আড়চোখে: বিষয়-বৈচিত্র্যের খুঁটিনাটি

আপডেট: জুলাই ২২, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

জাইদুর রহমান


বাংলা ভাষাভাষী লোকসাধারণের মনের ভাব আদান-প্রদানের জন্য ছড়াকারে কথনের ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। সুদূর অতীত বাংলার নারী-পুরুষ ছন্দে ছন্দে কথনে কথনে মনের ভাব প্রকাশ করতো। সাহিত্য বিশারদ প-িতদের মতে, এগুলো লোককথা বা লোকসাহিত্য নামে সুপরিচিত। যেমন-
(ক) কলা রোয়ে না কেটো পাত
তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।
(খ) ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে।
(গ) বাঙ্গালী ললনার দশহাত কাপড়ে
তনু তার ঢাকে না-যে পড়ে বড় ফাঁপড়ে।
আবার ভাষা প-িতদের সাহিত্য গবেষণার ফলশ্রুতি থেকে জানা যায়, কবিতার আদিরূপ হচ্ছে ছড়া। দেখা গেছে বাঙালি কবিদের অধিকাংশই সাহিত্যচর্চা শুরু করেছেন ছড়া লেখনের মাধ্যমে। কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমানও হয়তো তার ব্যতিক্রম নন। সে কথা তাঁর লেখা ‘দুটি কথা’র মাঝেই উক্ত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৯ সনে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নের সময় কলেজের দেয়ালিকার জন্য সখেরবশে “কলেজে পড়ি” শিরোনামে একটি ছড়া লিখেছিলাম।’ তাই বলা যেতে পারে, কলেজ জীবনে ছড়া লেখা শুরুর মধ্য দিয়েই কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি।
আড়চোখে কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমানের প্রথম প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ। মোট ৩৬টি ছড়া আলোর মুখ দেখেছে আড়চোখে। প্রতিটি ছড়ার মধ্যেই মানসিকতার পরিবর্তন, চিন্তার পরিশুদ্ধি, দেশ-সমাজ-রাজনীতির সংশোধন কিংবা মানবতা, মানবিকতা ও ন্যায় নীতির পক্ষে যেমন, তেমনিভাবে জুলুম, শোষন আর নিপীড়নের বিপক্ষে ছড়াকার কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের ঐকান্তিক আহবান বেশ লক্ষ্যণীয়। কাজেই ছড়াগ্রন্থ হিসেবে আড়চোখে নতুন হলেও এর বিষয়বস্তু নির্বাচন এবং ছড়া লেখনে সমাজ চিত্রায়নের বৈচিত্র্য পরিস্ফূটনে ছড়াকারের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রশংসাযোগ্য।
ছড়া সাধারণত স্বরবৃত্ত ছন্দেই লেখা হয়ে থাকে। তবে আধুনিক যুগে এসে বাংলা ভাষার কবি-ছড়াকারগণ নিরীক্ষামূলকভাবে মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দেও ছড়া লেখেছেন বা লিখে যাচ্ছেন। ছন্দরসিক কবি-ছড়াকার মাত্রই তা লক্ষ্য করে থাকবেন নিশ্চয়। সে যা-ই হোক, ছড়া লেখার জন্য স্বরবৃত্ত ছন্দই উপাদেয়। স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতা-ছড়া স্বরস ও সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে সকলের কাছেই।
ছড়ার বিষয়বস্তুগুণে কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের অধিকাংশ লেখাই মন কাড়ার মত। কেননা, সমাজের সদস্য হিসেবে আমাদেরকে যা চিন্তায় ফেলে, সমাজকে সুন্দর ও সুখময় করার জন্য যা আমাদের করণীয়, ছড়াকার কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের প্রতিটি ছড়ার ছত্রে ছত্রে, পংক্তিতে পংক্তিতে সে সব কথা লিখিত হয়েছে অতি সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায়।
আড়চোখে ছড়াগ্রন্থে বেশকিছু দীর্ঘ ছড়া আছে। ছড়া আরো অনেকে লেখেছেন। সমকালে বন্ধুবর নাজিব ওয়াদুদ ফটিকছড়ি নামে দীর্ঘ ছড়া লেখেছেন। অধুনা সাহিত্যের ছোট কাগজগুলোতে অবশ্য ১২ থেকে ২০ লাইনে লেখা ছড়াকেই মুদ্রণের উপযুক্ত বিবেচনা করা হয়। কাজেই ছড়ার শব্দ বন্ধন অনুর্ধ ২০ লাইন হওয়াই বাঞ্চনীয়।
প্রাসঙ্গিকভাবে এ কথা না বললেই নয়, আর সেটা হচ্ছে অন্তমিলের জন্য শব্দ চয়নের দুর্বলতা। এ প্রসঙ্গে শুধু এতটুকুই বলা যায়, অন্তমিলের শব্দ চয়নে সাবধান হলে কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আগামীর সফল ছড়াকার হিসেবে বিবেচিত হবেনÑ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আড়চোখে অর্ধ ডিমাই সাইজের সুন্দর ও ঝকঝকে ছাপা ছড়াগ্রন্থ। প্রথম প্রকাশ একুশে বইমেলা ২০১৭। প্রকাশক- পরিলেখ, রাজশাহী। আশি গ্রাম অফসেট কাগজে ছাপা, সুন্দর বোর্ড বাঁধাই এবং মনোরম প্রচ্ছদের ছড়াগ্রন্থ আড়চোখে প্রথম পলকেই পাঠক সাধারণকে আকৃষ্ট করবে বলা যায়। ছড়াগ্রন্থটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৫০.০০ টাকা।
আড়চোখে-র বহুল প্রচার কামনা করি।