ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

আপডেট: আগস্ট ৩০, ২০২২, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

প্রিন্সিপাল মজিবুর রহমান:


হযরত খোয়াজ খিজির (আ:) এর নাম আমরা সবাই জানি। সে যুগে চশমা ছিল কিনা জানিনা। তবে কথিত আছে তিনি তার চশমার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি তাঁর চশমা দিয়ে কোনো মানুষের, কোনো ঘটনার আদ্যপ্রান্ত দেখতে পেতেন, বুঝতে পারতেন। খোয়াজ খিজির সঙ্গে নিতে না চাইলেও তাঁকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না শর্তে হজরত মুসা (আ:) কে সঙ্গী করেছিলেন। পথ চলতে দু’জন নৌকাতে সমুদ্র পার হলেন। খিজির নৌকাটি ফুটো করে দিলে মুসা চুপ না থেকে বলে উঠলেন, মাঝিরা আমাদের পয়সা নিল না অথচ আপনি নৌকা ফুটো করে দিলেন? খিজির (আ:) বললেন আমি আগেই শর্ত দিয়েছি কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। মুসা (আ:) চুপ করলেন, অনুরোধে আবার তার সঙ্গে পথ চললেন। এবার খিজির (আ:) একদল ছেলের মধ্যে থেকে একটি ছেলেকে হত্যা করলেন। মুসা (আ:) বললেন, নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করলেন? খিজির (আ:) রেগে গেলেন। আবারও তাঁর অনুরোধে পথ চলা শুরু করলেন। পথে খিজির (আ:) একটি হেলেপড়া ওয়াল ঠিক করে দিলেন। মুসা (আ:) আবারও প্রশ্ন করলেন, যারা আমাদেরকে খাদ্য দিল না আর আপনি তাদের ওয়াল ঠিক করে দিলেন? এবার খিজির (আ:) আরও রেগে গেলেন এবং বললেন, তোমার সঙ্গে আর না, তুমি এখন দূর হও। তবে আমার কাজের কারণগুলো তোমাকে ব্যাখ্যা করি। প্রথমতঃ নৌকা না ফুটো করলে গরিব মাঝিদের নৌকাটা ওই অঞ্চলের অত্যাচারী রাজা নিয়ে নিত। দ্বিতীয়তঃ বাচ্চাকে মেরে ফেলেছি তার কারণ সে বড় হয়ে খুব খারাপ লোক হতো- তাই। বাবা-মার আরও বাচ্চা হবে এবং তারা অনেক ভাল মানুষ হবে। তৃতীয়তঃ ওয়াল ঠিক করে দিয়েছি এজন্য যে, তার নিচে গুপ্তধন আছে। যার মালিক দু’টো শিশু বাচ্চা। ওয়াল পড়ে গেলে লোকেরা সম্পদ নিয়ে নিত। বাচ্চাদের সম্পদ রক্ষার্থে করেছি। যা যা করেছি সব আল্লাহর হুকুমে করেছি। আমি নিজে থেকে কিছু করি নাই। তুমি এখন যাও, তোমার সঙ্গে আর না।

ইউক্রেন থেকে ৬ হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের অবস্থান। সেখানেও যুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বাংলাদেশ কোনো পক্ষে বিশেষভাবে অবস্থান না নিলেও ৩ মার্চ ২০২২-এ ইউক্রেনের আলিয়া বন্দরে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’-তে অজ্ঞাত মিসাইল আঘাত হানায় বাংলাদেশি নৌপ্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হয়েছেন অর্থাৎ এতদূরত্বে থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের শুরুতেই আমরা আঘাতপ্রাপ্ত হলাম। এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে আমরা কী ক্ষতিগ্রস্তে পড়বো তা বোঝার জন্য খোয়াজ খিজির (আ:)-এর চশমার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২ মার্চ রুশ আগ্রাসনের নিন্দা এবং অবিলম্বে ইউক্রেন থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানালে তা ১৪১-৫ ভোটে পাশ হয়। বাংলাদেশসহ ৩৫ টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে আর্টিক্যাল ২৫-এ স্পষ্ট বলা আছে, বাংলাদেশ যে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। বিশেষ প্রভাবশালী দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একসময় বঙ্গবন্ধু সরকার ন্যায়সঙ্গত লড়াই এবং প্যালেস্টাইন, ভিয়েতনাম ইস্যুতে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২৪ মার্চ ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় সৃষ্ট মানবিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আনা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় বাংলাদেশ। সে প্রস্তাবটি ১৪০ ভোটে পাশ হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের অভিমত, মানবিক কারণে নির্যাতিত ও আহতদের জন্য সব ধরনের সুবিধার কথা থাকায় বাংলাদেশ তা সমর্থন করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিকতায় ভারত বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছিল। অপরপক্ষে পরোক্ষভাবে হলেও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় আঁচ করতে পেরে ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব আনলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সে প্রস্তাবে ভেটো দেয়। এর পরে আবারও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেবারও ভেটো প্রদান করে। এ ছাড়াও যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপোসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠালে প্রত্যুত্তোরে ১৯৭১ সালে ৬ এবং ১৩ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রশাস্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের দুই স্কোয়াড্রন ক্রুজার ও ডেস্ট্রয়ার এবং একটি পারমাণবিক ডুবোজাহাজ (সাবমেরিন) পাঠায়। স্বীকার করতেই হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের এই উদ্দেশ্য, প্রচেষ্টাগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভে বাঁক পরিবর্তনে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল। এজন্যে বাংলাদেশের জনগণ সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে কৃতজ্ঞ। পক্ষান্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম বন্দর পুনঃচালুকরণে সোভিয়েত বাহিনীর যে অসাধারণ ভূমিকা ছিল, তাতে শুধু রুশ ছিলনা, ছিল ইউক্রেনের নৌসেনাও। ফলে আমরা ইউক্রেনের কাছেও ঋণী। তাছাড়া সে সময়ের সোভিয়েত প্রধান নেতা ‘লিওনিদ ব্রেজনেভের’ জন্মস্থান ছিল ইউক্রেনে।

কোভিড-১৯ এর কালো থাবার হাত থেকে বেরিয়ে না যেতেই গোটা বিশ্ব ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বেড়াজালে পড়ে গেল। যুদ্ধের প্রভাবে পণ্যবাজার উত্তাল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল সহ খাদ্য পণ্যের বাজারে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাকাতেই পারছে না। বাংলাদেশের আমদানি নির্ভর ভোজ্য তেল, গমের পাশাপাশি সিমেন্ট, রড সহ নিত্যপণ্য। দেশের পোশাক খাতেও নেগেটিভ প্রভাব। ফলে বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষকে তাদের জীবন-মানের ওপর প্রচ- অর্থনৈতিক চাপ পড়ছে। এর মধ্যে এক চিলতে সুখের খবর বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মস্কো-কিয়েভ চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের ওদেলা বন্দর থেকে ১ আগস্ট শস্যবাহী জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত বিষয়ে নতুন নতুন ভাবনা, শিক্ষা ও দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছে। এসকল সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর প্রদত্ত ছয়টি সুপারিশ বাস্তবায়িত হওয়া জরুরি। দেশের কষ্টে থাকা মানুষগুলোর দুর্ভোগ কমাতে এখন সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করা। এবং এটিই হোক আমাদের বর্তমান যুদ্ধ।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও প্রবন্ধকার