আমেরিকাকে ডুবিয়ে বিদায় হলেন ট্রাম্প

আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০২১, ২:১৩ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বুধবার জয়েন্ট বেইজ অন্ড্রুজ থেকে বিদায় নিচ্ছেন ডনাল্ড ট্রাম্প, পাশে মেলানিয়া। ছবি রয়টার্স

‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান নিয়ে তিনি জয় করেছিলেন হোয়াইট হাউজ; তার পর চার বছরে ঘূর্ণিঝড়ের মতো সবকিছু উল্টে-পাল্টে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় এক কালো অধ্যায় রচনা করে বিদায় নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
স্থানীয় সময় বুধবার দুপুরে জো বাইডেনের অভিষেকের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে ট্রাম্পের মেয়াদের অবসান ঘটেছে। ইতিহাসে তাকে মনে রাখবে দুইবার অভিশংসিত হওয়া প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে।
নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ‘ভুয়া অভিযোগ’ করে আসা ট্রাম্প উত্তরসূরির অভিষেকে যাননি। ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে চড়ে রওনা হন জয়েন্ট বেইজ অন্ড্রুজে, সেখানেই তার বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়।
ভোটে হেরে যাওয়ার ইঙ্গিত পেয়ে কারচুপির অভিযোগ, সমর্থকদের উসকে দিয়ে পার্লামেন্ট ভবনে হামলা, গণতান্ত্রিক চর্চা-ধারাবাহিকতাকে পাশ কাটিয়ে খেয়াল খুশিমতো পদক্ষেপ নেওয়া, মেয়াদ শেষের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের পছন্দ মাফিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের চেষ্টা করা, ঘনিষ্ঠদের আইনি ছাড়- এরকম ঘটনা ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলোতে অপরিচিত কিছু নয়। তবে গত চার বছরে ডনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে এর সবকিছুই মঞ্চস্থ হয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে।
চার বছর আগে যখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন যেমন অনেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন, বিদায় নেওয়ার সময়ও তিনি তেমনি প্রতি পদে পদে নিজের চিহ্ন রেখে গেছেন।
আমেরিকানরা যা নিয়ে গর্ব করে, সেই রাজনৈতিক রীতি-নীতি, শিষ্টাচার আর ঐতিহ্যকে পায়ে দলে অনেক নজিরই সৃষ্টি করেছেন ট্রাম্প। শেষ সময়ে এসে ‘নির্বাচন চুরির’ কথা বলে শক্তি দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনতে তিনি সমর্থকদের উস্কে দিয়েছেন। ক্যাপিটলে সাংবিধানিক সরকারের কার্যক্রমে তার ওই হস্তক্ষেপের চেষ্টা পুরো বিশ্বকেই স্তম্ভিত করেছে।
৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে বাইডেনের জয়ের স্বীকৃতির প্রক্রিয়া নিয়ে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন চলার সময় ট্রাম্প সমর্থকরা সেখানে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালায়। সংঘর্ষে এক পুলিশসহ ৫ জন নিহত হন।
ক্যাপিটলের ওই ঘটনার পরই দ্বিতীয়বার অভিশংসিত হয়ে ট্রাম্প গড়েন অসম্মানজনক প্রস্থানের নতুন নজির। প্রথমবার ট্রাম্প অভিশংসিত হয়েছিলেন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে।
এবার ক্যাপিটল হিলে হামলায় ‘উস্কানি’ দেওয়ার অভিযোগে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পকে ফের অভিশংসিত করে তার নাম তুলে দেয় ইতিহাসের পাতায়।
ইতিহাসবিদরা তার প্রেসিডেন্সি নিয়ে লিখতে গেলে ক্যাপিটলে হাঙ্গামার প্রেক্ষাপটতো আসবেই, সঙ্গে আসবে শার্লটভিলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের হামলাসহ ডানপন্থি উগ্রবাদীদের সহিংস উত্থানের কথা।
বিভক্তির চোরাবালিতে
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে নজিরবিহীনভাবে পরীক্ষায় ফেলে দিয়ে দেশকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে অকার্যকর এবং বিভক্ত একটি দেশে পরিণত করেছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্ট জনগণকে বিভক্তির এমন এক চোরাবালিতে রেখে যাচ্ছেন, যেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাশালী এ দেশটির বেশ সময় লাগবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
মহামারীতে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক ভেদাভেদের দেয়াল তুলে দিয়ে ‘নিতান্ত অনিচ্ছাতেই’ হোয়াইট হাউজ ছাড়লেন ৭৪ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট, যিনি আগে ব্যবসায়ী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
ট্রাম্প রেখে যাচ্ছেন এক নৈরাজ্যবাদী চেতনা আর তা ধারণ করার মত বহু সমর্থক। ফলে ট্রাম্প না থাকলেও ট্রাম্পবাদকে মোকাবেলা করতে হতে পারে বাইডেনকে।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত চার বছরে যেসব নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটই বদলে দেয়নি, পুরো বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
দেশের ভেতরে সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করে আগামী দুই-তিন দশকের জন্য উদারপন্থিদের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছেন তিনি।
নির্বাহী আদেশের বলে তিনি আরও যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, নতুন প্রেসিডেন্ট এসে তা বাতিল করতে পারলেও কিছু কিছু পদক্ষেপের প্রভাব আরও বহুদিন থেকে যাবে আমেরিকানদের জীবনে।
ট্রাম্প আমলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সারাক্ষণই ছিল তটস্থ। কয়েকটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শুরু, এরপর একে একে ওবামাকেয়ার বাতিল, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ, মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে বাধা, সরকারে অচলাবস্থা তৈরি, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের উসকে দেওয়া এবং উগ্র ডানপন্থাকে সমর্থনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প আমেরিকান সমাজের অনুঘটকগুলোর রূপ বদলে দিয়েছেন।
ট্রাম্প তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার শিকার বানিয়েছেন করোনাভাইরাস মোকাবেলায়। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে তিন-চার মাস রাষ্ট্রীয় কাজে তার মন ছিল না। শেষের দুই মাস তিনি ভোট জালিয়াতির ভুয়া অভিযোগ আর মামলা করে কাটিয়েছেন। ওই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে মহামারী মারাত্মক রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ তার সমালোচকদের।
টিকা দেওয়া শুরু হলেও এখনও দেশটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন, মৃত্যু এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে ৪ লাখ। টিকাদানও গতি পায়নি। নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিলেও রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে ফেলা সম্ভব বলে অনেকে মনে করছেন না।
ট্রাম্প জামানায় যুক্তরাষ্ট্র বাইরের দুনিয়ার নেতৃত্ব থেকেও বেশ খানিকটা সরে এসেছে। এই সুযোগে প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েছে রাশিয়া ও চিনের।
তাতে কি? নিজের ওপর থেকে কখনোই ‘স্পটলাইট’ সরতে দেননি তিনি। কখনও ড্রোন-মিসাইল ছুড়ে, কখনও উল্টোপাল্টা কথা বলে, নিয়মিত টুইট করে, মিথ্যা বলে, অবস্থান বদলে অসংখ্যবার বিশ্বকে রীতিমত ঝাঁকুনি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বলে পরিচিত অনেক দেশকেও ট্রাম্প দূরে ঠেলে দিয়েছেন। ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১২ দেশের চুক্তি (টিপিপি) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতি টেনেছেন। ইউনেসকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছেন। নেটো জোটেরও ভালো সময় কাটেনি তার আমলে।
এভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা-জোট থেকে দূরে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একা করে ফেলেছেন ট্রাম্প। এখানেই শেষ নয়, ইরান, ফিলিস্তিনি, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, তাইওয়ান, কিউবা, উত্তর কোরিয়াসহ নানাক্ষেত্রে বিতর্কিত কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট রেখেই তিনি বিদায় হলেন।
দেড়শ বছরের পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ঘড়ির কাঁটা আস্তে ঘুরলে ট্রাম্প হয়ত আরও কিছু সময় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু না, সময় তার আপন গতিতেই চলেছে।
রয়টার্সপ্রথা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে ২০ জানুয়ারি মধ্যাহ্নে বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে পাশে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। এর মধ্য দিয়েই অভিষিক্ত হন নতুন প্রেসিডেন্ট।
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাছে হেরে যাওয়া প্রার্থীও তার পাশেই থাকেন সে সময়। কিন্তু এবার নির্বাচন নিয়ে তিক্ততায় সেই রেওয়াজ ভেঙেছেন ট্রাম্প।
অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি ইতিহাসে প্রথম নন। এমন কাণ্ড আগেও ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটেছিল ১৮৬৯ সালে বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের সময়। নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি তিনি।
১৮০১ সালে দ্বিতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস এবং ১৮২৯ সালে ষষ্ঠ প্রেসিডেন্টে জন কুইন্সি অ্যাডামসও নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে ছিলেন না। কুইন্সি ছিলেন জন অ্যাডামসের ছেলে।
ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত
ট্রাম্প আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি জো বাইডেনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না। এর মানে হচ্ছে, বাইডেনের জয়কে বৈধতা দিতে আগ্রহী নন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেকে বিদায়ী প্রেসিডেন্টের থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যে কারণে আপাতদৃষ্টিতে অভিষেক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের অনুপস্থিতিকে তেমন গুরুতর মনে না হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
প্রেসিডেন্টের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আমেরিকানদের কাছে কেবল লোক দেখানো একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় সব ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় দূরত্ব সরিয়ে রেখে দেশ এবং সমাজকে একসুতোয় বাঁধার দিন।
২০২০ সালের ৫ নভেম্বর, নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এনে প্রেস ব্রিফিং করার পর বিদায় নিচ্ছেন ট্রাম্প। ছবি রয়টার্স২০২০ সালের ৫ নভেম্বর, নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এনে প্রেস ব্রিফিং করার পর বিদায় নিচ্ছেন ট্রাম্প। ছবি রয়টার্সগত দুই সপ্তাহে দেশটিতে ঘটে যাওয়া নানান বিশৃঙ্খল ঘটনার পর নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের উপস্থিতি ছিল অনেকের কাছেই ভীষণরকম জরুরি। দেশকে দেখানো দরকার ছিল যে, সব তিক্ততার পরও দেশ- জাতির স্বার্থে বিদায়ী এবং নতুন প্রেসিডেন্ট এক মঞ্চে দাঁড়াতে পারেন।
কিন্তু ট্রাম্প সে দিকে না গিয়ে জাতির বিভক্তিকে আরও প্রকট করে তুলে ভবিষ্যতের জন্য রেখে যাচ্ছেন এক উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
বাজারে কথা আছে, ট্রাম্প আগামীবার ফের নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। অবশ্য তা নির্ভর করছে সেনেটে তার অভিশংসনের বিচারে কী হয়, তার উপর। দোষী সাব্যস্ত হলে, তার ক্ষমতায় ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি সফরে মহাত্মা গান্ধী মোমরিয়ালে ট্রাম্প। ছবি রয়টার্স২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি সফরে মহাত্মা গান্ধী মোমরিয়ালে ট্রাম্প। ছবি রয়টার্সমেয়াদের শেষ সময়ে এসে সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর সঙ্গে রেষারেষির জের ধরে ট্রাম্প সামনে মিডিয়া মুঘল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন, এমন সম্ভাবনার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
তবে ‘ক্ষেপাটে’ এই রিপাবলিকান কখন কী করে বসবেন, তা নিয়ে আগাম কিছু না বলাই ভালো। কারণ, তিনি ট্রাম্প।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ