ইঁদুর

আপডেট: জুন ২৩, ২০১৭, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

তানভীর তূর্য


আমি আধশোয়া হয়ে ঘরের জানালা দিয়ে দূরের ওই এক ফালি আকাশ দেখছি। সূর্যটা একটু একটু করে পশ্চিমে তার ঘরে ফিরে যাচ্ছে বলেই হয়তো শেষ মুহূর্তের লালাভ ছটা দিয়ে আকাশকে মুড়িয়ে দিয়ে অন্ধকারকে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে। একটু পরেই অন্ধকারের চাদর মুড়িয়ে এ শহরে সন্ধ্যে নামবে। জানালা দিয়ে হালকা বাতাস এসে আমার শরীরে নাচানাচি করলেও কোন অনুভূতি বোধ হচ্ছে না। আসলে কিছুতেই আজকাল কোন অনুভূতি বোধ হয় না। অনুভুতিদের সেই অস্তিত্বই হয়তো কবে হারিয়ে গেছে।
বিকেলে বাড়ি ফেরার পর থেকেই শরীরটা খারাপ লাগছিল। এখন মাঝেই মাঝেই কেন যে শরীরটা খারাপ থাকে বুঝি না। একটু ঘুমাতে পারলে মন্দ হতো না। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই ঘুমও যেন আঁড়ি করে। শেষ কবে যে একটু তৃপ্তি সহকারে ঘুমিয়েছি তার হিসেব করতে হবে একদিন। হাজার শরীর খারাপ থাকলেও বিছানার মসৃণতার মাঝে নিজেকে আটকে রাখলে আমার চলবে না। যদি কখনো বিছানার মাঝে আটকেও যাই তাহলে এই বাড়িটির চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ কয়েকটা মানুষের কপালে হঠাৎ চিন্তার ভাঁজ পড়বে। তাই ওই মানুষগুলোর দৈনন্দিন ভাল থাকার সম্বল সংগ্রহের জন্য খুব শরীর খারাপ থাকলেও অন্যান্য দিনের মতো আজকেও আমাকে আরেকটু পর বেরুতে হবে।
কি গো, এই অসময়ে শুয়ে আছ যে? জ্বরটর আসলো নাকি?
রেনু কখন যে ঘরে এসেছে বুঝতেই পারিনি। ওর ডাকেই সম্বিত ফিরে পেলাম। রাতের জন্য রান্না করছিল বোধহয়। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার কোন সাড়াশব্দ না পেয়েই হয়তো উঠে এসেছে। রেনু আমার দিকে উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আধো আলো ছায়ায় ওর মুখটা বড় মায়াময় লাগছে। চোখের নিচে কবে কবে যে একটু একটু করে কালি জমেছে সে খেয়াল আমি রাখতে পারিনি। পরনের শাড়িটার ছেঁড়া জায়গাগুলো সুনিপুণ দক্ষতায় ও বারবার যে সেলাই করেছে তা দেখতে পাচ্ছি। অনেকদিন ওর জন্য একটা ভাল শাড়ি কেনা হয় না।
আমি মৃদু হেসে বললাম, না না জ্বর আসেনি। এমনিই শুয়ে আছি। চিন্তা করো না। কি ব্যাপার অন্তুকে দেখছি না যে?
রেনু শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে কপালটা মুছে বলল, অন্তু খেলতে গেছে। সন্ধ্যা হলেই চলে আসবে। একটা কথা হল, বাড়িওয়ালা চাচা আজ এসেছিলেন। আগামীকাল বাড়িভাড়াটা দিতে হবে। আমি সেলিনা আপার কাছে থেকে সেলাইয়ের কিছু টাকা পাব আর তুমি কিছু দিও তাহলেই ভাড়াটা দিয়ে দেয়া যাবে।
আমি মাথা নাড়ালাম। রেনু রান্না ঘরের দিকে এগুলো। আমিও ওর পেছন পেছন বের হলাম। বাবা হুইল চেয়ারে বসে খুক খুক করে কাশছেন। কাশিটা দেখছি হঠাৎ আবার বেড়েছে। মায়েরও তো চোখের অবস্থা ভাল না। আজকাল ভাল করে কিছুই দেখতে পারছেন না। শুধু শুধু শাড়ির আঁচল দিয়ে চশমার কাঁচ বার বার মুছেন আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখার বৃথা চেষ্টা করেন। হাতে একটু টাকাপয়সা আসলে এবার চোখের একজন ভাল ডাক্তার দেখাতেই হবে।
বাবা কাছে ডেকে বললেন, রাতে ফেরার সময় যদি দোকান খোলা থাকে কাশির ঔষধটা নিয়ে আসিস তো বাবা। আজই শেষ হয়ে গেছে।
আমি বাবার হাত ধরে বললাম, ঠিক আছে বাবা। আর কিছু কি লাগবে?
বাবা আমার গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, না রে। তুই যা তৈরি হয়ে নে। তোকে তো বেরুতে হবে।
আমি জানি বাবা অথবা মা-র কোন কিছুর প্রয়োজন পড়লেও মুখ মুটে কিছু বলবেন না। এইতো কিছুদিন আগে মা অন্তুর সাথে হাসি মজা করতে করতে বলে ফেলেছিলেন, অনেকদিন ভালমন্দ কিছু খাওয়া হয়নি তাই না রে দাদাভাই?
তারপর মা আমাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ধুর বুড়া বয়সে ভালমন্দ কি আর পেটে সয়। আমি এমনি দাদুভাইয়ের সাথে মজা করছিলাম। আমার কথায় পাত্তা দিস না, বাবা। কখন কি বলি ঠিক নাই।
মায়েরা কি সুন্দর অভিনয়ই না করতে পারেন। মাকে যতই দেখি অবাক হই।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাস্তার নিয়ন বাতির হালকা আলো জানালা গলে ঘরে আসছে বলে বাতি জালায়নি। এখন আর তীব্র আলো ভাল লাগে না। হয়তো জীবনে অন্ধকারকে লালন করতে করতেই আলোর প্রতি বিতৃষ্ণা জমেছে।
কী ব্যাপার, অন্ধকারে বসে আছ যে দাদা? শারমিন ঘরে এসেছে। ও বাতি জালাতেই চোখ মনে হল ধাঁধিয়ে গেল।
আমি বললাম, তোর কলেজের পিকনিকের টাকাটা যদি কাল পরশুর দিকে দিই হবে না?
শারমিন চোখ বড় বড় করে বলল, আমি পিকনিকে যাব না দাদা। বাসে উঠলেই শুধু বমি হয়। বান্ধবীদের বলে দিয়েছি, যাওয়ার জন্য অযথা সাধাসাধি করবি না কিন্তু। যখন তোদের গায়ে বমি করে দিব তখন বুঝবি ঠেলা।
আমি ওর গাল টিপে বললাম, ঔষধ খেয়ে বাসে উঠবি, তাহলেই তো হয় রে পাগলি। যা একটু ঘুরে আয়, ভাল লাগবে। কোথাও তো যাস না আর নিয়ে যেতেও পারি না।
শারমিন আমার হাত ধরে বলল, থাক না দাদা। আমার ওসব ভাল লাগে না। যাব কোন একসময়। এখন জোর করো না তো।
শারমিন বেনুনি দুলাতে দুলাতে চলে গেল। বাসে উঠলে বমি হবে এটা যে ওর বাহানা তা আমি ধরে ফেলেছি। ও ভাল করেই জানে যে টাকা দিয়ে পিকনিকে যাবে সে টাকা দিয়ে সংসারের একদিনের চাল, ডাল সহ আরও দৈনন্দিন জিনিসগুলো কেনা যাবে। ও আরো জানে আমাকে কিভাবে টাকা জোগাড় করতে হয় আর এই সংসারটা চালাতে হয়। কি সুন্দর করেই না অভিনয় করে গেল। বাস্তবতা হয়তো ওকে এ অভিনয়টুকু শিখিয়ে দিয়েছে। আজ বুঝলাম কলেজে পড়া এই পাগলিটা অনেক বড় হয়ে গেছে। এই তো আমার চোখের সামনেই একটু একটু করে বড় হল। আসলে এমন সংসারে শারমিনদের জন্ম নিতে নেই। জন্ম নেয় বলেই অনেক ইচ্ছাই পূরনের অভাবে ভিতরে চাপা পড়ে যায়। হঠাৎ এক প্রগাঢ় হাহাকার যেন আমাকে দ্রবীভূত করল।

২.
এক কঠিন সময়ে এই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলাম। হঠাৎ দুর্ঘটনায় বাবা যখন পঙ্গু হলেন তখন মা এসে আমার হাত দুটো ধরে কাঁদতে লাগলেন। মায়ের সেই চোখের জলের ভাষা আমি পড়তে পেরেছিলাম। মা বাবা আর শারমিনকে ভাল রাখার জন্য র্গ্যাজুয়েশন কমপ্লিট করা হয়নি আমার। তার বদলে ইন্টারমিডিয়েট পাশের ছোটখাটো একটা চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছি। কিন্তু সবখানেই অভিজ্ঞতার ভান্ডার আর কর্তাদের চা খাওয়ানোর পর্যাপ্ত টাকা কোনটাই আমার ছিল না। তাই হয়তো কিছুই হয়নি আমার জীবনে।
সময়ের পরিক্রমায় রেনু আমার জীবনে এসেছে। মাঝে মাঝে মেয়েটার জন্য বড় মায়া হয়। ওর অনেক শখ আহ্লাদই হয়তো পূরণ হয়নি এ সংসারে এসে। তারপরেও ও এ পরিবারকে যতটা ভালবাসে তার সিকি ভাগও ফেরত দিতে পারিনি আমি।
শুধুমাত্র একা আমার উপর থেকে সংসারের চাপ কমানোর জন্য রেনু যেদিন ছোট্ট অভিনয় করে বলেছিল, কিছু টাকা যোগাড় করে আমাকে একটা সেলাই মেশিন কিনে দিও তো। শুধু শুধু তো বসেই থাকি, একটু সময় কাটবে।
সেদিন রেনুর এই কথা শুনে আমার চোখে জল চলে এসেছিল। আমি চাইনি এ জল রেনু দেখুক। আসলে পুরুষ মানুষদের আড়ালে আড়ালেই দুঃখ নিবারণ করতে হয়। সংসার নামক চাকা সামলিয়ে অনবরত সেলাই মেশিনের চাকা ঘুরিয়ে যাওয়া রেনুর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে যেয়ে মাঝে মাঝে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়।
এই শহরে সামান্য বেতনের একটা চাকরিও আমার ভাগ্যে জোটেনি। এজন্য একটা বইয়ের দোকানে কাজ করে মাস শেষে সামান্য কয়টা টাকায় মানুষগুলোকে ভাল রাখতে গিয়ে যখন হিমশিম খাচ্ছিলাম তখনই একজন বড়ভাই একটা সার্কাস দলের সন্ধান দিল। আমার কাজ হল বিভিন্ন জন্মদিনের পার্টি আর বাচ্চাদের বিভিন্ন ফাংশনে মিকি মাউস সাজা। আমি আর কোনকিছু চিন্তা না করে কটা টাকার জন্য মিকি মাউস সাজতে রাজি হয়ে গেলাম। বেশিরভাগ ফাংশন গুলোই রাতে হয় বলে যেদিন যেদিন আমার ডাক পড়ে সেদিন আমাকে সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়তে হয় আর ফিরতে হয় অনেক রাতে।
যে রাতে উঁচু উঁচু দালানের মানুষগুলো পরম শান্তিতে ঘুমোয় আর আমাদের মত মানুষগুলোকে পরেরদিন ভাল থাকার উপাদান সংগ্রহ করতে গিয়ে অর্ধেক রাতটাই পার করে দিতে হয়। প্রতি অনুষ্ঠানের দিন আমি ইয়া বড় একটা মিকি মাউসের খোলসের ভিতর ঢুকে পড়ি আর স¤পূর্ণ মিকি মাউস হয়ে যাই। ছোট ছোট বাচ্চাকে আনন্দ দিয়ে ঘণ্টা হিসেব করে প্রায় দেড়শ দুইশো টাকা করে পাই। তখন মনে হয় মিকি মাউস না বরং আমি একজন খাঁটি বাঙালি ইঁদুর হয়ে গেছি, যে ইঁদুর দিনের বেলায় সবার অগোচরে থাকে আর সন্ধ্যে হলেই খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে তার সংসারের জন্য। তবে ওই ইঁদুরগুলোর সাথে আমার সামান্য পার্থক্য আছে। ওই ইঁদুরগুলোকে রাতের গভীর আঁধারে সবার আড়ালে আড়ালে খাবার সংগ্রহ করে বেড়াতে হয় কিন্তু আমাকে চারপাশের লাল নীল উজ্জ্বল আলোর ঝলমলানির মাঝে সমাজের উচ্চ শ্রেণির নারী পুরুষ আর তাদের বাচ্চাদের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে লাফালাফি নাচানাচি করে টাকা সংগ্রহ করতে হয়। ওই সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কয়েকজন মানুষের ভাল থাকা আর মানুষগুলোকে ভাল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হয়।
দিনের পর দিন এই ইঁদুর-মানুষ আর মানুষ-ইঁদুরের খেলা খেলতে খেলতে পাহাড়সম ক্লান্তি আমাকে গ্রাস করে। কিন্তু পরক্ষণেই চোখে ভেসে ওঠে হুইল চেয়ারের বাসিন্দা বাবার নীরব যন্ত্রণা, খুব গোপনে লুকিয়ে রাখা মায়ের তীব্র বেদনা, শারমিনের জন্য একটা রঙিন সংসার, একটু একটু করে চোখের নিচে জমা কালিকে কড়ে আঙুল দেখানো রেনুর ভালাবাসাময় মুখচ্ছবি আর অন্তুকে মানুষের মত মানুষ করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এসব চিন্তা করেই সব ক্লান্তির পাহাড়কে শূন্যে ভাসিয়ে দিতে আমি কোন দ্বিধাবোধ করি না।
বাইরে বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। রেনুর এখনও রান্না শেষ হয়নি। অন্তু আর শারমিন হয়তো পড়ছে। গুনগুন করে আওয়াজ আসছে। আমি রেনুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আজকে আবার ইঁদুর হওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লাম।

৩.
ঘড়ির দিকে তাকালাম। বেশ রাত হয়েছে। মিকি মাউস সেজে আজকের অনুষ্ঠানটাও ভালভাবে শেষ করতে পেরেছি। কিন্তু মাঝখানে হঠাৎ একবার প্রচণ্ড লাফালাফি করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাব। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছি। এখন টাকাটার জন্য অপেক্ষা করছি। টাকাটা পেলেই বাবার জন্য ঔষধ কিনে বাসায় চলে যেতে পারব।
আজকে বাচ্চাটা যখন বড় একটা কেকের সামনে মোমবাতিতে ফুঁ দিচ্ছিল তখন কেন জানি বারবার অন্তুর মুখটা ভেসে উঠছিল। অন্তুর কোন জন্মদিনেই একটা কেক নিয়ে গিয়ে বলা হয় নাÑ শুভ জন্মদিন অন্তু বাবা। আসলে আমাদের মতো বাবাদের অনেক যন্ত্রনা থাকে। তারপরেও এটা ভেবে ভাল লাগে যে বাচ্চাগুলো আমার জন্য অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য হলেও প্রাণখুলে আনন্দ করতে পারে। কিন্তু বাচ্চাদের সাথে সাথে বড় মানুষগুলো এসে যখন হাসি তামাশা করে আর গায়ে ধাক্কা দেয় তখন মনে হয় আমাদের মত মানুষগুলো হয়তো ওদের কাছে নিতান্তই পশুসম। দামি দামি পোশাকে-আশাকে শরীর মুড়িয়ে নিলেই কেন যে ওরা বদলে যায় জানি না। মিকি মাউসের বড় মুখোশটার ভেতরেও যে একজন সত্যি মানুষ থাকে সেটা কি ওরা ভুলে যায়? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে খুব ইচ্ছে করে।
বেশ কয়েক মাস আগে টিভিতে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম যেখানে আমাদের মত তীব্র যন্ত্রণা লালন করা অন্তরালের মানুষগুলোকে নিয়ে কথা বলছে। সেখানে সবাই আমাদের জন্য কত সমবেদনা আর সহানুভূতি দেখাচ্ছে। ওদের ওই নাটুকে সহানুভূতি টিভি পর্দার ওপারেই শোভা পায়। এপারের নির্মম বাস্তবতার জন্য ওই সহানুভূতির কোন মূল্য নেই।
একজন এসে আজকের মিকি মাউস সাজার টাকাটা দিয়ে গেল। আমি টাকাগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি। কি আশ্চর্য এক কাগজ যার অভাবে আমরা প্রতিদিনের লড়াইয়ে হেরে যায়।

৪.
ইঁদুর-মানুষ খেলা শেষে এখন বাড়ি ফিরছি। হাতে বাবার ঔষধ। রাস্তার নিয়ন বাতির হালকা আলোয় মুখোশ পরা এই শহরের নিষ্ঠুরতার মাঝে মনে হচ্ছে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছি। সবাই হয়তো পরম তৃপ্তি নিয়ে ঘুমাচ্ছে কিন্তু এই শহরের নিতান্তই একটা ছোট্ট বাসায় একজন বাবা হয়তো কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন, একজন মা হয়তো খুব সাবধানে শাড়ির আঁচলটা টেনে বারবার চোখ মুছছেন, এক শারমিন হয়তো কল্পনার রংতুলি দিয়ে নানা আঁকিবুকি করছে, এক ছোট্ট অন্তু হয়তো তার বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে একসময় স্বপ্নের দেশে চলে গেছে আর একজন মায়াবতী রেনু খাবার সাজিয়ে নিয়ে কারো জন্য অপেক্ষা করছে।
খুব ইচ্ছে করে একদিন সবাইকে ডেকে বলি, আমি খুব ক্লান্ত। ওই মিকি মাউসের ভেতর আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি আর পারছি না। কিন্তু বলা হয় না, হয়তো হবেও না কোনদিনই। তারপরেও অন্তুর মুখের দিকে চেয়ে অপেক্ষা করি নিশ্চয় একদিন এই মিকি মাউস সাজার খেলা বন্ধ হবে। একদিন নিশ্চয় আমি ইঁদুর থেকে স¤পূর্ণরূপে মানুষ হতে পারব। সেদিন হয়তো চিৎকার করে বলতে পারব, আজ আমি মানুষ হয়েছি। নিশ্চয় কোন এক হাহাকার করা জোছনা রাতে আমাকে কোথাও যেতে হবে না আর মিকি মাউস নামের ইঁদুরও সাজতে হবে না। সেদিন বাবা, মা, শারমিন, রেনু, অন্তু আর আমি সবাইমিলে হাতে হাত ধরে জোছনার আলো গায়ে মাখব, যে আলো ভুলিয়ে দিবে দীর্ঘদিন লালন করা তীব্র যন্ত্রণামিশ্রিত অন্ধকারের কাব্যগুলো।