আমবাগানে ফোটেনি আশানুরূপ মুকুল!

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৪, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:ধীরগতিতে বাড়ছে তাপমাত্রা। দিনে গরম অনুভব করলেও রাতে তা কমে আসছে। ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে ১৩ দিন হলো। ফাগুনের আগুনের এখনও দেখা মিলেনি প্রকৃতিতে। ফাগুনের আবহনে এরই মধ্যে ফুটেছে শিমুল, ফুটেছে পলাশ। সবুজ আম্রকাননে এখনও ঝিলিক দিচ্ছে না সোনালি মুকুল। এ সময়ে গাছে মুকুলে মুকুলে ভরে থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ গাছেই আসেনি মুকুল। জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব ও তীব্র শীতই এর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষিবিদরা।

আশানুরূপ মুকুল প্রকৃতির এমন পালাবদল দেখে আন্দোলিত হয়ে উঠছে মানুষের মন। বছর ঘুরে ঋতু বৈচিত্রে আমের শহর ও রাজধানীখ্যাত রাজশাহী ও চাঁপাইয়ে সবুজ প্রকৃতির আমেজ এখন অনেকটা এমনই আবেগের হয়ে উঠেছে। বসন্তের ফাগুন আর আমের মুকুল যেন একই সুতোয় গাঁথা। এরপরও বছরের নির্দিষ্ট এই সময়জুড়ে রাজশাহীর আমচাষি ও ব্যবসায়ীসহ কমবেশি সব শ্রেণির মানুষেরই নজর আম বাগানের দিকে। আমের সবুজ পাতা আর মুকুলে এখন দোল খাচ্ছে চাষিদের রঙিন স্বপ্নও। আর সদ্য মুকুল ফোটার এমন দৃশ্য এখন কংক্রিটের শহর থেকে শুরু করে বিস্তৃত গ্রামীণ জনপদেও।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার প্রায় সব এলাকাতেই এখন প্রচুর আমবাগান রয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হচ্ছে। সেসব জাতের আমের বাগানও তৈরি হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে মিলছে আমের ফলনও। কিন্তু এখনও অধিকাংশ গাছে মুকুল না আসায় দুশ্চিন্তায় ভোগাচ্ছে।

দেশের অর্থনীতিতে আম লাভজনক মৌসুমি ফল ব্যবসা। তাই প্রতি বছরই বাগানের সংখ্যা বাড়ছে। তবে গড়ে ওঠা নতুন আমবাগানগুলোর প্রায়ই বনেদি জাতের। বিশেষ করে নিয়মিত জাত ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত ও আশ্বিনা জাতের হাইব্রিড গাছই বেশি হচ্ছে।

সাধারণত মাঘের শেষেই আম গাছে মুকুল আসে। এবার তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। আগে রাজশাহীতে আমের মৌসুমে ‘অফ ইয়ার’ এবং ‘অন ইয়ার’ থাকতো। অফ ইয়ারে ফলন কম হতো আর অন ইয়ারে বেশি হত। কিন্তু প্রায় এক যুগের বেশি সময় থেকে রাজশাহীর গবেষক ও আম চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই রেওয়াজ ভেঙেছে। বছরজুড়ে চাষিদের নিয়মিত পরিচর্যার কারণে এখন রাজশাহীর সব বাগানেই প্রতিবছরই আমের আশানুরূপ ফলন হচ্ছে এবং বাড়ছেও।

এছাড়া এবার পৌষের শেষেও রাজশাহীর অনেক আমবাগানে আগাম মুকুল দেখা গেছে। সোনালি মুকুলে প্রতিবার ছেয়ে গেলেও এবার তা ব্যতিক্রম। গাছে আসছে অল্প সংখ্যক মুকুল। বিগত বছরগুলোতে গাছজুড়ে মুকুলের আধিপত্যে থাকলেও এবার বাগানগুলো দেখে তাই আমচাষিদের মনে আশার প্রদীপ জ্বলছে না। কারণ আমের মুকুল ও কৃষকের স্বপ্ন একই সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিনই চলছে পরিচর্যা। আমগাছের গোড়ায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দেওয়া হচ্ছে সেচ।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘুরে আম গাছে প্রচুর মুকুল দেখা গেছে। মুকুল দেখে আমচাষিরা খুশি হলেও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা বলছে, পুরোপুরিভাবে শীত বিদায়ের আগেই আমের মুকুল আসা খুব একটা ভালো ব্যাপার নয়। মাঝে-মধ্যেই ঘন কুয়াশা থাকছে প্রকৃতিতে। আর এমন হঠাৎ-হঠাৎ ঘন কুয়াশা আমগাছের মুকুলের কাল। এতেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুকুল। যা পরে ফলনেও প্রভাব ফেলবে। যদিও প্রাকৃতিক নিয়মে ফাগুন মাসে ঘন কুয়াশার আশঙ্কা খুবই কম। এর পরও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করলে আমের মুকুল ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। মাঝে মধ্যে ঘনকুয়াশা পড়লেও মুকুলের ক্ষতি হবে। পাউডারি
মিলডিউ রোগে আক্রান্ত হয়ে এসব মুকুলের অধিকাংশই ঝরে যায়। ফলে আক্রান্ত বাগান মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কী হবে তা শেষ পর্যন্ত না দেখে বলা খুবই কঠিন।

সরজমিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার ইসলামপুর, বারঘরিয়া, শিবগঞ্জের কানসাট, শ্যামপুর, বিনোদপুর, মনাকষা, ছত্রাজিতপুর, রানিহাটি, চামাবাজার, ভাঙ্গাব্রিজ, আব্বাসবাজার, সোনামসজিদ, মিঞাপাড়া এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, লক্ষন ভোগ, খিরসাপাতের কিছু গাছে আমের গাছে মুকুল আসলেও। অন্যন্য অধিকাংশ গাছেই নেই মুকুল। এতে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে চাষিদের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর শহরের বিদিরপুর এলাকার আবুল হাসান বলেন, প্রতিবছর মাঘের শেষে আমে মুকুল আসে। তবে এখনও সেভাবে আম গাছে মুকুল আসেনি। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি মুকুল দেখা যেতে পারে
সদর উপজেলা ইসলামপুর ইউনিয়নের আম চাষি আসরাফুল ইসলাম বলেন, গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই সব গাছে মুকুল এসেছিলো। কিন্তু চলতি বছরে ফেব্রুয়ারি মাস প্রায় শেষ। কিন্তু এখনো শত শত আম গাছে কোনো মুকুল নেই। দু-একটি গাছে মুকুল থাকলেও একেবারেই কম। আমরা স্প্রে ও সেচ দেওয়ার কোনো কমতি রাখিনি। শুনছি অতিরিক্ত শীতের কারণে নাকি এমনটা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ম্যাঙ্গো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব বলেন, এবার দীর্ঘমেয়াদী শৈত্য প্রবাহ, অতিরিক্ত শীত ও ঠাণ্ডা হওয়ায় আমের গাছে মুকুল আসছে না। এতে আমাদের মনে দুশ্চিতা দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলেছে, সঠিক নিয়মে ও উপযুক্ত সেচ ও স্প্রেসহ অন্যান্য প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারলে সামনে কিছু দিনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই মুকুল আসবে। শীত ও ঠাণ্ডার কোনো প্রভাব পড়বে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক পলাশ সরকার বলেন, গেল বছর আম গাছে প্রচুর মুকুল ছিলো। তাই এবছরকে অফ সিজন বলা যায়। তবে শীতের প্রকোপে বিশেষ করে বড় গাছে আমের মুকুল কম এসেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। তবে এখন যদি গরমের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় সে ক্ষেত্রে মুকুল আরও ফুঁটতে পারে। তবে সে মুকুলে আমের ফলন তেমন ভালো হবেনা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে ৭৫ লক্ষ ৭৯ হাজার ৮২৫ গাছ আছে।

রাজশাহীর পবার আম ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, একবার ফলন হলেও তাই বছরের প্রায় পুরোটা সময়টা জুড়েই আমবাগানের পরিচর্যায় তাদের সময় চলে যায়। মাঘের শেষে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমের মুকুল আসে। তবে এবার প্রায় আগেই আমের গাছে মুকুল এসেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পোকার আক্রমণ থেকে আমের মুকুলকে বাঁচাতে। আগাম কীটনাশক প্রয়োগসহ, গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আমচাষি ও বাগান মালিকরা। মুকুল রক্ষা করতে গাছে গাছে ওষুধ স্প্রে করছেন অনেকে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আমের ফলন বাম্পার প্রত্যাশা করছে বাগান মালিকরা।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৩৫ শতাংশ গাছে আমের মুকুল এসেছে। এসব গাছে আমের মুকুল রক্ষা ও সঠিক পরিচর্যায় বেশি যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, এবার রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬০২ হেক্টর জমির আমবাগানে দুই লাখ ৬০ হাজার ১৬৪ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সকল প্রতিকূলতা পাশ কাটিয়ে এগুতে পারলে আম রফতানি বৃদ্ধি করতে পারবেন তারা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ