ইউরোপে গাড়ি হামলাই এখন আতঙ্কের কারণ

আপডেট: আগস্ট ১৯, ২০১৭, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ফ্রান্সের নিস, জার্মানির বার্লিন, যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনিস্টারের পর এবার স্পেনের বার্সেলোনা। যেখানে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়নি কোনও বিস্ফোরক বা মারণাস্ত্র। বরং নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় গাড়িই হয়ে উঠলো মানুষ হত্যার হাতিয়ার। আর এই হাতিয়ারের আঘাতে প্রাণ হারালো ১৪ জন। আহত হয়েছেন শতাধিক। ইউরোপজুড়ে গাড়ি হামলার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গাড়িই হয়ে উঠছে আতঙ্কের কারণ। শুক্রবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে, গাড়ি হামলার কারণে সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া এবং প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
স্পেনের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে বার্সেলোনার লাস রামব্লাসে পথচারীদের ভিড়ে ভ্যান উঠিয়ে দেয়ার ঘটনায় ১৩ জন নিহত হন। এরপর স্থানীয় সময় মধ্যরাতের দিকে ক্যামব্রিলসের কাছে আরেকটি হামলার প্রচেষ্টা হলে পাঁচ সন্দেহভাজনকে হত্যার মধ্য দিয়ে তা ঠেকিয়ে দেয়ার দাবি করে পুলিশ। ওই ঘটনায় সাতজন (ছয় পথচারী ও এক পুলিশ) আহত হন। এই দুই হামলার আগে বৃহস্পতিবার সকালে আলকানার এলাকার একটি বাড়িতে বিস্ফোরণ হয়। এতে একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। এটিকে প্রথমে দুর্ঘটনা বলে মনে করা হলেও এখন পুলিশ ধারণা করছে তিনটি ঘটনার সংযোগ রয়েছে।
এই হামলার পর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। কোনও রেস্টুরেন্ট কিংবা ঘরের কাছে রাস্তাতেও এখন আর কেউ নিরাপদ নন। যেকোনও সময় যেকোনও স্থানেই হামলার শিকার হতে পারেন মানুষ। আর এসব হামলা চালানোর জন্য খুব বড় কোনও অস্ত্রের দরকার নেই। গাড়িই হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর অস্ত্র। গত দুই বছরে এমন বেশ কয়েকটি হামলা হয়েছে।
কয়েক বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, কোনও সমাজে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য খুব সাধারণ পথ ব্যবহার করলেই হয়। আর এই গাড়ি হামলা সেই আতঙ্কই তৈরি করছে।
লন্ডনে ওয়েস্টমিনিস্টারে হামলার পর বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, হামলাটি আত্মঘাতী কিংবা আধা-আত্মঘাতী। ছিল না অতিরিক্ত প্রযুক্তি নির্ভরতা, লাগেনি ভারী অস্ত্র। ফ্রান্সের নিস ও বার্লিনে বড়দিনের মার্কেটের হামলার কায়দায় গাড়ি ব্যবহৃত হয়েছে প্রধানভাবে। ওই দুই হামলায় চালক কোনও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। এর আগে ২০১৩ সালে উলউইচ ব্যারাকে লি রিগবি নামের এক সেনাকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। ফলে বিষয়টি এখন একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেছে, সন্ত্রাসী হামলা চালাতে একটি গাড়িই যথেষ্ট। আর তাতেই ছড়িয়ে পড়বে আতঙ্ক। এমন হামলা ঠেকানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও খুব বেশি কিছু করার থাকে না।
রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক মার্ক হেদারিংটন ও এলিজাবেথ সুহায় জানান, সাধারণ মানুষ যখন সন্ত্রাসী হামলার ভয়ে থাকে তখন নিরাপত্তার জন্য নিজেদের মৌলিক অধিকারে ছাড় দিতেও প্রস্তুত হয়ে যান তারা। আর তখনই সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
দুই বিশ্লেষক আরও জানান, সন্ত্রাসী হামলার মূল লক্ষ্য হলো আতঙ্ক ছড়ানো। মানসিকভাবে সবাইকে বিপর্যস্ত করে ফেলা। সবার মাঝেই তখন আতঙ্ক কাজ করে যে আমার উপর কিংবা আমার কাছের মানুষের উপর কি এমন হামলা হতে পারে। আমি এখন কী করতে পারি।
তারা আরও জানান, আর এই উপায় খুঁজতে গিয়ে আমরা নিজেদের শান্ত রাখার চেষ্টা করি। যেমন- ৯/১১ এর হামলার পর অনেকে হয়তো এটা ভেবে সান্ত¡না খুঁজছিলেন যে শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মতো বড় অফিসেই এমন হামলা হতে পারে! কিন্তু ট্রাক, ভ্যান ও গাড়ি হামলা যেকোনও সময় যেকোনও অবস্থাতেই হতে পারে। এই আতঙ্কই সমাজকে অস্থিতিশীল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
এমন হামলায় অবশ্য নিহত হওয়ার হার খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসীরা গাড়ি হামলায় যে পরিমাণ মানুষ হত্যা করে সে তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু এই পরিসংখ্যান তো আর আতঙ্ক দূর করতে পারে না। অন্য যেকোনও সন্ত্রাসী হামলার চেয়ে এই হামলার আশঙ্কা আলাদা।
সন্ত্রাসী হামলার চিরাচরিত অস্ত্র ব্যবহার না করে বার্সেলোনায় এই হামলায় মানুষের অসহায়ত্বের দৃশ্যই যেন ফুটে উঠেছে। যেকোনও বস্তুই অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। তাই সবসময়ই পূর্ব প্রস্তুতি সম্ভব নয়। একটি ভ্যান সংগ্রহ করে মানুষ হত্যা করতে খুব বেশি দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। শুধু প্রয়োজন ইচ্ছা।
আর এই ভয় ও আতঙ্ক সমাজ ও রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ইউরোপে সাম্প্রতিক সময়ের এই হামলাগুলো এমনই স্বাক্ষ্য দেয়। ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা চাথাম হাউসের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষই মুসলিম প্রধান দেশগুলোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, অনেকে মনে করে নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠী, ধর্ম ও গ্রুপের হওয়ার কারণে তারা হামলার ভয় বেশি পান। তারা নিজেদের পরিচয় নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হতে থাকেন তারা। সামাজিক বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘আউটগ্রুপিং’। আর পশ্চিমাদের লক্ষ্য করে এই হামলা আউটগ্রুপিঙের কারণেই হয়ে থাকে।
এই অনুভূতি আসলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরির মাধ্যমে সমাজকে বিভক্ত করে ফেলে। বিভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষদের মাঝে বিভেদ তৈরি করে।
গবেষণা থেকে জানা গেছে, এমন হামলার কারণে বিশ্বাস ও ঐক্যের ফাটল দেখা যায়। যেটা সমাজের জন্য আরও ক্ষতিকর। এটা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে অতটা ক্ষতিকর মনে হয় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব খুবই গভীর।
পশ্চিমা রাজনীতিতে এর প্রভাব যাই হোক না কেন পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। নগরজীবনের মানসিকতার পট পরিবর্তন হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে হামলার আশঙ্কা। সাধারণ যেকোনও বস্তুকেই মনে হচ্ছে অস্ত্র।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ