আয়কর বিভাগের যত বিধি সঞ্চয়পত্রের উপরে

আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০২২, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


নিম্ন মধ্যবিত্তদের আপদে বিপদে ও ভবিষ্যত আর্থিক নিশ্চয়তার জন্য সঞ্চয়পত্র বা সঞ্চয় হিসাব একটি নিরাপদ সঞ্চয় প্রকল্প। তেমনি সঞ্চয়পত্র বিক্রিত অর্থ সরকারের আপদকালিন রিজার্ভ ফান্ড হিসেবে পরিচিত। এমন একটি গুরত্বপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থার উপর সরকার দফায় দফায় বিভিন্ন বিধি আরোপ করেছে। সরকার তথা আয়কর বিভাগের যত আক্রোশ যেন সঞ্চয়পত্রের উপরে। আয়কর বিধি ১৮৪ এর সুবাদে আয়কর বিভাগ সব ধরনের বিধি প্রয়োগ করেও পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হচ্ছেনা। অথচ কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপী ,কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো বিধি প্রয়োগ করা হয়না অথবা আয়কর বিভাগ তাদের নাগালের মধ্যে পৌঁছাতে পারেনা।
নিরাপদে অর্থ আমানত রাখা ও সেই সাথে কিছু মুনাফা প্রাপ্তির একটি সুন্দর ব্যবস্থা সঞ্চয়পত্র বা সঞ্চয় হিসাব যা গত কয়েক যুগ ধরে চলে আসছে। প্রথম দিকে এর সুদের হার ছিল ১৫% বা ৮ বছরে দ্বিগুন, মাত্র ৪ বছর আগেও সঞ্চয়পত্র ক্রয় ও মুনাফা গ্রহণে নগদ অর্থের ব্যবহার হতো। সাধারণ মানুষের জন্য যা ছিল সহজ ব্যবস্থা এবং গত ৪০/৫০ বছরে অর্থ আদান প্রদানে বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। ২০১৭ সালের পর সরকার সুদের হার পর্যায়ক্রমে কমাতে কমাতে ১০.৭৫% এ নামিয়ে এনেছে এবং ২০১৮ সালে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে ৫% এর স্থলে ১০% হারে কাটার বিধি প্রয়োগ করেছে। এরপর আয়কর বিভাগ নতুন বিধি প্রয়োগ করলো। ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয় করলে আয়কর সনদ বা টিন দেখাতে হবে। অন্যথায় সঞ্চয়পত্র কেনা যাবেনা। সঞ্চয়পত্র ক্রেতারা দলে দলে ছুটলো আয়কর অফিসে টিন সংগ্রহের জন্য। এর পরপরই আর এক বিধি জারি করলো আয়কর বিভাগ। এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয় করলে রিটার্ন দিতে হবে। ফলে নিম্ন মধ্যবিত্ত যারা কোনোদিন আয়কর বিভাগের সীমানায় যায়নি তারা ভীষণ বিব্রত বোধ করলো। বিশেষত নারীরা নিরাপদ সঞ্চয়ের কথা ভুলে গেল। সঞ্চয়পত্র ক্রয় কমে গেল। স্বাভাবিকভাবে সরকারের আপদকালিন রিজার্ভ ফান্ডের পরিমাণও কমে গেল। তারপরেও আয়কর বিভাগের আক্রোশ কমলোনা। এবার বিধি জারি করলো নগদ অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনা যাবেনা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে নিজ অ্যাকাউন্টের চেক দিতে হবে। এবার সঞ্চয়পত্র ক্রেতারা বিভিন্ন ব্যাংকে ছুটলো। লাভ হলো ব্যাংকের। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুললেই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন নামে চার্জ কর্তন করে। এরমধ্যে নৈমিত্তিক চার্জ বাবদ এক হাজার টাকা এবং অ্যাকাউন্টে দশ লাখ টাকার উপরে হলে তিন হাজার টাকা কেটে নেবে। গ্রাহকের টাকা যেন ব্যাংকের মৌরসি সম্পত্তি। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে নিরাপত্তার জন্য। ব্যাংক সেই টাকা সুদে খাটায়, চক্রবৃদ্ধি হারে লাভ করে। তারপরেও গ্রাহকের টাকা কর্তন করে। সেটাও সরকারি আইনে নয়, ব্যাংকের স্বার্থে তৈরি করা নিজস্ব আইনে।
২০২০ সালে আয়কর বিভাগ আরও কড়া বিধি আরোপ করলো। সঞ্চয়পত্র ক্রেতার প্রাপ্ত মুনাফা আয়করযোগ্য হোক বা নাহোক রিটার্ন দাখিল করতেই হবে। দাখিল না করলে প্রথমেই এক হাজার টাকা জরিমানা এবং রিটার্ন দাখিল না করা পর্যন্ত প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা হারে জরিমানা গুনতে হবে। বছর শেষে জরিমানার পরিমাণ হবে ১৯ হাজার ২৫০ টাকা। এই ভয়ে ২০২১ সালে লাখ লাখ টিন ধারীরা সংশ্লিষ্ট আয়কর অফিসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো রিটার্ন জমা দিতে। লাভ হলো আয়কর আইনজীবীদের। প্রত্যেক সঞ্চয়পত্র ক্রেতার নিকট থেকে কয়েক হাজার টাকা করে ফি আদায় করলো। আয়কর অফিসে ফাইলের স্তুপ বাড়লো। কিন্তু ওই ফাইল দেখার মত লোকবল নেই আয়কর অফিসগুলোতে।
ধরে নিলাম এ সব বিধি আরোপ করে সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের আয়ের উৎস ও পরিমাণ নিশ্চিত হতে পারবে আয়কর বিভাগ, যেহেতু সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। কিন্তু যারা কোটি কোটি টাকার মালিক, ঋণ খেলাপি, যাদের কাছে দেশের সম্পদের ৮০ ভাগ রয়েছে- তারা এমন বন্ধনে আবদ্ধ নয়, তাদের রিটার্ন দিতে হয়না। তাদের অর্থের উৎস ও পরিমাণ জানতেই পারেনা। সরকার তাদের কোটি কোটি তাকার সুদ মওকুফ করে দিচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রতি বছর গাণিতিক হারে বাড়ছে, কালো টাকার মালিকদের সাদা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। আয়কর বিভাগ সেখানে নাচার। একেই বলে শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন।
এবার দেখা যাক আয়কর বিভাগের কর আদায়ের পদ্ধতি কেমন। পদ্ধতিটি ‘ক’ এবং ‘খ’ দুইভাগে বিভক্ত । ‘ক ’ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি এককভাবে বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় করলে, ৬৫ বছর বা তদুর্ধ বয়সের ক্ষেত্রে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় হলে এবং গেজেট ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি আয় হলে তা হবে করযোগ্য এবং তারা রিটার্ন দিতে বাধ্য। ‘খ’ ধারায় বলা হয়েছে, যিনি ১২ ডিজিটের টিন নিয়েছেন, যার আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করেছে এবং পূর্ববর্তী ৩ বছরে কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে রিটার্ন প্রদান বাধ্যতামুলক। একজন সাধারণ মানুষ বা ছোট খাট চাকরি করেন তিনি ৫০/৬০ বছরে তিল তিল করে ২০ লাখ টাকা সঞ্চয় করতেই পারেন এবং ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। সেখানেও যদি প্রশ্ন তোলা হয় কোথায় এত টাকা পেলেন তার হিসেব দিতে হবে। তা হবে রীতিমত ক্ষমতার অপব্যাবহার। এখন এই ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ক্রেতা বছরে মুনাফা পাবেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৮০ টাকা। যা আয়কর বিভাগের বিধি অনুযায়ী কর যোগ্য নয়। যদি তার অন্য কোনো আয়ের উৎস না থাকে। এখন দেখা যাক যার ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আছে এবং বয়স ৬৫ বছরের কম। তিনি সেখান থেকে বছরে মুনাফা পাবেন ৩ লাখ ২৮ হাজার ৩২০ টাকা এবং তা করযোগ্য। কিন্তু ওই মুনাফা থেকে উৎসে কর বাবদ ১০% বা ৩২ হাজার ৮০০ টাকা কেটে নিয়েছে সরকার। সেক্ষেত্রে তিনি করযোগ্য হচ্ছেন না। এই বিচারে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামুলক করা যেতে পাওে এবং আয়কর বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
সরকার সঞ্চয়পত্রের উপর আরও একটি পেরেক ঠুকেছে। তাহলো কেউ এক নামে ৫০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেনা। ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি মাসে ১ লাখ আয় করেন বা বেতন পান। তিনি মাসে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করেন এবং ৬০ হাজার টাকা জমা রাখেন। ওইব্যক্তি বছরে ৭ লাখ টাকার বেশি এবং ১০ বছরে ৭০ লাখ টাকা জমা করতে পারেন। সরকার যদি ৫০ লাখ টাকায় পেরেক মেরে দেন তবে ওই ব্যক্তি তার সারা জীবনের সঞ্চিত কয়েক কোটি টাকা কোথায় রাখবেন। এইসব অর্থ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধ পথে ব্যবহার হয়। অথচ সঞ্চয়পত্র সহ ভালো সঞ্চয়ের ব্যবস্থা থাকলে সরকার আয়কর পেতো। এই শিলিং বেঁধে দেওয়ার কারণে সবেক কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অথচ যারা বৈধপথে অর্থ সঞ্চয় করছে, সঞ্চয়পত্র কিনছে, কর দিচ্ছে তাদের জন্য শিলিং বাঁধা হচ্ছেÑ এমনকি তাদের ক্ষেত্রে উৎসে কর বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
লক্ষ্যনীয় বিষয় এবং লজ্জার বিষয় বটে। জুলাই মাসে আয়কর বিভাগ একটা বিধি প্রত্যাহার করেছে। বলা হয়েছে একক নামে ৫ লাখ টাকা এবং একই পরিবারের দুজনের নামে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ক্রয় করলে টিন বা রিটার্ন দাখিল করতে হবেনা। এই ছাড় কেন? গত ৩/৪ বছরে এসকল সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের যে বিব্রত করা হয়েছে যেমন টিন সংগ্রহ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ও টাকা কাটা, কর আইঞ্জীবীদের অনর্থক ফি দেওয়া, মানসিক হয়রানি এগুলোর জবাব দেবে কে ?
লেখক : সাংবাদিক