আ’লীগের গ্রুপিং-দ্বন্দ্বে নাটোর উত্তাল, দুই যুবলীগ কর্মীর ওপর হামলা

আপডেট: মে ১৪, ২০২২, ১১:০৮ অপরাহ্ণ

নাটোর প্রতিনিধি:


বিএনপির ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশ শেষে বাড়ি ফেরার পথে আওয়ামী-লীগের গ্রুপিং-দ্বন্দ্বে নিজ দলের সন্ত্রাসীদের হামলায় নাটোরে দুই যুবলীগ কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৩ মে) রাত আটটার দিকে নাটোর সদর উপজেলার একডালা বাবুর পুকুরপাড় এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে একই ধরনের হামলায় দুই যুবলীগ কর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

অন্যদিকে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য নাটোর জেলা আওয়ামী-লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল (এমপি) ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম রমজান দলের এ দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে ক্রমেই রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মাঠ উত্তপ্ত হওয়ার মূলত কারণ হলো, জেলা সদরে পাঁচটি সংগঠন দখল নিয়ে । এ সংগঠনগুলো হলো, জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপ, বাস মালিক সমিতি, ট্রাক-ট্যাঙ্কলরি কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন ও দলিল লেখক সমিতি ।

জানা যায়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি দলের পদ হারিয়ে র্দীঘ আড়াই মাস কানাডায় প্রবাস যাপনের পর দেশে সম্প্রতি দেশে ফিরেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল (এমপি) এবং তার অনুসারী আওয়ামী লীগের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতারা মাঠে নেমে সভা শোডাউন করছেন।

সংসদ সদস্য শিমুল অনুসারীরা অভিযোগ করেছেন, জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন জবরদখল ও সেগুলো থেকে লাখ টাকা চাঁদাবাজির। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম রমজানের অনুসারীদের দ্বারা দখল হওয়া এসব সংগঠন পূর্বের নেতৃত্বকে ফিরিয়ে না দিলে পাল্টা দখলের হুঁশিয়ারি দেন তারা।

নাটোর থানার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় নাটোর স্টেশনবাজার এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে একডালা এলাকায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন যুবলীগ কর্মী আবুল হোসেন (৩৬) (ইউপি সদস্য) ও লিটন আলী (৩২)। রাত আটটার দিকে তারা বাবুর পুকুরপাড় এলাকায় পৌঁছালে সন্ত্রাসীরা তাদের এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন।

রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের প্রথমে নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে তারা চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, তাদের দুজনের শরীরে অনেক কাটা জখম আছে।

তবে লিটন আলীর অবস্থা বেশি সংকটাপূর্ণ। এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নাটোর রেলগেট এলাকায় সন্ত্রাসীরা যুবলীগ কর্মী এস এম মাসুদ পারভেজ (৪৭) ও বুলবুল হোসেনকে (৪০) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেন। তারা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় সংগঠন দখলের প্রতিবাদে সংসদ সদস্য শিমুল অনুসারী যুবলীগ ও রমজান অনুসারী দুই যুবলীগ কর্মীর উপর শিমুল অনুসারী হামলাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে শহরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় একই সময় বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে দুই গ্রুপ।

পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার শঙ্কায় পুলিশ কোনো গ্রুপকেই সেখানে সমাবেশ করতে না দেয়ায় শিমুল অনুসারীরা মিছিল নিয়ে শহরের কানাইখালি এসে রমজানের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। একই স্থানে সন্ধ্যা ৭টায় একই কর্মসূচি পালনের পুর্ব ঘোষণা ছিল রমজান অনুসারীদের। তবে সংসদ সদস্য শিমুল অনুসারীরা হঠাৎ করেই নিজেদর কর্মসুচি শেষে সেখানে অবস্থানের ঘোষণা দিলে আকঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আধঘণ্টা অবস্থান শেষে তারা ওই স্থান ত্যাগ করে।

এর কিছু সময় পর রমজান অনুসারীরা বিশার মোটর শোডাউন নিয়ে শিমুল অনুসারী যুবলীগ সভাপতির ব্যক্তিগত কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে চলে যায়। দুই পক্ষের কর্মসূচির সময় এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিলো।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম রমজান বলেন, পর পর দুই বার সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী-লীগের সাধারন সম্পাদক হওয়ায় শফিকুল ইসলাম শিমুল তার পরিবার ও অনুসারীদের দ্বারা সবগুলো পেশাজীবী সংগঠন দখল করে ছিলেন। সেই সংগঠনগুলো দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত পেশাজীবীদের ফিরিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

এতে পেশাজীবীদের কাছে দলের সম্মান ও ভোট বেড়েছে। একজন সংসদ সদস্য পরিবারতন্ত্র কায়েম করে দলের সম্মান ক্ষুন্ন করেছিলেন আর আওয়ামী লীগ তা ফিরিয়ে দিয়ে দলকে সম্মানিত করেছে। এটা যারা মানতে পারছে না তারাই রাস্তায় নেমে জেলা কমিটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে যে কারো বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
এব্যাপারে নাটোর জেলা আওয়ামী-লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল (এমপি) এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সন্ধ্যার পরে কথা বলবেন বলে এ প্রতিবেদককে জানান। তবে জেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বাসিরুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের নামে বাস মালিক সমিতিতে প্রহসন আয়োজন করে নিজের লোকদের বসিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

তাদের হুমকির কারণে দুইটি ছাড়া সমিতির বাকি পদগুলোতে সাধারণ বাস মালিকরা প্রার্থী হতে পারেন নি। আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রকৃত মালিকদের হাতে সমিতি ফিরিয়ে না দিলে কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।

নাটোর থানার অফিসর ইনচাার্জ (ওসি) নাছিম আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের মধ্যে দুটি পক্ষ এসব ঘটনার জন্য একে অন্যকে দায়ী করছে। পুলিশ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিবেন।
নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার শাহা বলেন, নাটোর শান্তি-শৃঙ্খলাার নাটোর।

সহিংসতার নাটোর ছিলনা, হঠাৎ করে গ্রুপিং রাজনীতির কারণে পর পর কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একাধিক মামলাও হয়েছে। প্রতিটা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আমরা আইনগত ভাবে ব্যবস্থা নেব।