ইচ্ছে পূরণ

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

গোলাম সরোয়ার



সৎ  মা যখন ভাত রাঁধে তখন  লামিয়া পাখির  সাথে কথা বলে। সবুজ রঙের একটি পাখি। গাছের শাখায় বসে সে ডাকতে  থাকে।
‘লামিয়া সোনা, কোথায় তুমি? কোথায় আমার সোনা মা?’
ডাক শুনে লামিয়া বাগানের দিকে যায়। বকুল গাছের নিচু ডালে শান্ত মনে বসে থাকে পাখিটা। লামিয়াকে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে। ফল খেতে দেয়। মিষ্টি মিষ্টি ফল। লামিয়া বলে, ‘এখন যাই। মা রাগবে।’
‘মায়ের খুব রাগ?’
‘আপন মা নন। সৎ মায়ের রাগ তুমি জান না।’
‘শোন লামিয়া। মাকে মেনে চলবে।’
পাখি চলে গেলে লামিয়া দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকতে তার লাগে। বাবা অফিসে গেলে সৎ মা বকা দেয়। কাজের কথা বলে ব্যস্ত করে তোলে। লামিয়া হাঁপিয়ে ওঠে। স্কুল থাকলে বাবা ক্লাসে রেখে যায়। কিন্তুু যেদিন স্কুল থাকে না, লামিয়াকে কাজ করতে হয়। বাগানে এলেই লুতফুন চিৎকার দেয়, ‘কোথায় নবাবজাদী। ঘর ঝাঁট দিতে যেয়ে হাওয়া।’
‘এই যে আম্মু। ময়লা ফেলেছি।’
‘ময়লা ফেলতে এতক্ষণ লাগে। ঘরে মন থাকে না?’
পাখিটা লামিয়ার সাথে গল্প করে। ওকে বলে,‘জান মা! আজ এক কা- ঘটেছে। মা কাজ করছিল দিঘির পাড়ে। বাচ্চার কথা ভুলে গিয়েছিল। এদিকে বাচ্চা পানির দিকে যাচ্ছিল। আমি প্রমাদ শুনলাম। মাকে চিনি না। ওর সাথে খেলা করতে লাগলাম। মা দেখল বাচ্চা আমার সাথে খেলছে। দেখে কাঁদতে লাগল। আমি ওকে বকা দিয়ে চলে এলাম।’
‘এদিকে আসলে কেন?’
‘মাকে দেখতে আসব না?’
‘কী বলছো। মানুষ কি পাখির মা হয়?’
‘সে অনেক কথা।’
‘দুপুরে এসো তুমি।’
‘কেন, দুপুরে কেন?’
‘সকালে মা রান্না করেন। খেয়ে তবে বিশ্রাম করেন উনি। আর কী যেন বললে? অনেক কথা! কী অনেক কথা?’
‘আজ থাক। আর একদিন বলবো তোমাকে।’
‘সন্তান প্রসবের সময় আমার মা মারা গেছে। তা তুমি জান পাখি মা?’
লামিয়ার কথা শুনে পাখি কাঁদল। তার কান্নায় লামিয়ারও চোখে পানি এল। ওকে আদর করে উড়ে গেল পাখি। সারাদিন অনেক ভাবল লামিয়া। মায়ের মৃত্যুর কথায় পাখি কাঁদল কেন? পাখিটা কি মায়ের কথা জানে। জানলই বা, তাতে কান্নার কী আছে। লামিয়া অস্থির হয়ে পড়ল।
রাতে ঘুম এল না তার। শিশির ঝরলে কে যেন তাকে  ঘুম পাড়াল। ঘুমের নদীতে ভাসতে লাগল লামিয়া। ভেসে ভেসে এক দ্বীপে এসে পৌঁছল। যেখানে গান গায় হলুদ আবাবিল। বন বহেরার পাতার সুগন্ধে মাকে খুঁজতে লাগল সে। কারা যেন বলতে লাগল, ‘লামিয়ার মা, দেখ, কে এসেছে।’ জরির শাড়ি পরে পাশে এসে বসল মা। মাকে সে কোনদিন দেখেনি। মায়ের দেহে ভোরের আলো। লামিয়া কোন কথা বলল না। যে মা তাকে কোলে নেয়নি, একা ফেলে যে মা সুখে থাকতে পারেÑ তার সাথে কথা নেই লামিয়ার। মুখ ফিরিয়ে থাকে সে। মা সব বুঝতে পারে। মুখে চুমু দিয়ে মা আদর করে। মনে ঢেলে দেয় টোগা পাহাড়ের সুন্দর স্বপ্ন। লামিয়া বলে, ‘আমাকে ফেলে কেন এখানে থাক?’
‘এখানে থাকতে হয় সোনা।’
‘কেন? তোমার বাড়ি আছে না?’
‘আমি তো ও বাড়িতে থাকতে পারি না।’
‘সবাই পারে। তুমি পার না কেন?’
‘তা হয় না মা। এখান থেকে কেউ ফিরে যেতে পারে না। আমাকে আল্লাহর ফেরেশতা নিয়ে এসেছে। আর যেতে দিবে না।’
মায়ের কথায় কেঁদে বুক ভাসায় লামিয়া। সে বুঝতে পারে মা অন্য জগতে এসেছে। ছোট ভাইটিও চলে এসেছে অচেনা জগতে। মা বলল, ‘আমি একটা ক্ষমতা পেয়েছি।’
‘কী ক্ষমতা?’
‘আমি যেন আমার লামিয়াকে দেখে আসতে পারি, সে ক্ষমতা।’
‘আমিও খোঁজ করি তোমাকে।’
‘বাগানের পাখিকে চিনতে পারনি তুমি। ওই তোমার মা।’
‘সত্যি বলছ?’
‘মাকে মিথ্যা বলতে পারি?’
মা সব বলে। তখন মা ছোট্ট। হঠাৎ দেখা হয় এক দরবেশের সাথে। দরবেশ মায়ের হাত দেখে বলে, এক পুত্র সন্তান হবার পর সে আবার গর্ভবতী হবে। সেই সন্তান প্রসবকালে মৃত্যু হবে তার। দরবেশ তাকে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বলে। মৃত্যুর পর যেন সে বেহেশতের পাখি হয়। আর যখন খুশি, কন্যাকে দেখে আসতে পারে। তার দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। তাই সে উড়ে এসে মেয়েকে দেখে যেতে পারছে।
ঘুম ভেঙে লামিয়া দেখে বাবা কুরআন পড়ছে। বাবার গলা এত ভাল! শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে। একটা সূরা প্রতিদিন পাঠ করে বাবা। শুনে একটি  আয়াত ওর মুখস্ত হয়ে গেছে। লামিয়া সে আয়াত সব সময় পাঠ করে। কুরআন শেখার জন্য মৌলভী দিতে চেয়েছেন বাবা। কিন্তুু সৎমা তা করতে দেন না। লামিয়াকে একটা দোয়াও শেখাননি তিনি। লামিয়াকে শিক্ষা দানের ইচ্ছা তার নেই। আজ স্কুল বন্ধ। মা ঘুমিয়ে পড়লে লামিয়া বাগানে গেল। দেখল পাখিটা বসে আছে। সে বলতে লাগল, ‘সোনা মা কেমন আছ?’
‘কেমন থাকবে। সব সময় কাজ করতে হচ্ছে।’
‘কেন?
‘কাজের মেয়ে নেই?’
‘নেই। আমাকেই করতে হচ্ছে।’
‘বাবা কিছু বলেন না?’
‘বাবা জানেনই না।’
‘তাকে বলনি তুমি?’
‘বললে ভাল হত? মা আমাকে পিটাত না?’
কোন কথা হয় না তাদের মধ্যে। মেয়েকে দেখতে এসে কী লাভ! মেয়ের কষ্ট যদি দূর করা না যায় তাহলে দেখে কী লাভ! লামিয়াকে একটি পালক দিয়ে সে বলল, এটা ছুঁয়ে দিলে তোমার কাজ ফেরেশতা করবে। তবু তুমি মায়ের অবাধ্য হবে না। যতদিন তার পরিবর্তন না হয় এভাবে চলবে। কথা শুনে লামিয়া বলল, ‘আমার স্বপ্ন কি সত্য?’
‘কী স্বপ্ন? আমাকে বল।’
‘তুমি আপন মা? মিথ্যা বলবে না কিন্তু।’
‘কী মনে হয়? তোমার মন যা বলে তাই।’
’আমি কিচ্ছু বুঝি না। সব খুলে বল।’
‘সোনা আমার! আল্লাহ তোমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। আমিই হতভাগী মা।’
‘সৎ মাকে শাস্তি দাও না! আর সহ্য হচ্ছে না।’
‘ধৈর্য ধর। ভাল হওয়ার সুযোগ দিতে হয়। একদিন সে নিজের ভুল বুঝতে পারবে।’
২.
বাবার বদলী হল অন্য জেলায়। আগের মত বাবা আসতে পারে না। লামিয়ার কষ্ট দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সৎ মা কাজের চাপ বাড়িয়ে দিল। সারাদিন কাজ আর কাজ। খাওয়ার সময় থাকল না। দুপুরে পাখির সাথে কথাও বলতে পারে না। কথা না বলেই মা ফিরে যায়।
সেদিন দুপুুরে লামিয়া খেতে বসেছে। এমন সময় বোন বিছানায় হিশু করল। সৎ মা শুয়ে আছে। সে লামিয়াকে পরিষ্কার করতে বাধ্য করল। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। তবুও সে বাথরুমে গেল। ঠা-া পানি লেগে যাওয়ায় বোনটা কান্না করতেই লামিয়াকে একখ- কাঠ দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করতে লাগল সৎ মা। লামিয়ার হাতে মায়ের দেয়া পালক ছিল। সে পালক ছুঁয়ে বলল, ‘যে হাতে মা মেরেছে তা অবশ হোক।’ লামিয়ার কথা সাথে ফলল। সৎ মায়ের হাত অবশ হয়ে গেল।
খবর শুনে বাবা এলেন। অনেক চিকিৎসা চলল। কিন্তুু হাত ভাল হল না। বাবা বুঝলেন কেন এমন হয়েছে। লামিয়ার উপর যে নির্যাতন চলে তা কারও অজানা নয়। প্রতিবেশীর কাছে সে সব জানতে পেরেছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করে কীভাবে তার দিন কাটছে। কী করবে সে! কত অনুনয় করে যাতে মা হারা মেয়েটার কোন কষ্ট না হয়। কিন্তুু লুতফুন তার কথা গ্রাহ্য করেনি নাই।
কাজের মেয়েকে কেন ছুটি দেয়া হয়েছে তা সে বুঝতে পারল। লামিয়াকে কাজ করতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘এসব কাজ কেন করছ মা?’
’কাজ আমিই তো করি বাবা।’
‘সে কি? কাজের লোকের মাইন তো প্রতি মাসে শোধ করছি।’
‘সেটা আম্মু জানে। কাজ না করলে ভাত হবে?’
‘এতদিন বলনি কেন?’
‘বললে কী করতে?’
‘এর ব্যবস্থা করতাম। তোমাকে যে কষ্ট দেয় তাকে ছেড়ে দেব ভাবছ?’
’কিছুই করতে হবে না। যার শাস্তি সে পাবে।’
বাবা লক্ষ্য করল লামিয়া সব পারে। বাসন পরিষ্কার, ঘর ঝাঁট, রান্নাবান্নাÑ সব পারে। এতবড় বাড়িটা সে ঝাঁট দেয়। কাপড় ধুয়ে আলনায় ভাঁজ করে রাখে। সংসারের প্রতিটি বিষয়ে সে পারদর্শী। হাত অবশ হওয়ায় লুতফুন কাজ করতে না পারলেও লামিয়াকে প্রতিনিয়ত পিষতে থাকে। লামিয়াকে শাস্তি দেয়ার জন্য সে তৎপর  হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘নবাবজাদী! বাবাকে তো দেখালে। এতটা বেড়েছ কিসের জন্য? তোমাকে না পেটালে আমার নাম লুতফুন নয়।’
‘আমি তো বাড়িনি মা। যা বলছ সব করছি। ভাল করে কথা বল।’
‘কথা বলা শেখাবি তুই? আজ বাপের নাম ভুলাবো।’
লুতফুন চেয়ার তুলে লামিয়ার দিকে নিক্ষেপ করল। অল্পের জন্য মাথায় লাগল না। লামিয়া ব্যথিত হল মায়ের এমন কা- দেখে। তার নিষ্ঠুর আচরণে সে কেঁদে ফেলে। সে পালক ছুঁয়ে বলল, ‘মিথ্যা বলার কারণে তোমার মুখ যেন বিকল হয়। ওই মুখ দিয়ে একটি কথাও বলতে পারবে না।’ শুধু বলার বাকি। সাথে সাথে সৎ মায়ের মুখ অবশ হয়ে যায়। হাজার চেষ্টা করেও সে কথা বলতে পারে না। লামিয়া অবাক হয় তার কথার প্রয়োগ দেখে।
দুপুরে পাখি মানে তার মার সাথে দেখা করল সে। সব কথা বলল তাকে। বাবার কথাও বলল। সৎ মায়ের মুখ অবশ হয়েছে শুনে সে কিছুই বলল না। পৃথিবী এতটা নির্মম। অপরের বাচ্চাকে সয়ে নিতে পারে না মাতৃতুল্য আরেক নারী। কী করবে এ বাচ্চাটা! তার মন রক্ষার জন্য কত না পরিশ্রম করছে। মা বেঁচে না থাকার কারণে একটা শিশুকে কত অসহায়ভাবে জীবন যাপন করতে হয়। তবু সে লামিয়াকে বলে, ‘বেচারীর কত কষ্ট হয়েছে চিন্তা করেছ?’
‘কী করব। তোমাকে জড়িয়ে যা তা বলছিল। আমাকে চেয়ার ছুঁড়ে মেরেছে।’
‘আরেকটু সহ্য করলে ভাল হত না? উনিও তো মা।’
’অমন মায়ের দরকার নেই। যে উঠতে বসতে শুধু মারধর করে।’
‘বাবার কথা ভেবেছ? উনি কত কষ্ট পাবেন।’
‘মোটেই পাবেন না। উনি সব বুঝতে পেরেছেন।’
একসময় লুতফুন নিজেই তার ভুল বুঝতে পারল। সে ভাল করে বুঝতে পারল লামিয়া সাধারণ মেয়ে নয়। সাধারণের কথা এতটা কার্যকর হতে পারে না। তাছাড়া সে তাকে যত কাজ দিয়েছে, লামিয়া দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছে। তার হাতে আলাদা একটা যাদু আছে।
বাবা এলে ওকে ডাকতে বলল সে। কাছে এলে বুকে জড়িয়ে নিল। চোখের পানিতে ভেসে নিজের ভুল স্বীকার করল । সৎ মায়ের অনুনয় দেখে লামিয়ার মন বিগলিত হয়ে গেল। তার মায়ের দেয়া পালক এনে সে সৎ মাকে ছুঁইয়ে বলল, ‘আমার মা এখনই সুস্থ হয়ে যাক।’
লামিয়ার ছোঁয়া পেয়ে সৎ মা সুস্থ হয়ে উঠল এবং সুখে শান্তিতে তাদের দিন কাটতে লাগল ।