্রাচীন কালের জামা, ছেঁড়া এবং ময়লা। শরীরটা বেশ নাদুস নুদুস। মুখের দাঁতগুলো সাদা। গোটা মুখের উপর কমনীয় একটা রূপ আছে। এ্যাপ্রোনটা ভালো করে শরীরের সঙ্গে গুটিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে মুহিন, ডাক্তার দিয়ে  কী হবে?
খালার খুব জ্বর। বুবু আপনারে যাইতে কইছেÑ
মজা পাচ্ছে মুহিন। কে খালা, কে বুবু কিছুই জানে না ও। কিন্তু  ছেলেটির চোখের মিনতি মুহিনকে আগ্রহী করে তুলছেÑ কোথায় তোমার খালা?
ওইতো বাসায়Ñ যাইবেন? একটা রিকশা ডাহি? মুহিনের আগেই একটা রিকশা ডাকে ছেলেটি, এই রিকশা যাইবা?
রিকশাঅলা রিকশা থামিয়ে দিলে মুহিন উঠে বসে, পাশে বসে ছেলেটি। এবং বসেই হাতের ব্যাগটা নিজের হাতে নেয়। মুহিন বুঝতে পারে ছেলেটির এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে।
রিকশা ছুটে চলেছে। মুহিন চারপাশটা দেখতে দেখতে যাচ্ছে। মফস্বল এলাকাÑ কিশোরগজ্ঞ। মুহিনের একটা রোগ আছে, রুগি, রুগির ব্যবস্থাপত্র, পথ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে এ্যাপ্রোন গায়ে চড়িয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে সোজা কমলাপুরে আসে। প্রথমেই যে ট্রেন পাবেÑ টিকিট কেটে উঠে বসবে। যেতে যেতে মফস্বল এলাকা দেখে নেমে পড়বে। মোবাইল বন্ধ রাখে। দুনিয়ার কারো সংগে যোগাযোগ থাকে নাÑ নিজের মতো থাকে এক দুই তিন দিন। অনেক অনেক মজার ঘটনাও ঘটে। ডাক্তার পরিচয়ের কারণে অনেক সুবিধাও পায়। সকালে অফিসে এসেই ডাক পেয়েছিল.. বাইরে চলো…বাইরে চলো। এগারোটা নাগাদ কোনো রকমে সময় পার করে এ্যাপ্রোন গায়ে চড়িয়ে, ব্যাগটা হাতে নিয়ে অফিসের বাইরে এসে দাঁড়ায়। রিকশায় উঠে কমলাপুর। কমলাপুর  থেকে ট্রেনে কিশোরগঞ্জ। কিশোরগঞ্জ নেমে এক কাপ চা খেয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করেছে মুহিন। শহরের প্রধান রাস্তা পার হয়ে মানুষের চলাচল দেখতে দেখতে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে শহর প্রায় ছেড়ে বাইরে এসে পড়েছে। ফুরফুরে বাতাস, ¯িœগ্ধ আকাশ, খোলামেলা প্রকৃতিÑ বেশ লাগছিল মুহিনের।  ছেলেটির কথায় সুন্দরের জগৎ থেকে বাস্তবে আসে।
রিকশা চলছে বেশ্র দ্রুত গতিতে। নিজের মনে ভাবে মুহিনÑ কোথায় কোন রুগির বাড়ি যাচ্ছে সে? রুগি কি ভিজিট দিতে পারবে? না পারলে অসুবিধা নেই। বিনা ভিজিটেই রুগি দেখবে। কিন্তু বুবুটা কে? ছেলেটির দিকে তাকায় মুহিনÑ নির্বিকার সামনে তাকিয়ে আছে।
তোমার নাম কী?
কালো মুখে হাসি ফোটেÑ আমার নাম সুবল।
কতদূর তোমাদের বাসা?
এইতো আইসা পড়চি। রিকশাভাই, থামেন।
রিকশা থামলে মুহিন নেমে দাঁড়ায়। রাস্তাটা পাকা কিন্তু পুরনো। এবড়ো থেবড়ো। গোটা এলাকাটা গ্রামীণ । রাস্তার পাশে আম জাম কাঁঠালের গাছ। আরও আছে প্রচুর কলাগাছ। পাখপাখালির ডাকও শুনতে পায় মুহিন। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা পুকুর। পুকুরের পানি স্বচ্ছ। ছোট একটা ঘাটলাও আছে। মুহিনের খুব ইচ্ছে হলোÑ পানিতে মুখ দেখতে। ঘাটলার পাড়ে দাঁড়িয়ে পানির মধ্যে মুখ বাড়িয়ে দেয়। পানির মধ্যে সুন্দর মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে কয়েক মুহূর্ত, দেখা শেষ হতেই দুহাতে পানি নিয়ে মুখে দেয়।
তাড়াতাড়ি আহেন, খালার অবস্থা ভালো নাÑ সুবল তাড়া দেয়।
চলো।
সুবল আগে আগে, পিছনে পিছনে হাঁটে মুহিন। ঢোকে একটা পুরোনো কিন্তু বনেদি বাড়ির ভেতরে। বাড়িটি ইটের তৈরি। যখন তৈরি হয়েছিল, বোঝা যায়, বাড়ির মালিক যথেষ্ট সৌখিন ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযতœ অবহেলার কারণে বাড়িটির ক্ষয়িষ্ণু দশা চলছে। বাড়ির সামনে কয়েকটা লেবু, আমলকি, আমড়া, কলা গাছের ঝাড়। বাড়িটির সামনে মোটামুটি বড় বারান্দা। বারান্দায় মলিন রঙের দুটি বেতের চেয়ার। চেয়ারের সামনে একটি কাঠের টেবিল। টেবিলের উপর মলিন সাদা কাপড় রাখা। কাপড়ের উপর কয়েকটি ফুলের হালকা আভাষ দেখতে পাচ্ছে মুহিন।
ডাক্তার সাব, আহেন। সুবলের দিকে তাকায় মুহিন। সুবল ঘরের ভেতর থেকে প্রথম দরজায় দাঁড়িয়েছে। পেছনে একটি মুখ। সুন্দর, কমনীয়। চোখে রাজ্যির ক্লান্তি, কপাল চওড়া। মাথার দুপাশে সিঁথি। শরীরে জড়ানো স্যালোয়ার কামিজ। সরু বিন্দাস হাত দুটো একেবারে খালি। কপালে বড় একটা লাল টিপ।
সুবলের পেছনে ঘরের ভেতরে ঢোকে মুহিন। ভেতরের ঘরটা বেশ বড়। এবং গোটা ঘর জুড়ে একটা পুরোনো দিনের খাট। খাটের উপর জীর্ণ কিন্তু বনেদি বিছনার উপর অস্থিচর্মের একজন নারী শুয়ে আছে। মুখ হা। বিস্ময়কর ঘটনা, মুখের সবগুলো দাঁত অটুট। চেহারা চিমসে গেছে কিন্তু আভিজাত্যর একটা নির্মোক এখনও জ্বলজ্বল করছে। চোখ দুটি মুদ্রিত। কপালের উপর আধাপাকা কয়েক গাছি চুল বাতাসে নড়ছে। মুহিত অভ্যস্ত অভিজ্ঞতায় বিছানার পশে বসে রোগীর ডান হাত নিজের হাতে নিয়ে নাড়ির স্পন্দন অনুভব করছে। স্পন্দন আছে কিন্তু প্রবাহটা বড় ক্ষীণ। যে কোন সময়ে এই ক্ষীণ ধারা রহিত হয়ে যেতে পারে। মুহিত মাথা তুললে দেখে মেয়েটি সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিব্বল চোখে। সুবল নেই।
উনি খাওয়া দাওয়া করেন না?
মাথা নাড়ায় মেয়েটি, না।
কেনো?
ইচ্ছে করে খায় না।
মুহিত ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠে, ইচ্ছে করে খায় না!
মাথা ঝাঁকায় মেয়েটি, হ্যাঁ।
কিন্তু কেনো?
আমি জানি না।
উনি আপনার কী হয়?
খালা।
ওনার ছেলে মেয়ে আছে না?
একটা ছেলে আছে, ঢাকায় থাকে।
মায়ের খবর নেয় না?
নাহ্।
বুঝতে পেরেছি।  গরম পানির ব্যবস্থা করা যাবে?
যাবে।
মেয়েটি ঘর থেকে বের হয়ে যায়। মুহিন ব্যাগ খোলে, ব্যাগের ভেতরে বারো রকমের ঔষধ থাকে। বের করে প্রয়োজন মতো সাজায় সামনের টেবিলের উপর। মেয়েটি একটি বাটিতে গরম পানি এনে সামনে রাখে। মুহিন দ্রুত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ গরম পানিতে ধুয়ে একটা শিশি ভেঙে ভেতরে ঔষধ নিয়ে মহিলার হাতে পুশ করে তাকায় মেয়েটির দিকে।
উনি কতোদিন ধরে এ রকম না খেয়ে আছেন?
মাঝে মাঝে জোর করে খাওয়াই। খাওয়ালে বকাবকি করে। বকতে বকতে বমিও করে। এবারের অবস্থা আরও জটিল। গত দুদিনে কিছুই খায়নি।
মহিলা হঠাৎ চোখ মেলে তাকায় কিন্তু কিচ্ছু দেখতে পায় বলে মনে হলো না মুহিনের। ওর দিকে অপলক তাকিয়েই থাকলো কয়েক মুহূর্ত। তাকিয়ে থাকলেও ওকে দেখতে পায়নি। দৃষ্টি অন্য কিছু খুঁজছে। মাথা এপাশ ওপাশ করে আবার তাকায় মুহিনের দিকে।
মেয়েটি অনুরোধ করে, আপনি একটু সরে দাঁড়াবেন? খালা আমাকে খুঁজছে।
মুহিন দ্রুত  সরে দাঁড়ালে মেয়েটি কাছে যায় মহিলার। হাত ধরে মুখের কাছে মুখ নিয়ে যায়Ñ খালা, কিছু বলবেন?
আলো, শিশির কি এসেছে?
না খালা, আসেনি।
ফোন করেছিলি?
করেছিলাম।
আমি অসুস্থ বলেছিস?
বলেছি।
কি বললো? আসবে?
মাথা ঝাঁকায় আলো, আসবে।
মহিলার মুখে ক্ষীণ হাসির  রেখাÑ আসবে? কবে আসবে? বলতে বলতে মহিলা আগের মতো নির্জীব পড়ে থাকে। গোটা ঘটনা যাদুর মতো লাগলো মুহিনের কাছে। গোটা বাড়িতে থৈ থৈ শোক ভেসে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে সিনেমায় দেখা আধা ভৌতিক পরিস্থিতি।
ব্যাগ গুছিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে মুহিন চলে যাওয়ারÑ মহিলা আবার চোখ মেলে তাকায়, আমি যে দেখলাম শিশির আমার পাশে বসা। আলো, তুই আমাকে মিথ্যা বললি কেনো?
আলো, আপনি সরুন। আমি দেখছি।
আলো নেমে গেলে বিছনায় বসে মুহিন। হাত ধরে মহিলারÑ হ্যাঁ, আমিতো এসেছি মা। কিন্তু আপনি তো আমার সঙ্গে কথা বলছেন না।
কি বলবো?
খাচ্ছেন না কেনো?
আমাকে খেতে দেয় না আলো। সব খাবার আলো আর সুবল খেয়ে ফেলে। তুমি আসতে এতো দেরী করলে কেনো? আমার দাদাভাই কেমন আছে? ওকে আনলে না?
মুহূর্তে বুঝে নেয় মুহিন, নাতির কথা বলছে। এই প্রশ্নের জবাব কী দেবেÑ বোঝার আগেই মহিলা ডাকে আলোকেÑ আলো? শিশিরকে ভালো করে খেতে দে। মহিলা পাশ ফিরে শুয়ে থাকে।
সুবল ঢোকে। হাতে খাবারের একটা ট্রে।