আমি সব সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের আগুনটা জ্বালানোর চেষ্টা করতাম

আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০১৭, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

জাস্টিন ট্রুডো



ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদের অনেকের সাথেই আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো। ওখানকার ছাত্রছাত্রীরা ছিলো খুবই উদ্যেগী আর বিভিন্ন চিন্তা চেতনার। যেহেতু আমাদের শিক্ষাটা ছিলো ক্লাসে পরস্পর কথপোকথন ধরনের, সেজন্য একে অপরের সম্পর্কে প্রচুর জানা ও মেলামেশার সুযোগ আমাদের হতো।
ভ্যাংকুভারে প্রথম বছরটা খুব তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছিলো। সপ্তাহের ক্লাসের দিনগুলোতে আমি শহরে থেকেই পড়াশুনায় ভালো করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতাম, তারপর ছুটির দিনগুলো সব ফেলে হুইস্টলারে চলে যেতাম। সবকিছু ভালোভাবে বুঝার আগেই আমি স্নাতক পাশ করেছিলাম আর কোকুইটলামে পাঠদান-প্রশিক্ষণ এর জন্য কাজ করা শুরু করেছিলাম। ইতোমধ্যে আমি কিছুটা বড় একটা অ্যাপার্টমেন্টে ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার ক্লাসমেট ক্রিস ইংভাল্ডসন ও তার স্ত্রীসহ বাস করা শুরু করলাম। ক্রিস আমাকে ওয়েস্ট পোয়েন্ট গ্রে একাডেমী’র প্রধান শিক্ষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। তারপর কিছুদিন পরেই আমি সেখানে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আমন্ত্রণ পেলাম। ক্রিস ও সেখানে শিক্ষক হয়েছিলো। ওয়েস্ট পোয়েন্ট গ্রে একাডেমী তখন কেবল দু’বছরে পা দিয়েছিলো। প্রাইভেট এই স্কুলে ছেলেমেয়ে উভয়েই এক সাথে পড়াশুনা করতো। স্কুলের পরিবেশটা ছিলো খুব সুন্দর। একজন কেবল পাশ করা শিক্ষক হিসেবে ওখানে আমার নিয়োগটা খুব ভালো ছিলো বলা যায়। ওখানে যারা চাকরি করতো তারা সবাই ছিলো কম বয়সী ও খুবই কর্মঠ, এবং আমার জন্য ওটা ছিলো একটা বিরাট সুযোগ কারণ একটা নতুন স্কুলকে তিল তিল করে গড়ে তোলার আনন্দটা আমি উপভোগ করছিলাম।
তার প্রায় দশ বছর পরে, আর আমার রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের অনেক সময় পেরিয়ে যাবার পরে এক গভীর রাতে টেলফোনে একটা খারাপ সংবাদ পেয়েছিলাম। শিশু পর্নোগ্রাফি রাখার অপরাধে ক্রিস’কে পুলিশ ধরেছে। পরবর্তীতে সে দোষী প্রমাণিত হয় এবং তার তিন মাসের জেল হয়। ক্রিস’কে যারা জানতো এবং যারা তার সাথে শিক্ষকতা করতো তাদের সবার মত আমিও এ সংবাদে খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম। ক্রিস তার শিক্ষকতার চাকরিটি হারিয়েছিলো, সেই সাথে তার বিয়েটা ভেংগে গিয়েছিলো আর আমি সহ তার অধিকাংশ বন্ধুদের সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো।
আমি যখনই সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে শিশু পর্নোগ্রাফি বা এ ধরনের কোনো বিষয়ের অভিযুক্তদের নিয়ে কোনো সংবাদ পড়ি বা দেখি, তখন যে বিষয়টা পাঠক বা দর্শকদের সামনে আসে তা হচ্ছে সেই অভিযুক্তরা যে এলাকায় থাকে তাদের আশেপাশের মানুষদের সাধারণত জিজ্ঞেস করা হয়, অভিযুক্তের মধ্যে তারা কখনো যৌন বিকৃতির কোনো চিহ্ন দেখেছে কি না। অনেক মানুষের মতো আমিও সাধারণত ওমন কোনো সাক্ষ্য দেয়া থেকে নিজেকে এড়িয়ে চলতাম। আমি ধরেই নিতাম আমি যার সাথে চলাফেরা করবো তার মধ্যে এমন কোনো বিষয় থাকবে না বা ওমন ধরনের চিন্তার কেউ আমার সঙ্গী হতে পারে না। ক্রিসের সেই ঘটনার পর আমি যেটা অনুধাবন করেছিলাম যে, মানুষ সম্পর্কে আমি যা ভাবি তা অনেক সময় সত্যি নাও হতে পারে। ওই ঘটনার পর আমার কাছে ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছিলো কেনো পুলিশ অফিসার বা আইনের মানুষদের শিশুদের যৌন নিপীড়ন বা যে কোনো ধরনের বঞ্চনা থেকে রক্ষা করার জন্য এত বেশি তটস্থ থাকতে হয়। ক্রিসের সাথে এক বাসায় থাকার পরও তার সেই অন্ধকার দিক সম্পর্কে তার স্ত্রী বা আমি কিছুই জানতাম না। ওটা আমার জন্য এক তিক্ত শিক্ষা ছিলো এবং আমার মনে হয়েছে ব্যাপারটা অন্যদের জানানো প্রয়োজন।
আমি আড়াই বছর ওয়েস্ট পয়েন্ট গ্রে একাডেমীতে পড়িয়েছিলাম। আমি প্রধানত ফরাসি ভাষা আর গণিত পড়াতাম, তবে মাঝে মধ্যে আমাকে নাটক, ক্রিয়েটিভ রাইটিং এবং গ্রেড টুয়েলফ এর আইন এর ক্লাস নিতে হতো।
আমার ক্লাসগুলোতে আমি সেই ব্রেবফ এ পড়ার সময় যেটা দেখতাম অর্থাৎ মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের পা-িত্যপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ সেই ক্লাসের ধরণ, সেটা বাদ দিয়ে বরং আমি সবার সাথে কথপোকথন ভঙ্গিতে আমার ক্লাস চালিয়ে যেতাম। এইভাবে আমি চেষ্টা করতাম, গণিতের বিভিন্ন  ধাঁধাঁ আর বুদ্ধি খাটাতে হয় এমন বিভিন্ন ধরনের বিষয় আমার ক্লাসে রাখতে। এভাবে পড়ানোটায় আমি নিজেকে আমার ক্লাসে বুদ করে রাখতাম। ভ্যাংকুভারে প্রথম দিকে আমি যেভাবে ক্লাসগুলো নিতাম, তার একটা উদাহরণ আমার মনে পড়ছে- গণিতে যারা পারদর্শী তাদের কাছে খুবই পরিচিত একটা ধাঁধাঁ হচ্ছে, “সেভেন মাইনাস এলেভেন প্রব্লেম”। ধাঁধাঁটা এমন, একজন একটা কনভিনিয়েন্স স্টোরে কিছু কেনার জন্য ঢুকেছে। তারপর চারটা জিনিস কেনার পর সে দেখলো, দোকানদার তার ক্যালকুলেটরে সেগুলোর দাম হিসেব করছে। যখন দোকানদার তাকে জানালো যে, জিনিসগুলোর দাম হচ্ছে, ৭ ডলার ১১ সেন্ট। ক্রেতা সেটা দেখে দোকানদারকে বললো। দোকানদার জিনিসগুলোর দাম যোগ না করে একটা দামের সাথে আরেকটা দাম গুণ করেছে। ক্রেতার কাছে ক্ষমা চেয়ে, দোকানদার এবার জিনিসগুলোর দাম যোগ করা শুরু করে চোখ ছানাবড়া করে দেখলো ওগুলো যোগফলও হয়েছে সেই একই অর্থাৎ ৭ ডলার ১১ সেন্ট। এখন এই ধাঁধাঁ মূল চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, যে চারটি জিনিস ক্রেতা কিনেছিলো সেগুলোর প্রত্যেকটির দাম কত ছিলো। যেগুলোর যোগ করলে বা গুণ করলে দাঁড়াবে ৭ ডলার ১১ সেন্ট। এই ধরনের ধাঁধাঁর উত্তর বের করা ছোট বাচ্চাদের খেলা নয় এবং এ ধরনের ধাঁধাঁ শোনার পর গণিতের ধাঁধাঁর প্রতি তোমার আগ্রহ না থাকলেও সম্ভবত এটাকে তুমি একদম দূরে সরিয়ে ফেলতে পারবে না। কিন্তু যদি এ ধরনের ধাঁধাঁ তোমাকে সত্যিই আকৃষ্ট করে তবে তুমি এর সমাধান খোঁজার জন্য দিনের পর দিন লেগে থাকবে। যেমন আমি নিজেই করতাম।
আমার যুক্তিটা এখানেই; যদি সত্যি সত্যি আমি আমার ছাত্রদের এমন এক কাজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারি যেমন ৭ ডলার ১১ সেন্ট ধাঁধাঁয় আমি করেছিলাম, তাহলে আমার বিশ্বাস, প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে যে জ্ঞানের দ্যূতি আছে তা থেকে অবশ্যই আলো ঠিকরে বের হবে। আমি সব সময় সেই স্নো-বোর্ডিং এর দিনগুলোর কথা বলতে ভালোবাসি। কারণ সেই সময় যথার্থই আমি সেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই কোন কিছু শেখানোর সেই আগুনটা জ্বালাতে পেরেছিলাম। সত্যি বলতে কী, আমি সব সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের  আগুনটা জ্বালানোর চেষ্টা করতাম।
আমি তখন যে সব কৌশল ব্যবহার করতাম, ওগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ আমি বলতে পারি, আমি যখন বীজগণিতের ক্লাস নিতে ঢুকতাম, তখন শুরুতেই আমি সাধারণত জিজ্ঞেস করতাম, কেনো আমাদের গণনার পদ্ধতিতে আমরা ১০ ধরে সব কিছু করি। আমরা কেনো ৮ বা ৬ অথবা অন্য কোনো নম্বর ধরে করি না। আমি তাদের আবার বলতাম, প্রতিটি জাতি ও সংস্কৃতির মানুষই তাদের গণনাটা ১০ এর ওপর ভিত্তি করে করে। আমি সবাইকে এই চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তখন জিজ্ঞেস করতাম, “কেনো এমনটা হয়?” স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেলে তাদের সবাইকে দু’হাত উপরে তুলে চারিদিকে তাকাতে বলতাম। একে একে সেই ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারতো তাদের প্রত্যেকের প্রসারিত দুই হাতের দশ আংগুলের মধ্যেই শুধু সেই উত্তরটা লুকিয়ে নেয় বরং তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই সেই উত্তরটা লুকিয়ে আছে।
বীজগণিতে ধাঁধাঁটা বেশ ভালোভাবে জমতো। আমি আমার ক্লাসের সবাইকে ধাঁধাঁ ছুঁড়ে দিয়ে বলতাম, মনে করো বাবা আর মেয়ে গেছে মাছ ধরতে এবং তারা যখন ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছিলো, তখন বাবা মেয়ে যে কয়েকটা মাছ ধরেছে সেখান থেকে একটি চাইলো। তিনি বললেন, “তাহলে আমাদের দু’জনেরই মাছের সংখ্যা সমান হবে।” তখন মেয়ে তার বাবাকে বললো, সে যদি তাকে একটি মাছ দেয়, তাহলে তার মাছে সংখ্যা তার বাবার চেয়ে দ্বিগুণ হবে। তাহলে এখন ধাঁধাঁটা হলো তারা প্রত্যেকে কতটি করে মাছ ধরেছিলো।
বীজগণিতের দু’টি সহজ সমীকরণে দুটি ভ্যারিয়েবল মধ্যে এর সমাধান খুঁজে পেতে পারো। অবশ্যই সহজাত কিছু পথ আছে যেগুলোর মাধ্যমে খুব সহজেই এগুলোর সমাধান খুঁজে বের করা যেতে পারে। যে সব ছেলেমেয়েরা খুব সহজেই আর খুব দ্রুত এগুলোর সমাধান বের করে ফেলতে পারতো, তারা সবাই যে গণিতে ভালো করতো এমনটি নয়। আমার আসল উদ্দেশ্য ছিলো তাদের এ বিষয়ের চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। আর তাদেরকে সেই মোক্ষম সময়ে নিয়ে যাওয়া আর তাদের মুখ দিয়ে আনন্দে “আহ” শব্দটি বের করানো এবং আমি লক্ষ্য করতাম। এমন সময়ে তাদের অন্তরের ভিতর যে আলো জ্বলে উঠতো এবং তা ছড়িয়ে পড়তো তাদের চমৎকার আলোকিত সব মুখম-লে।
ইংরেজিটাও আমি ওমনভাবেই পড়াতাম। ছাত্রছাত্রীদের কবিতার ছন্দ বুঝানোর জন্য আমি হয়তো বোর্ডে লিখতাম, “ট…বি হর্নেট ট…বি” এবং দেখতে চাইতাম কে ‘হ্যামলেট’ নাটক থেকে এই ছন্দের একটি লাইন উচ্চারণ করতে পারে। আমার এই পড়ার বিষয়টা আমি কিছুটা পেয়েছিলাম আমার ব্রেবফ এর শিক্ষক আন্দ্রে শ্যাম্পাগনের কাছ থেকে। তাঁর মত আমিও সবসময় চাইতাম, ছাত্রছাত্রীরা এসব ক্ষেত্রে একদম নিজেরা চিন্তা করুক আর তারা যেসব উদাহরণ দিবে সেগুলো যেনো হয় আমাদের সাধারণ কথার মধ্য থেকে। আমার উদ্দেশ্যই ছিলো ছাত্রছাত্রীদের এমন কিছু শেখানো যেখান থেকে তারা নিজেদের চিন্তা করার একটা ক্ষেত্র পাবে।
আমার পড়ানোর এই ধরণটা অনেক সময় স্কুল কর্তৃপক্ষকে ধাঁধাঁর মধ্যে ফেলে দিতো। কিন্তু এই পড়ানোটার ধরনটার জন্য আমি আধিকাংশ ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুবই প্রিয় একজন শিক্ষক হয়ে গিয়েছিলাম। তারা জানতো আমি বিতর্ক করতে খুব ভালোবাসি এবং যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি। সেজন্য মাঝে মাঝে তারা চেষ্টা করতো আমাকে পাঠ্যসূচির পড়া থেকে সরিয়ে দর্শনের কোনো এক বিষয় নিয়ে আলোচনা করাতে। মাঝে মধ্যে এমন আলোচনায় তারা একেবারে মজে যেতো। তবে এ ধরনের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে ছোট খাটো কিছু সমস্যাও হতো। ফলে যখন আমি তাদের মধ্যে শৃংখলা আনার চেষ্টা করতাম এবং তাদের মতের প্রত্যাশার বাইরে মূল পাঠ্যসূচির পড়াশুনা নিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখতে চাইতাম। তখন আমি বুঝতে পারতাম, গল্প পাগল সেই বয়সের ছেলেমেয়েদের অনেকেই আমার ওপর মনোক্ষুণœ হতো।
এমন ক্ষেত্রে আমি বরাবরই তাদের যে কথাগুলো বলতাম তা হচ্ছে, ” আমি তোমাদের সবাইকে খুবই পছন্দ করি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তোমরা যে অদ্ভুত সব চিন্তা করো, তার জন্য আমি তোমাদের সম্মানও করি এবং এ কারণে তোমাদের সবার প্রতি আমার অনেক বেশি প্রত্যাশা। যদি তোমরা তোমাদের বাড়ি থেকে ক্লাসের পড়াশুনাটা না করে আনো বা পরীক্ষায় ভালো না করো, তা হলেতো আমি তোমাদের পছন্দ বা সম্মান কিছুই করতে পারবো না। তোমাদেরতো এই বিষয়টা বুঝতে হবে। তোমরা জীবনে যা হতে চাও বা করতে চাও সেদিকে লক্ষ্য রেখেতো তোমাদের কাজ করতে হবে। তোমরা যদি এ বিষয়টা মাথায় না রাখো আর বাস্তবতা অনুযায়ী তোমাদের নিজেদের কাজ ও চিন্তাকে এগিয়ে না নাও, তাহলেতো আমিও কখনো তোমাদের মন মতো কিছু করবো না।
(চলবে)