আসছে কাক্সিক্ষত শেষ দশক

আপডেট: জুন ১৬, ২০১৭, ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ


আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজান দান করেছেন তাকওয়া অর্জন ও গুনাহ মাফের জন্য। এ দুটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর সাধনা করতে হয়। সাধনার জন্য দরকার প্রস্তুত মন ও পরিবেশ। প্রস্তুত মন বলতে আবেগে ভরা কোমল মন বুঝানো হচ্ছে। যে মনে শুধুই ব্যাকুলতা আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের। যে মন একেবারে প্রস্তুত ইবাদতের মাধ্যমে কঠোর সাধনা করতে। আর পরিবেশ বলতে বুঝানো হচ্ছে এমন সময় যে সময়টাকে ইবাদত করলে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া যায়, ইবাদত কবুল হয়, ক্ষমা পাওয়া যায় এবং প্রচুর সওয়াব পাওয়া যায়। সেই সময়টা হচ্ছে রমজানের শেষ দশক। সেই কাক্সিক্ষত শেষ দশক আমাদের দোরগোড়ায়। আজ সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হচ্ছে সেই শেষ দশক। এই শেষ দশকের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে, শবে কদরের অনুসন্ধান ও ইতেকাফ।
রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিতে শবে কদর নিহিত রয়েছে। শবে কদরে ইবাদত করলে হাজার মাস ইবাদত করার চাইতেও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। এ জন্য এ রাত পাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত ব্যাকুল থাকতেন। এ কারণেই তিনি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। কেননা, ইতিকাফ করলে শবে কদর নিশ্চিত লাভ হয়।
শরিয়তের পরিভাষায় যে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াত সহকারে নিয়মিত আদায় করা হয়, এমন মসজিদে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিয়ত সহকারে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া। এলাকার যে কোন একজন ইতিকাফ করলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যদি ইতিকাফ না করে তাহলে সকলেই গুনাহগার হবে। হযরত রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে ইতিকাফ করেছেন এবং সাহাবাদেরকেও ইতিকাফ করার জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, মসজিদ মুত্তাকিদের ঘর। যে ব্যক্তি ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করবে, আল্লাহ তার প্রতি শান্তি ও রহমত নাজিল করবেন এবং পুলসিরাত পারপূর্বক বেহেশতে পৌঁছাবার জিম্মাদার হবেন।
হযরত আবদুুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেন, সে ব্যক্তি গুনাহর আবিলতা থেকে মুক্ত থাকে, তার জন্যে সেসব আমল লিপিবদ্ধ করা হয় যা সাধারণত সবাই করে থাকে।
ইতিকাফের নিয়ম হল, পাক-পবিত্র হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের নিয়ত করে মসজিদে বা সালাতের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে হয়। নিয়ত ছাড়া ইতিকাফ করলে সর্বসম্মতক্রমে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিকাফের এমন মসজিদ হতে হবে, যেখানে অন্তত নিয়মিত আজান ও ইকামাতের সঙ্গে জামায়াতে নামাজ আদায় করা হয়। ইতিকাফের সর্বোত্তম মসজিদ হল মসজিদে হারাম বা বায়তুল্লাহ। এরপর মসজিদে নববী, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস। তারপর জামে মসজিদের মধ্যে যে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেশি।
ইতিকাফকারীর উদাহরণ সেই ব্যক্তির মতো যে অন্যের ঘরে গিয়ে ধর্ণা দিয়ে বলে যে, আমার দরখাস্ত কবুল না হলে আমি এখান থেকে নড়ব না। একেবারে নাছোড়বান্দা হয়ে যদি বলে, তোমার দরজায় আমি মাথা ঠুকতে থাকব, আর আমার দরখাস্ত কবুল না করা পর্যন্ত আমি নড়ব না। এমন যদি হয় অবস্থা, তাহলে কঠিন হৃদয়ও না গলে পারে না। আর সেখানে রহমানুর রাহিম, গাফুরুল গাফ্ফার, মেহেরবান, দয়ালু মহান আল্লাহর তো কথাই নেই। তিনি তাঁপ পাপী-তাপী গুনাহগার বান্দাকে তাঁর অপরিসীম দানে ধন্য করার জন্য উসিলা খোঁজেন। অতএব, কেউ যখন দুনিয়ার যাবতীয় বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর দরজায় গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তাঁর রহমত ও মাগফিরাত কামনায় তাঁর ঘরে ধর্ণা দিয়ে বসে, তখন পরম দয়ালু আল্লাহ তায়ালা কি পারেন তাকে তাঁর অপার করুণায় ভূষিত না করে? আর ইতিকাফের মাহাত্ম্য এটাই। এমন ব্যাকুল, পাগলপারা বান্দাকে আল্লাহ ক্ষমা না করলে এবং স্বীয় রহমতের কোলে তুলে না নিলে লজ্জাবোধ করেন।
আল্ল¬াহ তায়ালা আমাদেরকে সকলকে রমজানের শেষ দশকে রমজানের উদ্দেশ্য অর্জনের তাওফিক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী