আর কাদা ছোড়াছুড়ি নয়, আমরা এক হই

আপডেট: April 28, 2020, 12:20 am

গোলাম কবির


একমাত্র মানুষই প্রকৃতির প্রতিপক্ষ। অনাদিকাল ধরে এই যে উদারপ্রকৃতি জগৎ-সংসারকে লালন করে আসছে, তার বিনিময়ে সে তো কোনো প্রতিদান চায়নি। রাবীন্দ্রিক ভাষায় সে যেন বলে আসছে, ‘তার বদলে আমি চাই নে কোনো দান।’ কেবল চেয়েছে নিজের বিন্যাস সমুন্নত রেখে সৃষ্টিজগৎকে সন্তান স্নেহে ধারণ করে রাখতে। মনে হয় মানুষ নামের প্রজাতিকে প্রকৃতি সন্তানাধিক স্নেহে বক্ষে আগলিয়ে রাখতে চেয়েছে নিরন্তর। মানুষ তার মূল্য দেয়নি। এমটিই হয়, সুলভ কোনো কিছুর যথার্থ কজন বুঝে?
প্রকৃতি সর্বংসহা বলে মানবসৃষ্ট প্রকৃতি বিরোধী কর্মকাণ্ডকে বহন করে এসেছে। তবে স্মর্তব্য, সহ্যের একটা সীমা আছে। তা লঙ্ঘিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাঁধ ভেঙে যায়। সমাজ-ধর্মের ইতিহাসে ‘মহাপ্লাবন’ থেকে শুরু করে যুগে যুগে মানুষ রুদ্র প্রকৃতির যত রূপ প্রত্যক্ষ করেছে তার মূলে রয়েছে কৃতঘ্ন মানুষের স্বকৃত অপকর্ম। একুশ শতকের সূচনা থেকে লক্ষ্য করা গেছে, কিছু বিবেকবান মানুষ প্রকৃতির স্বাভাবিকত্ব বজায় রাখার জন্য আন্দোলন করে আসছেন। এই কল্যাণ সাধনের মিছিলে সুইডিস কিশোরী গ্রেটা অনন্য। শক্তিদম্ভে কিছু ব্যক্তি শান্তিপ্রিয় মানুষের সুপরামর্শকে বৃদ্ধাস্পুষ্ঠ প্রদর্শন করে চলেছে। বুঝেনি, প্রকৃতির অসীম শক্তির কাছে তারা খড়কুটোও নয়। প্রকৃতি গোঁয়ারদের দাপটের এমনি জবাব দেয়া শুরু করেছে যে সৌরমণ্ডলের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রহটি তার শ্যামলিমা হারিয়ে মাটির কাছাকাছি মানব প্রজাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দাম্ভিক মানুষ বিষয়টি আমলে না নিয়ে পরস্পরের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করেছে। বড়ত্ব নিয়ে হাস্যকর বড়ায় শুরু করেছে। আসলে এসব প্রলাপ এক ধরনের হীনমন্যতা! মানব মনের সাধারণ প্রবণতা হলো নিজেকে সেরা ভাবা। অন্যরা তার কাছে নস্যি। এর চেয়ে মূঢ়তা আর কী হতে পারে?
আমাদের দেশে ডাক্তারদের সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। বিষয়টি স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা। আপেক্ষিকও বটে। এখন শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে তিক্ততার সৃষ্টি, তা মনোবৈকল্যের বা মনোবিকারের জন্য। এটা নিজেকে সেরা ভাবার বিষকল।
একদা মাধ্যমিক পর্যন্ত সমন্বিত পাঠ্যবিষয় ছিলো। ১৯৬২ সাল থেকে তা বহুমুখি করা হয়। তখন থেকে মেধা শ্রেণিবিন্যস্ত হতে থাকে। ১৯৭১ এর স্বাধীনতার পর ভালোফল করা শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। কারণ বিজ্ঞান পড়লে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায়। এতে কর্মসংস্থান মিলে, দেশে-বিদেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ুয়াদের ব্যতিক্রম ছাড়া, অনেকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার চেষ্টা করেনি তা নয়। প্রবণতা যেভাবেই সৃষ্টি হোক, এখনকার বিজ্ঞান পড়ুয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারগণ তুলনামূলকভাবে মেধাবী। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে আগতদের আমরা এ ধারণার বাইরে রাখতে চাই। (তবে বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ না পাওয়া কেউ কেউ বিস্ময়কর মেধাবী।) এরা নিজেদের উত্তম ভাবতে পারেন। কেউ উত্তম হলে কাউকে অধম হতে হয়। এ দ্বন্দ্ব অনাদিকালের। দুঃখের বিষয় আমরা কেউ মধ্যম হতে রাজি নই। হলে অনেক দ্বন্দ্বের অবসান হয়। ভয়াবহ ভাইরাস জর্জরিত এই সময়ে ডাক্তারদের অবদান বোধকরি খাটো করে দেখার অবকাশ কম। শোনা যায়, তারা যথার্থ মর্যাদা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত।
সমাজে কারো অবদান তুচ্ছ নয়। সে জন্য সবার কাছে সব শ্রেণির মানুষের যথার্থ সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা দীর্ঘকাল বিজাতীয় শাসনে পদানত থেকেছি। তারা শাসিতদের ভাবতো সেবাদাস। দুখের বিষয় উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা সেই মনোভাব থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এর কারণ প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়, ‘ব্যাধি সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়।’ বঙ্গবন্ধু এটা বুঝেছিলেন বলে সেই মানসিকতা বদলাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সব বিতর্ক ও আভিজাত্যের হীনমন্যতা বিসর্জন দিয়ে বিশ্বজোড়া অদৃশ্য-অপ্রতিরোধ্য করোনা মরণব্যাধি থেকে মানুষ কীভাবে মুক্ত হতে পারবে, তা নিয়ে সকলে মিলে এক হয়ে কর্মযজ্ঞে অবতীর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। আর জয়ের জন্য বিভক্তি নয়, ঐক্য কাম্য। আস্তিক হোক আর না হোক, মানতেই হবে ঐক্যের বিকল্প নেই। করোনার অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন প্রতিহত করতে আজকের দিনে মানব সেবাকে শ্রেষ্ঠ ত্যাগ বলে মানতে হবে। ডাক্তারগণ একাজে অনেকটা সম্পৃক্ত; কিন্তু বেশ কিছু সেবাদানকারী প্রচারমাধ্যমে ছবি পাঠাতেই ব্যস্ত। বিশ্বজোড়া এই দুর্দিনে আমরা পরচর্চায় যাব না। একান্তই ভাববো, স্বস্তি কেড়ে নেয়া এই সর্বসংহারী মরণব্যাধি হতে বিশ্বকে কিভাবে মুক্ত করা যায়।
লক্ষ্য করা যাচ্ছে, করোনা রোগক্রান্ত মানুষের সাথে কর্মহীন অনাহারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ত্রাণ আত্মসাতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আবুল মনসুর আহমদ দুঃখের সাথে তা উল্লেখ করে গেছেন (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর গ্রন্থে)। বঙ্গবন্ধুকেও সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। তিনি প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশও করেছিলেন। দুর্বৃত্তরা তাঁকে প্রশমিত করার সময় দেয়নি।
উমাইয়া যুগের আরবি সাহিত্যের একটি লেখা পড়েছিলাম গতশতকের সেই ষাটের দশকে। লেখাটির মূল কথা ছিলোÑ কোনো সংকট দেখা দিলে স্বার্থের বিভেদ ভুলে গিয়ে হিংস্র প্রাণিকুল এক হয়। ফলে শক্ত আগ্রাসীকেও প্রতিহত করে। আমরা মানুষ, সৃষ্টির সেরা, পারবো না কেন?
সারা বিশ্ব অথৈ সংকটে। কেবল করোনা আগ্রাসনে নয়, কর্মহীন-অন্নহীন মানুষ সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যের কারণে মৃত্যু বিভীষিকার শিকার হতে চলেছে। এর মূল উৎপাটনে সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি নয় কি? উপনিষদের ঋষিদের আর কোরানের বাণী সমুন্নত রেখে আমরা এক হই। সমস্বরে উচ্চারণ করি, সংকট তফাৎ যাক; ফুল্লশ্যামল ধরা ফিরে আসুক। আমরা মিলন আনন্দে অবগাহন করি।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ