আলোর মায়া

আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

এলিজা খাতুন:


সন্ধ্যার পর মিল থেকে বাড়ি ফিরেছে আফসার। কাঠের মিলে কাঠ ফাড়ার কাজ করে। ঘরে ফিরে পেটে দানা দিয়ে গড়াগড়ি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে প্রায় দিনই। আজ শেফালী এখনও ভাত বেড়ে দেয়নি। হাতের পুতুলটা অর্ধেকের বেশি হয়ে এসেছে ; হাতের সেলাইয়ের ফিনিশিং বাকি। গার্মেন্টসের টুকরো বাতিল ছাট কাপড় এনে বিভিন্ন শো-রুমের অর্ডার অনুযায়ী পুতুল বানিয়ে ডেলিভারী দেয় ; সপ্তাহে একবস্তা টুকরো কাপড়ের পুতুল বানাতে পারলে মজুরি বাবদ শ’তিনেক টাকা হয়। আফসার ভাবে- ‘খাওয়া-পরা-ঔষধে একজনের আয়ে সংসারে টানাটানি, শেফালীর বাড়তি আয় হলে তো ভালোই হয়’ পুতুল সেলাই শেষ করে উঠেই থালায় ভাত বেড়ে দেয় শেফালী। আফসার ঘরের ভেতরে চৌকিতে বসেই খাওয়া শুরু করে। আফসার লক্ষ্য করে -ঘরের পেছনে সাইকেল থামার শব্দে শেফালী চঞ্চল হয়ে ওঠে ; দুহাতে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে উঠে যায় ঘরের পেছনে। আফসার গালের ভেতরের ভাত নাড়াচাড়ায় জিহ্বার এপাশ ওপাশ করতে করতে আড় চোখে দেখলো। ইদানিং শেফালী আর শংকর দুজনের এখানে সেখানে আবডালে দাঁড়িয়ে কথা বলা নিয়ে এলাকার অনেকেই ফিসফাস করে ; ইঙ্গিতে খোঁচাও দেয় আফসারকে ; কাজের সঙ্গি সাথিরাও জিরোনোর সময় রসিয়ে দু’কথা শুনিয়ে দেয়। বিশ্বাস করতে মন সাঁয় দেয় না আফসারের। দুজনের কথোপকথন চাঁচের বেড়া ভেদ করে আফসারের কানে আসে, খাওয়ার গতিও কমে যায় তার। শেফালী বলল -কতদূর এগোলে শংকর ? টাকা জোগাড় হয়েছে? শংকরের উত্তর -কেনাকাটাও শেষ, তোমার পছন্দমত লালশাড়ি, শাখা পলা, সিঁদুর কেনা হয়েছে সবই। পায়ের মাপ আন্দাজ করে একজোড়া স্যান্ডেলও। শেফালী মুখে কাপড় গুঁজে খুকখুক করে হাসতে হাসতে বলল, তাইলে তো হয়েই গেলো, সোনো পাউডার, আলতা, চিরুনি ওসব তো তোমার পেটরার মদ্দি রয়েছে। আর বাকি আছে কিছু ! কিন্তু ভয় হচ্ছে যে শংকর! কাজ শেষ হওয়ার আগে যদি কেউ টের পায় ? কেউ যদি ব্যাগড়া বাধায়!
-টেনশন করবা না মোটেও, কাল সন্ধ্যার আগে আগে মন্দিরে চলে আসবা। পারলে কিছু টাকা নিও সাথে।-তোমার চিন্তা করেই তো আগে থেকে গোছায়ে রাখিছি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আফসারের ; অন্যদিকে আশ্চর্য হচ্ছে, কিছুতেই আফসারের মাথায় আসছে না- এসব কথাবার্তা তার কান পর্যন্ত চলে আসতে পারে ভেবেও শেফালী সতর্কে নিচু স্বরে কথা বলছে না কেন! শেফালীর কা-জ্ঞান সব কি ধুলিসাৎ হলো! লোকজনের কানাঘুষা কি তাহলে সত্যি ! উহ্ ! শেষে কিনা একটা হিন্দুর সাথে ! না না তা হয় কী করে ! কিন্তু ক’মাস ধরে সপ্তাহের ওর আয়ের তিনশ টাকা জমাচ্ছে কেন ! মনে পড়ে দু’মাস আগের কথা- একটা টর্চ লাইটের আবদার করেছিল আফসার, পুরোনোটায় আলো হয় না ভালো। শেফালী মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে সাস্ত¡না দিয়েছিল- ক’মাস পরে দেবো।
গভীর রাত ; আফসারের বুকের পরে শেফালীর অসাড় হাত, যেন মুঠোয় আঁকড়ে ধরে আছে পরম নির্ভরতা। আফসারের দিকে ফিরে শুয়ে আছে শেফালী, অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এই পবিত্র মুখখান এতটা জঘণ্য হতে পারে ! মেলাতে পারছে না আফসার। সারারাত ঘুম হলো না আফসারের , সিদ্ধান্তু নেয় কিছু বলবে না শেফালীকে, দেখা যাক কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত।
পরদিন বিকেলে কাঠের মিল থেকে একটু আগে আগেই বাড়ি ফেরে আফসার। শেফালী ভাত দেবার কথা বললে- আফসার গম্ভীর স্বরে ‘এখন খাবো না’ এ কথা বলে ঘরে ঢুকে চৌকিতে শোয়। ‘আচ্ছা যখন খাবা হাড়ি থেকে বেড়ে নিও’ -বলে শেফালী আফসারের দিকে এগিয়ে এসে কপালে হাত রেখে বুঝলো তার গা বেশ গরম। ফেরার সময় মোড়ের দোকান থেকে দুটো জ্বরের ট্যাবলেট নিয়ে আসবে, এটুকু ভাবতে ভাবতে চালের বাতায় গোঁজা ছোট্ট আয়না টেনে বারান্দার খুঁটিতে ঠেকা দিয়ে চুল আঁচড়ায় শেফালী। ঘরে ঢুকে তেজপাতার কৌটা খুলে টাকা মুঠে নেয় ; আফসার খেয়াল করে। শেফালী টাকা বুকে গুঁজে চৌকাঠ পার হয়। আফসারও বের হয় কিছুক্ষণের মধ্যে। বসতি ছেড়ে মন্দিরের নির্জন পথ, গাছগাছালির আড়ালে থেমে থেমে আফসার মন্দিরে পৌঁছে যায়। বেদির গা ঘেঁষে তুলসি ঝোপের পাশে দাঁড়ায় ; আবছা অন্ধকার জুড়ে বসা সন্ধ্যায় দূরের কাউকে স্পষ্ট দেখা যায় না। ভেতরে আলো, পুরোহিত বসা। কিন্তু একি! লাল শাড়ি জড়ানো আলো রাণী আর শংকর মুখোমুখি বসা, একদিকে আলো রাণীর পাশে ওর খালা, অন্যপাশে শংকরের অভিভাবক পক্ষ শেফালী! পুরহিতের প্রস্তুতি নেওয়ার অবকাশে, শংকরের হাতে আলো রাণীর হাত সোঁপে দিয়ে খালার অনুনয়- ‘নেহাত আমরা ওপারে চলে যাচ্ছি বাবা, আসছে পুজোয় প্রতিমা বিসর্জনে এপার-ওপার দু’পারেই গঙ্গার ঘাট ছেড়ে দেবে, মাঝ-নদীতে দলের সঙ্গে মিশে পার হয়ে যাবো। আলো রাণীর বাপের ভিটেটুকু থেকে গেলো ! সেয়ানা মেয়ে একলা ঘরে থুয়ে যাই কী করে ? মুচি পাড়ার ঋষি-সুখচরণের বখাটে ছাবাল নিতাই চরণ আঠার মতো লেগে রয়েছে, তাও যদি এমন আশ্বাস পাতাম যে- আলো রাণীকে নিয়ে ভালোভাবে ঘর করবে, আপত্তি ছেলো না। চোক্কের সামনে এট্টার পর এট্টা মেয়ে নে এসলো, একজনেরেও তো রাখতি পারলো না। আলো’রে তোমার হাতে দিচ্ছি বাপ, দেইখো ’
শংকর বলল -‘সুখ চরণের ছাবাল নিতাই যখন যারে ঘরে এনে থুয়েলো, তাগের কারোরই রাখার জন্যি নিয়ে আসেনি মাসি। আর ওসব মেয়ে কোন্ এলাকার তাও কেউ জানে না এখনও। শুনিছি কাজ দেবার কন্টাকে নে আসে, তারপর ঘাট পার করে বন্দরে পৌঁছায় দেওয়া পর্যন্ত নিতাই চরণের দায়িত্ব। নিতাই চরণ উকেনে নিত্যচন্দ্র হয়েছে ; মহিলা সমিতির হরেক রকম উন্নয়ন কাজের এজেন্ট হয়েছে নাকি সে ! মনোহরির মালামাল বিক্কিরির জন্যে সপ্তায় একদিন আমি ঐ বন্দরে যাই ; সেকেনে কোন কোন দিন চোখাচোখি হলিও সে চিনতি পারে না’
-‘শিক্কত-পাশ করা মানুষের লাখ টাকা দিলেও চাকরি হচ্ছে না শুনি, তা নিতাই হ্যাতো মেয়ের চাকরি দেয় কিরাম করে ? সে কি বন্দরের অপিসার ?” আলো রাণীর খালার জিজ্ঞাসা। – ‘অপিসারের শুকতোলা রিপেয়ারকারী, বাপের পদবি ধরে রেখেছে, তেবে ধরণ পাল্টায়েছে। ও তুমি বোঝবা না মাসি, যাকগে চিন্তা কইরে না, আমি তো আছি । তা বাদে শেফালী থাকতি এতো চিন্তার কী!” শংকরের জবাব। শেফালীর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে খালা উত্তর দেয়- ‘তোর কাছে ঋণি হয়ে গেলাম রে শেফালী, একেনের টানে আলো ওপারে যাতি রাজি হলো না কোনমতে, তুই ছিলি বলেই তড়িঘড়ি ব্যবস্থা করে মায়্যেডার একটা হিল্লে হয়ে গেল, বে-সাদি হয়ে গেলে তার দিকে সহজে চোখ তুলতি আসবে না কেউ’। শেফালীর প্রতি আফসারের মনও বিগলিত হয়ে ওঠে। আফসারের মনে পড়ল- কিছুদিন আগে নিতাই বাজারের মধ্যে পথ আগলে শেফালীর কাছ থেকে টুকরো কাপড়ের বস্তা চেয়ে নিয়ে বাইকে করে এগিয়ে দিতে চেয়েছিল, শেফালী দেয়নি। কাঠের মিলে এসে নিতাই চরণ তাকেও একদিন প্রস্তাব দিয়েছিলো-
‘হ্যাতো খাটুনি খেটে শুধু শুধু জিবনডা কালিপদ করলি আফসার, জোয়ান কালের সময় নষ্ট না কইরে বউডারে নিয়ে বন্দরে চল আমার সাথে, আরামের কাজ ধরায় দোবো, ফিটফাট ঘুরবি আর কাড়ি কাড়ি টাকা কামাবি’ সেদিন নিতাইয়ের কথার গভীরে ঢুকতে পারেনি আফসার, কিন্তু ওর তীর্যক সুর ভালো লাগেনি আফসারের। দ্রুত সিঁদুর-দান সম্পন্ন করার তাগাদা দিয়ে শেফালী বলল- ‘এবার তাড়াতাড়ি আসল কাজ সারো শংকর, মানুষটা বাড়ি একলা আছে, শরীরটা বোধহয় ভালো না তার, থালে দুটো ভাতও বেড়ে দিয়ে আসিনি’ একথা শুনে আফসার ঝোপের আড়ালে আরও গুটিসুটি হয়ে গেলো, কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছে যে শেফালীর প্রতি ওর বিশ্বাস খানা বহাল তবিয়তে আছে। যা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেনি, তা সত্যি সত্যি ঘটেনি। পুরোহিতের আন্তরিক তৎপরতায় বিলম্ব হয়নি আর, বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। গাঁয়ের তিন রাস্তার মোড়ের মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসে, মন্দিরের পাশের হিন্দুপাড়া থেকে উলুধ্বনিও শোনা যাচ্ছে। শেফালী বাড়ির পথে হাঁটছে, ঝোপঝাড়ে ঘেরা নির্জন পথ, কেমন যেন গা ছমছম করছে, মনে হচ্ছে পেছনে পেছনে কোনো ছায়া হাঁটছে। খানিক দূর আসার পরে পেছন থেকে টর্চের আলো পড়লো, চমকে ওঠে শেফালী ! পেছন ঘুরে দ্যাখে আফসার। ‘তুমি কোন্ দিক থেইকে হাজির হলে ?’
বিকেল থেকে আফসার যে মন্দিরেই ছিলো, এ কথা শেফালীকে বলতে পারলো না আফসার ; কেবল নিঃশব্দে নিজের ভেতর অনুভব করছে -‘শেফালীর মতো এত বড় মনের মানুষটা আফসারের জীবনসঙ্গী! এতদিনের সংসার, এত কাছে বসবাস, এত কথা হয় দু’জনের, তারপরেও মনে হচ্ছে শেফালীকে নতুন করে চিনলো। আফসারের বুকের ভেতর কেমন যেন করে; এটা গর্ববোধ কিনা নির্ণয় করতে পারেনা আফসার। অজান্তে বেশ কিছুক্ষণ নীরব সে। হঠাৎ শেফালীর কথায় সম্বিত ফিরে পায়- ‘কী হলো! মুকে কতা নেই যে!’ আফসার নত মুখে বলল- ‘আমারে বলে কয়ে আসলি তো আরো আগে তোরে এগোয়ে নিতে আসতাম। এসব রিস্কি কাজে একা একা টেনশন করে মরিস, আমারে সাথে নিলি তো তোর কষ্ট কম হয় !’ এবার শেফালী নিরুত্তর।
আলো আঁধারীতে চুপচাপ দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে। শেফালী কখন যেন কাছে ঘেঁষে ওর ডান হাতে আফসারের কোমর জড়িয়ে হাঁটতে লেগেছে। আফসার মনে মনে ভাবছে- ‘এমন দৃশ্যখানা যদি কাঠের মিলে ওর কাজের সঙ্গিরা দেখতে পেতো একবার!’ কিছুক্ষণ পরে শেফালী বলে ওঠে- ‘এমন মিটমিটে আলোয় সাপ-পোকামাকড় দেখা যায় ? সামনের মাসেই পুতুল বানানো মজুরী পায়্যে তোমারে একটা লাইট কিনে দোবো।’ আফসার নিঃশব্দে আলো ফেলে এগিয়ে চলে। শান্ত নীরব মেঠো পথে তেজহীন আলো কেমন মায়া মায়া ঠেকছে।