আম উৎপাদন : সমস্যা ও সম্ভাবনা শীর্ষক সেমিনার

আপডেট: জুন ৬, ২০২৪, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


আমের মৌসুম এলেই তৎপর হয়ে ওঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী। এ মৌসুমি তৎপরতা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে গত কয়েক শতাব্দী ধরে। কারণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতিতে আমের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৬ মাসের রুটি রোজগারের ব্যবস্থা হয় এই আম থেকেই। সুমিষ্ট, সুস্বাদু এবং দেশের সর্বোচ্চ আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম যে কোনো বিচারেই। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী স্বপ্ন দেখে আমের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে। আম রপ্তানি হবে, প্রক্রিয়াজাত হবে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। সম্প্রতি সেই আম নিয়েই সেমিনার হয়ে গেল ঢাকায়। সেমিনারের আয়োজন করেছিল ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।

সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি মু জিয়াউর রহমান, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ও ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সমিতির সভাপতি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড, শেখ মহাম্মদ বখতিয়ার এবং বাংলাদেশ এগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারাস এসোসিয়েসনের সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে কি-নোট পেপার উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক ড. মো. গলাম রাব্বানী এবং মুখ্য আলোচক ছিলেন আঞ্চলিক উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুখলেসুর রহমান।

এই দু’জনের গবেষণালব্ধ সুদীর্ঘ বক্তব্যে আমের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আসে। তারপরেও এর বাইরে বেশ কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন অনুষ্ঠানে আগত আমচাষী, রপ্তানিকারক, উদ্যোক্তা এবং দর্শকগণ। যেমন ১৯৮৫ সালে খুব যৌক্তিকভাবে আমের উন্নয়নের জন্যই আম গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের প্রাণ কেন্দ্রে। কিছুদিন পরে তা হয়ে গেল জাতীয় উদ্যানতত্ব ও গবেষণা কেন্দ্র। এ পরিবর্তনের যে কোনো কারণই দেখানো হোক না কেন তা হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে উপেক্ষা করা। এ নামকরণ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পরাজয় হবে ভেবে অটল রয়েছে। তাহলে সিলেটের লেবু গবেষণা কেন্দ্র যা দেশের অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব রাখে না তা কিভাবে ওই নামেই এখনো বহাল আছে। এ থেকে বোঝা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ।

প্রায় ৪ বছর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট ও ডিজাইন বিভাগ প্রভাবিত হয়ে রাজশাহীকে ফজলি আমের জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দেয়। এ খবর পেয়ে জেলাবাসী চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি এসোসিয়েসনের উদ্যোগে পেটেন্ট ও ডিজাইন বিভাগে মামলা দায়ের করে। শুনানি শেষে উক্ত বিভাগ চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ফজলি আমের জিআই স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু অত্যন্ত খোড়া ও দুর্বল যুক্তিতে রাজশাহীকে এর অংশীদার করে রেখে দেয়। এটাও বিমাতাসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

জানা গেছে, সম্প্রতি ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ জেলায় ৪টি কোয়ারেন্টাইন অফিস স্থাপনের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং রাজশাহীর নাম নেই। বরং শোনা গেছে কলোরোয়ার নাম। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই কোয়ারেন্টাইন অফিস না থাকায় এখানকার আম রপ্তানিকারকদের আম পরিক্ষার জন্য ঢাকার শ্যামপুরেরে যেতে হয়। এতে যেমন সময় ও অর্থের অপচয় হয় তেমনি আম নষ্ট হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা থাকে। আর হয়রানি তো হতেই হয়। তাই এর চেয়ে বিমাতাসুলভ আচরণ আর কী হতে পারে!

বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, সমগ্র দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্য হয়। যা দেশের অর্থনীতিতে সামান্য হলেও অবদান রাখে। কিন্তু আমের অর্থনীতি বিষয়ে কোনো লেখা বা আলোচনা হতে দেখা যায় না। এছাড়া কিভাবে আমের অর্থনীতিকে টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তর করা যায় সেক্ষেত্রেও কোনো ভাবনা আজও বিকশিত হয়নি।
সমগ্র দেশে আমের জমির পরিমাণ গাছের সংখ্যা উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য আসে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সেই সনাতনি যুগের পদ্ধতিকেই মেনে চলেছে।

সময়ের সাথে সাথে এসব পরিসংখ্যান পরিবর্তন হচ্ছে যাকে কিছু কমাবাড়া করে পরিসংখ্যান ব্যুরো হাজির করে যা নিয়ে রীতিমত বিতর্ক আছে তা যেমন সরকারি পর্যায়ে তেমনি বেসরকারি পর্যায়েও। ফলে জেলা ভিত্তিক আম সম্পর্কিত মূল্যায়ন ঠিকমত হয় না এমনকি আমের ঐতিহাসিক ভিত্তিকেও বিবেচনায় আনা হয় না। তাই আমের স্টেক হোল্ডারদের ও কৃষি বিভাগকে সংযুক্ত করে মৌজাওয়ারি একটি নতুন জরিপ অতীব জরুরি।

আম একটি সংবেদনশীল পণ্য। এজন্য আমসমৃদ্ধ সকল জেলায় আম সংরক্ষণাগার এবং রপ্তানির জন্য প্যাকেজিং হাউস নির্মাণ জরুরি। দীর্ঘকাল ধরে যে আবেদন করে আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ দেশে অনুৎপাদনশীল খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। তাছাড়া আম সংরক্ষণাগার ও প্যাকেজিং হাউস কোনো মেগা প্রকল্পও নয়।

আম উৎপাদনকারী চাষী বা বাগান মালিকরা যখন তাদের অনেক পরিশ্রমলব্ধ আম আড়তে বিক্রি করতে যায় তখন আড়তদারেরা কাঁচা মালের অজুহাতে ছোট আম ফেলে দেয়, অন্যদিকে মণে ৪০ কেজির স্থলে ৫০ কেজি পর্যন্ত ওজনে নেয়। যা ভোক্তার কোনো কাজে লাগে না। মধ্যস্বত্ত্বভোগী আড়তদারেরা সেই আর্থিক সুবিধা ভোগ করে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে। গত দশ বছর যাবৎ এর প্রতিবাদ হচ্ছে, প্রশাসন ও পুলিশকে বিষয়টি বার বার অবহিত করা হয়েছে- কিন্তু প্রতিকার মিলছে না। বিষয়টি শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয় এবং শুধু আমফল নয়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই অবিচার চলছে। এ ব্যাপারে সারা দেশের জন্য একটি আইন এবং তার প্রয়োগ জরুররি।

আমের আটির ভেতরের শাঁস খুবই মুল্যবান সম্পদ। যা থেকে বেকারিতে ব্যবহৃত পেস্ট এবং ভোজ্য তেল উৎপাদন হতে পারে। বিভিন্ন দেশে তা ব্যবহার হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নাই।

বাংলাদেশ এগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারাস এসোসিয়েসনের সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে মূলত ভারত থেকে যে কীটনাশক আসে সেটাই আমের বালাই দমনে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে সেই কীটনাশক কতটা স্বাস্থ্যসম্মত তা নিশ্চিত করার জন্য দেশে পরীক্ষাগার নেই। তবে তাতে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল লক্ষ্যণীয়। শুধু তাই নয়, ভারত এই কীটনাশক বিক্রি করলেও তারা ব্যবহার করে না। ফলে বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক অবস্থায় দাঁড়িয়ে অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো জানে বাংলাদেশ কোন কীটনাশক ও হরমোন ব্যবহার করে সুতরাং তারা বাংলাদেশের আম গ্রহণ করবে না। এমনকি ফাইটোস্যানেটরি সার্টিফিকেট দিলেও না। এ সমস্যার সমাধান না হলে ইউরোপে আম রপ্তানি করাও সম্ভব নয়। সে ব্যাপারে তিনি কোনো পরামর্শ দেননি।

এদিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এর নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ মহাম্মদ বখতিয়ার বলেন, এঅচ(মড়ড়ফ ধমৎরপঁষঃঁৎব ঢ়ৎধপঃরপব) মেনে চলে আম উৎপাদন করলে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। সুতরাং এ ব্যাপারে যারা আগ্রহী হবেন তারা কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাথে যোগাযোগ করবেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু আমচাষি ইতোপুর্বে এঅচ অনুসরণ করে আম উৎপাদন করেও কোয়ারেন্টাইনে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাছাড়া রপ্তানি করতে হলে যেমন- বাংলাদেশের কোয়ারেন্টাইনের মুখোমুখি হতে হবে তেমনি ইউরোপে পৌঁছা মাত্র সেখানকার কোয়ারেন্টাইনের মুখামুখি হতে হবে। এই দীর্ঘ প্রতিবন্ধকতা কীভাবে অতিক্রম করা যেতে পারে সে ব্যাপারে কোনো পরামর্শ পাওয়া যায়নি ওই অনুষ্ঠানে। তবে আম প্রক্রিয়াজাতকরণে পিএইচডি করার জন্য খুব শিগগিরই ৬ জন কৃষিবিদকে ভারতে পাঠানো হবে।

অনুষ্ঠানে জনৈক উদ্যোক্তা মুঞ্জের আলম মানিক তার কারখানায় প্রক্রিয়াজাত আমের গুড়া, আমতা। আমের হালুয়া বরফি খুব সুন্দর মোড়কে উপস্থাপন করেন। প্রত্যেক দর্শককে খেতে দেন। যা ভীষণ প্রশংসিত হয়। তিনি বড় আকারে প্রক্রিয়াজাতকরণে এবং দেশীয় বাজারে তা পাঠাবেন খুব শিগগিরই। সেইসাথে তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেন যদি তাকে আম প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয় তাহলে আরও ভালো করবেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী এবং এখানে আছে তিন শতাধিক আমের জাত। অন্যান্য জেলায় ৮/১০ জাতের বেশি নেই। সেহেতু আমের উন্নয়ন করার জন্য এখানে একটি ম্যাঙ্গো ইনিস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। আর তেমন পরিবেশও আছে কানসাট রাজার বাগানে। বর্তমানে যা ম্যাঙ্গো মিউজিয়াম হিসেবে পরিচিত। এখানে শতাধিক জাতের নতুন ও পুরানো আম গাছ রয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক

Exit mobile version