আহরণ নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুকের জমজমাট বাজার!

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২২, ১২:২০ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


খুলনার কয়রা উপজেলার পাইকগাছা এলাকা। ভোরের আলো ফোটার পরেই এলাকার শাকবাড়িয়া নদীতে নেমে পড়েন শত শত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর। সবাই মাছ ধরতেই নদীতে নেমেছেন ভেবে ‘ভুল করবেন’ যে কেউ। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে, তারা ডুব দিয়ে বিশেষ কায়দায় পানির নিচ থেকে তুলে আনছেন অসংখ্য ঝিনুক ও শামুক। পরে ভালো করে ধুয়ে সেগুলো বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছেন বাজারে। নদীর প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে এমন দৃশ্য এখন প্রতিদিনের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলাশয় থেকে ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পানি দূষণমুক্ত রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে শামুক-ঝিনুক; ‘প্রকৃতির ফিল্টার’ হিসেবে পরিচিত এই প্রাণী প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ নিষিদ্ধ। মূলত বন্যপ্রাণী নিধন আইনে দÐনীয় অপরাধ। অথচ এই এলাকায় অবাধে চলছে শামুক-ঝিনুক আহরণ।

পাশাপাশি পাইকগাছায় গড়ে উঠেছে কেনাবেচার আড়ত। নদীর তীরে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও আড়তে এগুলোর দাম ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকা। এই শামুক-ঝিনুকই এখানকার চুন তৈরির প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, সাধারণত পাথর ও শামুক-ঝিনুক থেকে চুন পাওয়া যায়। কিন্তু পাথুরে চুন প্রক্রিয়াকরণে রাসায়নিক দ্রব্য এবং এসিডের পরিমাণ বেশি থাকায় এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালসিয়ামের ক্ষয় হয়, দাঁতের ক্ষয় হয়, পাকস্থলীতেও সমস্যা করে। কেননা, এই চুন বেশিরভাগই ব্যবহৃত হয় বসতবাড়িতে চুনকাম করার জন্য।

তবে প্রাচীন পদ্ধতিতে শামুক-ঝিনুক থেকে তৈরি করা চুন কেমিক্যালমুক্ত ও শরীরের জন্য ভালো হওয়ায় এর চাহিদা বেশি। এই এলাকার শামুক ও ঝিনুক থেকে চুন উৎপাদন করে প্যাকেটজাত করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদী থেকে ভাটার সময় দেদার আহরিত হচ্ছে শামুক ঝিনুক। শিশু, কিশোর, নারী, পুরুষ, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধারাও এগুলো আহরণ করছেন নির্দ্বিধায়। পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে শামুক ও ঝিনুক ক্রয় করছেন।

মূলত বর্ষা মৌসুমে বেশি পাওয়া যায়। সুন্দরবন থেকেও শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে সেখানে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে উপক‚লের অসহায় অনেক পরিবার।
কথা হয় হোসেন গাজী নামে এক বৃদ্ধের সঙ্গে। তিনি জানান, ঝিনুক কুড়িয়ে তার বেশ আয় হচ্ছে। দিনে দেড় থেকে দুই মণ ঝিনুক পাচ্ছেন তিনি।

পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঝিনুক কুড়ান শাহিনুর রহমান। আবার অন্যদের কাছ থেকেও কেনেন তিনি। পরে সেগুলো পাইকগাছার চাঁদখালী বাজারে বিক্রি করেন।

শুধু হোসেন গাজী ও শাহিনুর রহমানই নন, তাদের মতো অনেকেই এখন দিনভর শামুক-ঝিনুক আহরণ করছেন। এটিকেই মৌসুমি পেশা বানিয়ে ফেলেছেন কেউ কেউ। তামিম হোসেন নামে এক কিশোর জানায়, কিছু দিন আগেই সে জানতে পারে যে এখানে প্রচুর শামুক-ঝিনুক পাওয়া যাচ্ছে। তারপর থেকেই প্রতিদিনই আসছে সে, যা ১২০ থেকে ২৪০ টাকা মণ দরে বিক্রি করছে।

হাফিজুল ইসলাম নামে এক যুবকের দাবি, এই এলাকাটিতে এখন প্রতিদিন অন্তত ৫০০ জন নিয়মিত ঝিনুক ও শামুক আহরণ করছে। প্রত্যেকেই দিনে এক থেকে দেড় মণ, কেউ কেউ দুই মণ পর্যন্ত আহরণ করতে পারছে। সেই হিসাবে প্রতিদিনই ৮০০ থেকে ৯০০ মণ ঝিনুক তুলছেন।
চাঁদখালী বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকা মণ দরে শামুক ঝিনুক কিনছেন। এটা দিয়ে চুন তৈরি করেন ও তা বাজারে বিক্রি করাসহ সরবরাহ করেন।

বিষয়টি স্বীকার করেন চাঁদখালীর ইউপি সদস্য মো. কাইয়ুম হোসেনও। তিনি বলেন, চাঁদখালী বাজারের বেশ কিছু ব্যক্তি ঝিনুকের ব্যবসা করেন।
কয়রার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আমিনুল হক বলেন, বন্য প্রাণী নিধন আইনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে শামুক-ঝিনুক আহরণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অবৈধভাবে এই ব্যবসা করলে কিংবা প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ করলে আইনানুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম বলেন, ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর তফসিল-২-এর ৬ ধারায় প্রবালের ৩২টি ও শামুক-ঝিনুকের ১৩৭টি প্রজাতি শিকার ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শামুক-ঝিনুক আহরণ ও ব্যবসা আইনত অপরাধ।’ খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান তিনি।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন