আলুর বাম্পার ফলনে উচ্ছ্বসিত কৃষক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২ ভাগ বেশি উৎপাদন

আপডেট: মার্চ ১৫, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

তানজিমুল হক



চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলনে উচ্ছ্বসিত রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক। অনুকূল আবহাওয়া, ভালোমানের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতার কারণে বাম্পার ফলন সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে জমি থেকে শতকরা ৭১ ভাগ আলু উত্তোলন করা হয়েছে। উত্তোলনকৃত আলুর ফলনের হার হেক্টরপ্রতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বর্তমান মৌসুমে আলুর ফলন শতকরা ২২ ভাগ বেশি হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
তবে দাম নিয়ে কিছুটা চিন্তিত রয়েছেন কৃষক। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে একশ কেজির বস্তাতে প্রায় দুইশ টাকা করে আলুর দাম কমেছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে যেসব কৃষক আলুচাষ করেন তাদের বক্তব্য, সামনে রমজান মাসেই আলুর দাম বেড়ে যাবে। ফলে কৃষকরা আলুচাষ করে লোকসানের যে আশঙ্কা করছেন, তার সম্ভাবনা থাকবে না। এক্ষেত্রে কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে। আর অধিক ফলন হবার কারণে দাম কিছুটা কম থাকলেও লোকসানের কোন আশঙ্কা নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, রাজশাহীর অতিরিক্ত উপপরিচালক কেজেএম আবদুল আউয়াল জানান, রাজশাহী জেলায় চলতি মৌসুমে আলুচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩৬ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩২ হাজার ৫৩৫ এবং স্থানীয় জাতের ৪ হাজার ৩৮০ হেক্টর। কিন্তু দুই জাতের আলুচাষ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এর পরিমাণ ৪৩ হাজার ৪৮১ হেক্টর। এর ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে শতকরা ২১ ভাগ জমিতে বেশি আলুচাষ হয়েছে। এছাড়া গত মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে হেক্টর প্রতি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৯ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন। কিন্তু বর্তমানে যেসব জমি থেকে আলু উত্তোলন করা হয়েছে তাতে উৎপাদনের গড় হার হেক্টরপ্রতি ২২ দশমিক ৩৬ মেট্রিক টন। আর চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭ লাখ ২৫ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। এছাড়া বর্তমান সময় পর্যন্ত স্থানীয় জাতের আলু শতকরা একশ ভাগ জমি থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। আর উফশী জাতের আলু উত্তোলন করা হয়েছে শতকরা ৬৮ ভাগ। দুই জাত মিলিয়ে জমি থেকে এ পর্যন্ত আলু উত্তোলন করা হয়েছে শতকরা ৭১ দশমিক ২ ভাগ।
এদিকে রাজশাহীর নয় উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলুর উৎপাদন হয় বাগমারা, মোহনপুর, তানোর, পুঠিয়া ও বাঘা উপজেলায়। অন্য উপজেলাগুলোতেও আলুর উৎপাদন হলে তা তুলনামূলকভাবে কম। চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন ও দাম নিয়ে কথা হয় রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষ্ণপুর-পাঠাকাটা মাঠের মডেল আলুচাষি কৃষক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে।
তিনি বলেন, আমি এ মৌসুমে ১২০ বিঘা জমিতে আলুচাষ করেছি। এখন জমি থেকে আলু উত্তোলন করা হচ্ছে। নারী-পুরুষ মিলে প্রায় আড়াইশ জন কৃষিশ্রমিক জমি থেকে আলু তুলছেন। এ পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০ বিঘা জমির আলু উত্তোলন শেষ হয়েছে। বিঘাপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ বস্তা করে আলু পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি বস্তায় আলুর পরিমাণ থাকছে একশ কেজি করে।
আবদুর রাজ্জাক জানান, নিজস্ব বীজ থাকার কারণে অন্যদের চেয়ে আমার উৎপাদন ব্যয় কম হয়েছে। বিঘাপ্রতি নিজস্ব জমিতে ২০ হাজার এবং লিজ নেয়া জমিতে উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। বর্তমানে আলুর বাজার বস্তাপ্রতি আটশ থেকে সাড়ে আটশ টাকা। এ হিসেবে বর্তমানে প্রতিবিঘা জমিতে যে পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়েছে, তা বাজারে বিক্রি করলে আট থেকে দশ হাজার টাকা লাভ হবে।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শিকদাড়ি এলাকার আলুচাষী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি বাণিজ্যিকভাবে আলুচাষ করি। এবছর প্রায় ৮০ বিঘা জমিতে আলুচাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে আলুর দাম ছিল একশ কেজির বস্তা এক হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বস্তাপ্রতি দাম কমে আটশ থেকে সাড়ে আটশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র আলু চাষিরা এর ফলে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে লোকসান হবে না। এজন্য কৃষকদের ধৈর্য্য ধরতে হবে। সামনে রমজান মাসে আলুর দাম বেড়ে যাবে। তাই লাভবান হবার জন্য কৃষকদের কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করতে হবে। আর আলু সংরক্ষণ করলেই কৃষকদের লাভের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজশাহী অঞ্চলে আলুচাষ সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, এ অঞ্চল এইজেড-১১ অর্থাৎ গাঙ্গীয় পাললিক ভূমির অর্ন্তগত। পদ্মা নদীর অববাহিকায় পলি পড়ার কারণে এ অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত উর্বর। আর এ উর্বর মাটি আলু চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। আর চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই।
তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে যারা আলুচাষ করেন তারা অত্যন্ত সচেতন। আর তাদের চাষ পদ্ধতি দেখে ক্ষুদ্র চাষিরাও লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত কৃষকদের পাশে থেকে পরামর্শ দিয়েছেন। আর এ কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন বেশি হবে। ফলে কৃষক লাভবান হবেন। এ অঞ্চলের অর্থনীতি হয়ে উঠবে আরো সমৃদ্ধশালী।